১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গোলাপীর লেখাপড়ায় এখন বাধা নেই

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক। কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ। কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি...’ এ ছিল কবির কাছে তার নায়িকার কৃষ্ণ হরিণ চোখ দেখার উপলব্ধি। তবে কৃষ্ণকলি গোলাপী আকতার মিনির কালো রূপ আর চোখ পছন্দ হয়নি সৎমা আর স্বামী শ্বশুরের। আর তাই অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কৃষ্ণকলি মিনিকে দেখে শুনে বিয়ে করার পরদিন সকালে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে সর্বস্ব ছিনিয়ে চুলের মুঠি ধরে ঘরছাড়া করেছিল স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। কিন্তু তাতে কী! প্রত্যয়ী মিনি থেমে থাকেনি। বরং সমাজে কি করে ‘মিনি থেকে বিগ’ হওয়া যায় এ প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। মিনি আজ এক দৃষ্টান্ত। সে এখন একের পর এক গেঁথে চলেছে তার সাফল্যের জীবনাল্লেখ্য। আর এতে চক্ষুচড়ক অনেকের। যারা তাকে ঠেলে দিয়েছিল দূরে, তারাই আজ বুকে টেনে নেবার বাসনায় উদগ্রীব।

গোলাপী আকতার মিনি। বাবা ভ্যানচালক। রংপুর মহানগরীর কামারপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস। মাত্র দুই বছর বয়সে মা মারা যায়। ঘরে আসে সৎমা। সঙ্গী হয় একে একে আরও চার ভাইবোন। যতই বড় হতে থাকে তারা, সৎমায়ের কাছে ততই চোখের বালি হতে থাকে মিনি। নিজ সন্তানদের প্রতি দরদ আর সতীন সন্তানের প্রতি বাড়তে থাকে অনাদর। অনাদর আর দারিদ্র্যের মাঝেও মিনি তার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে ছিল প্রত্যয়ী। ২০১১ সালে বয়স যখন মাত্র ১৩, তখনই সৎমা তাকে বিয়ে দিয়ে ঘরছাড়া করার পাঁয়তারায় মেতে ওঠে। কিছুতেই রাজি হয়নি সে। তার ইচ্ছে লেখাপড়া শেখা। মা নাছোড়বান্দা। বইপত্র ছিঁড়ে ফেলে। পাঠিয়ে দেয় অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজে। এভাবে সৎমায়ের নির্মমতায় হার মানতে হয় তাকে। বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। বিয়ের পরদিন সকালে স্বামী আর শাশুরির রোষানলের শিকার হয় সে। কারণ গায়ের রং কালো। কালো হওয়ার কারণে পরদিন সকালে তাকে পাঠিয়ে দেয় সৎমায়ের কাছে। এবার নতুন ইস্যুতে সৎমায়ের নির্মমতা বাড়তে থাকে। পরে স্থানীয় কাউন্সিলরের সহযোগিতায় তাকে ফের নিয়ে যাওয়া হয় স্বামীর ঘরে। এবার তাকে বলা হয় হিজড়া এবং মানসিক রোগী। পরে আরডিআরএস নামের বেসরকারী সংস্থার সহায়তা নেয় সে। তারা হিজড়া ও মানসিক রোগী কিনা তা পরীক্ষা করে। অভিযোগ মিথ্যে প্রমান হয়। কিন্তু তারপরও স্বামী শাশুরি নেয়নি তাকে। আর অপরদিকে বেড়ে যায় সৎমায়ের নির্যাতন। কিন্তু কোন কিছুতেই দমতে রাজি নয় সে। আবারও ধর্ণা দেয় ওই বেসরকারী সংস্থার শেল্টার হোমে। সেখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষা নেয় সেলাই, বাটিক বুটিক, কার্পেট তৈরি, কারচুপি কাজসহ অন্যান্য কাজের। ১১ মাসের প্রশিক্ষণ শেষে আরডিআরএস তাকে সেলাই মেশিন, কিছু কাপড় চোপড় এবং স্বাবলম্বী হয়ে দাঁড়াবার জন্য পুঁজিও দেয়। আর এসব নিয়ে বাসায় ফিরে গড়ে তোলে মিনি বাটিক বুটিক সেন্টার। সেখানকার দরিদ্র মেয়েদের কাজ শেখানো এবং দোকানে সেলাইয়ের কাজ করে এখন গোলাপী প্রতিষ্ঠিত। এরপর প্রশিক্ষক হিসেবে চাকরির জন্য ডাক আসে তার শতরঞ্জী উৎপাদকারী প্রতিষ্ঠান কারুপণ্য থেকে। বর্তমানে সেখানেই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বাসার সামনে নিজের সেলাইয়ের দোকান করেছে। এখন সে ১২ হাজার টাকা বেতন পায়। Ñমানিক সরকার মানিক, রংপুর থেকে

নির্বাচিত সংবাদ