২১ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অথচ সেই সিমন্সই নায়ক

অথচ সেই সিমন্সই নায়ক

শাকিল আহমেদ মিরাজ ॥ আলোচনায় ছিলেন কেবলই দু’জন। ক্রিস গেইল ও বিরাট কোহলি। ৪৭ বলে অপরাজিত ৮৯ রান করে দলকে ১৯২ রানের বিশাল স্কোর এনে দিয়ে তাতে শুরুতেই সফল কোহলি। ম্যাচের আগে জ্যামাইকান ব্যাটিং দানব গেইল তো স্বাগতিক বোলারদের বলের সুতো তুলে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন! বিশাল স্কোর তাড়া করতে গিয়ে ৫ রানে সাজঘরে সেই গেইল! মনে হচ্ছিল, ভারতের জয়টা সময়ের ব্যাপার, মহেন্দ্র সিং ধোনিদের চোখে মুখেও ভেসে উঠেছিল আগাম উৎসবের ছবি! অথচ ওয়াংখেড়ের আলোচিত সেমিতে ‘নায়ক’ লেন্ডল সিমন্সÑ সেই সিমন্স যিনি দু’দিন আগেও দলের সঙ্গে ছিলেন না। ত্রিনিদাদে নিজের বাড়িতে বসে টিভিতে টি২০ বিশ্বকাপের খেলা দেখছিলেন। সেই তিনিই ৮২* রানের দুরন্ত ইনিংস খেলে উইন্ডজকে এনে দিলেন ৭ উইকেটের বিশাল জয়, তুলে নিলেন ফাইনালে!

মূলত ফিট না হওয়ায় টি২০ বিশ্বকাপের দলে ছিলেন না ৩১ বছর বয়সী সিমন্স। সতীর্থ আন্দ্রে ফ্লেচারের ইনজুরিতে সুযোগ পেয়েছেন। সেটিও নাটকীয়ভাবে। সেমির মাত্র দু’দিন আগে প্রধান নির্বাচক ক্লাইভ লয়েডের ফোন। ভারতে যখন দিন, সহস্র মাইল দূরে ক্যারিবীয় দ্বীপে তখন রাত। দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তির পর মুম্বাইয়ে পৌঁছে মাত্র এক বেলার অনুশীলন। মাঠে নেমে কী কা-টাই না করলেন, অবিশ্বাস্য ব্যাটিংয়ে দলকে তুলে নিলেন দ্বিতীয় শিরোপার দ্বারপ্রান্তে। ৫১ বলে অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংসটি সাজালেন ৭ চার ও ৫ ছক্কায়! তাতে ভারতীয় বোলার-ফিল্ডারদের ব্যর্থতার দায়ও কম নয়। তবে দিন শেষে সেটি আর কে মনে রাখে? ম্যাচ শেষে সিমন্সের উদ্দেশে সাংবাদিকদের প্রথম প্রশ্নটাই ছিল, দু’দিনে এত পথ ভ্রমণ, মাঠে নামার আগে ভাল ঘুমাতে পেরেছিলেন? ‘এই ম্যাচের জন্য ভালভাবেই বিশ্রাম নিয়েছি। দুটি ফ্লাইটে বিমানের ভেতর বেশ ঘুমিয়ে নিয়েছি! এখানে আসার পর এক রাত, অনুশীলনের পর আরও চার ঘণ্টা সময় পেয়েছিলাম।’

সিমন্সের জন্য ইতিবাচক, বিশ্বকাপের দলে না থাকলেও ক্রমশ ফিট হয়ে মুম্বাইয়ে রওনা দিতে ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। কারণ ক’দিন পর শুরু হতে যাওয়া আইপিএলে খেলবেন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে হয়ে। এমন কি বিমানের টিকেটও করে রেখেছিলেন, সেই টিকেটটা যে বিশ্বকাপের সেমিতে এভাবে কাজে লেগে যাবে, সেটি হয়ত ভাবেননি। সতীর্থ ডোয়াইন ব্রাভো উচ্ছ্বসিত, ‘প্লেন থেকে নেমেই এমন ব্যাটিংয়ে দলকে জেতানো! লেন্ডল সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন।’ ম্যাচে ভাগ্যও সিমন্সের সঙ্গে ছিল। নইলে এভাবে তিন-তিনবার জীবন পান? সপ্তম ওভারে ব্যাট করছিলেন ১৮ রান নিয়ে। অশ্বিনের বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন শর্ট থার্ড থার্ডম্যানে। সেটি দারুণভাবে ধরেই উল্লসে ফেটে পড়েন জাসপ্রিত বুমরা। সিমন্স হাঁটাও শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু আম্পায়াররা তাকে থামালেন। টিভি রিপ্লেতে দেখা গেল, সেটি ‘নো’ বল। ৫০ রানে আবার হার্দিক পান্ডিয়ার বলে ক্যাচ তুলে দিলেন সিমন্স। কভারে অশ্বিন ক্যাচটা ধরতেই উল্লাসে ফেটে পড়ল ওয়াংখেড়েÑ এবারও নো বল!

৬৮ রানের মাথায় অবশ্য আর নো বল নয়, তবে এবার বেঁচে গেলেন অন্যভাবে। ৩ ওভারে তখন ৩২ রান চাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের। অফ স্টাম্পের বাইরে বুমরার প্রথম তিন বল ব্যাটই লাগাতে পারেননি। চতুর্থ বলে বল তুলে দিলেন ওয়াইডিশ লং অফে। জাদেজা বলটা ধরে আর তাল সামলাতে পারলেন না। ছুঁড়ে দিলেন কোহলির দিকে, সেটা কোহলি লুফেও নিলেন। আউট! বেরিয়ে যাওয়ার পথে আবারও দাঁড়ালেন সিমন্স। আবারও টিভি আম্পায়ার জানালেন, এখানেই সিমন্সের শেষ নয়! বলটা ধরার সময় জাদেজার পা সীমানা ছুঁয়েছে। ‘ড্যাসিং’ ইনিংসে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মুম্বাইয়ে ভারত হারল মুম্বাইয়ের ঘরের ছেলের কাছে! এদিন তার একেকটা বাউন্ডারি আছড়ে পড়ছিল আর বড় বড় চোখ নিয়ে তাকাচ্ছিলেন গ্যালারির এক বিশেষ দর্শক। নীতা আম্বানি, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের কর্ণধার। মুম্বাইর ছেলে এভাবে মুম্বাইকে কাঁদাবে, কে ভেবেছিল?

২০১৪ আইপিএলে সিমন্সকে দলে নেয় মুম্বাই ইন্ডিয়ানস। হয়ে ওঠেন গ্রেট শচীন টেন্ডুলকরের ছায়াধন্য দলটির জনপ্রিয় একজন। মুম্বাইয়ের একজন হয়ে কাঁদালেন গোটা ভারতকে! ওয়াংখেড়ে হোম ভেন্যু হওয়ায় প্রত্যেকে আইপিএলে এখানেই মুম্বাইকে অর্ধেক ম্যাচ খলতে হয়। সিমন্সের কাছে এই মাঠ, এই উইকেট, একেবারে নখদর্পণে। বিশ্বকাপের সেমির মতো উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচেও তাই মোটেই সমস্যা হয়নি ‘আমি তো এমনিতেই এখানে আসতাম। শুক্রবারে মুম্বাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার কথা ছিল, আইপিএলের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাকে যখন দল থেকে ডাকা হলো, ভাবলাম, ক’দিন আগে গেলে সেটা আইপিএলেরও প্রস্তুতির জন্য ভাল হবে। আমি এ মাঠটাকে আমার হোম গ্রউন্ডই মনে করি। এখানকার কন্ডিশনও খুব ভাল জানি, ভাল পড়তে পারি।’