১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুইরঙা কাপড়ের জন্য

  • সুমাইয়া মিফরা

দেখতে দেখতে চুয়াল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে। একটু আগে যে সূর্যটা উঠেছে ঠিক তাকে নিজেদের করে পাওয়ার জন্য চুয়াল্লিশ বছর আগে কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল, তা ভাবতেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন বিদ্যাময়ী স্কুলের বাংলা মিস জারিন জাকারিয়া। বাংলা মিসের বাবার নাম জাকারিয়া যুক্ত করেই ওনার নাম রাখা হয়েছিল। নিজের এক ছোট মেয়ে রাফিয়াকে ঘুম থেকে তুলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল ১৯৭১ সালের এই দিনটির কথা। সে যেমন তার মেয়েকে ডেকে তুলছে চুয়াল্লিশ বছর আগে ঠিক এমন দিনে এ রকম একটি সময়ে বাবা তাকে ডাকছিল ‘ঘুম থেকে ওঠো জারিন, তাড়াতাড়ি ওঠো’।

কথাগুলো ভাবতেই ভিজে আসছিল বাংলা মিসের চোখ। তিনি ভেজা চোখেই ছোট মেয়ে রাফিয়াকে ডেকে তুললেন। রাফিয়ার বয়স তেরো বছর। মা বলতে সে পাগল। ছুটির দিনেও মা তাকে শান্তিমতো ঘুমাতে না দিয়ে ডেকে তুলছে দেখে তার বিরক্ত লাগছিল। কিন্তু আধো ঘুমে মায়ের চোখে চোখ পড়তেই ছোট্ট রাফিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই মায়ের ওপরের সবটুকু রাগ উবে গেল। চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেল। মাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে জিজ্ঞেস করল আম্মু তোমার কি হয়েছে? তুমি কাঁদছো কেন? বাবা বকেছে তোমাকে? ঠিক আছে আমি একখুনি বাবাকে শাসন করব। রাফিয়ার কথা শুনে বাংলা মিস হেসে দিলেন। মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে ওর বিছানায় বসতে বসতে চুয়াল্লিশ বছর আগের সেই ভোরে ঘুম থেকে ওঠার কথা বললেন।

“সেদিন ছিল ২৫ মার্চ। আমি আমার রুমে ঘুমিয়ে ছিলাম। আতঙ্কিত কণ্ঠে বাবা বার বার আমায় ডাকছিলেন। আধো ঘুম চোখে আমি বাবার সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুই জানিনা কি হচ্ছে। কোথায় যাচ্ছি? কেন যাচ্ছি? চারদিকে শুধু গুলির শব্দ। পালাতে পালাতে একটা আধপোড়া ভাঙ্গা ঘরে হয়েছিল আমাদের আশ্রয়। আমি বুঝতে পারিনি আমাদের ওরকম দালান ফেলে রেখে কেন আমরা একটা ভাঙ্গা ঘরে ঠাঁই নিলাম। বলতে বলতে মাঝে মাঝে চোখ মুছলেন জারিন জাকারিয়া। রাফিয়া তখন মায়ের মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আবার বলতে শুরু করেন তিনি, ভয়ে গুটিশুটি মেরে বসে ছিলাম বাবার পাশে। সেদিন বাবার সঙ্গে ছিল একটি রেডিও। কিভাবে যেন এত তাড়াহুড়োর মধ্যে বাবা রেডিওটা নিতে ভুল করেননি। কিছুদিন থেকেই দেখেছিলাম বাবা রেডিওতে কান পেতে কি যেন শুনতে চেষ্টা করছেন। রেডিও চালাতেই হঠাৎ ভেসে আসলো বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ। তখন আমি জানতাম না ওটা বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ। বঙ্গবন্ধু কে তাই তো জানতাম না। বাবা একটু একটু করে বলেছিলেন তার কথা। তার গলায় ধ্বনিত হচ্ছিল কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। বাঙালীর মুক্তির কথা। সেদিন কথাগুলোর মানে আমি হয়তো ঠিকমতো বুঝিনি, তবে বুঝেছিলাম আমাদের জন্যই কিছু করার কথা বলছিলেন তিনি।

ঠিক ২৬ মার্চ থেকেই শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এক সন্ধ্যায় বাবা আমার হাতে দুরঙা একটি কাপড় দেন। আমার কপালে মুখে চুমু দিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন আমি যেন এ কাপড়টি যতœ করে রাখি। এটি নিয়ে একদিন একসঙ্গে বিজয় উপভোগ করব। তারপর বাবা বেরিয়ে গেলেন। মায়ের চোখ ভিজে উঠল এবং আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। যখন একদিন দুদিন পরে বাবা আর ফিরলেন না তখন বুঝলাম বাবা যুদ্ধে গেছেন। বাবার দেয়া ঐ কাপড়টি যেনতেন কাপড় নয়। সেটি ছিল আমাদের জাতীয় পতাকা। শুরু হয় দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ীর বেশে ফিরে আসে বাঙালীরা।

দ্বার খুলে অপেক্ষার প্রহর গুনি কখন আসবে বাবা। সেদিন বাবা এসেছিলেন তবে জীবিত নয়। তার শহীদ হওয়ার সংবাদটাই শুধু কানে এসেছিল। সবার দেখাদেখি আর বাবার আদেশ মতো পতাকাটি লাগিয়ে দেই ছাদে। বেশি কিছু না বুঝলেও এতটুকু বুঝেছি আমরা স্বাধীন, আমরা মুক্ত। বিজয়টা উপভোগ করেছি ঠিকই তবে জীবিত নয়, মৃত বাবার স্মৃতি বুকে নিয়ে।

প্রতি বছর ২৬ মার্চ সকালে তোমাকে যখন ঘুম থেকে ওঠাই তখন বাবার মুখটা ভেসে ওঠে। মনে পড়ে ১৯৭১ সালের সেই সকালটার কথা। চোখের পানি আটকাতে পারে না জারিন জাকারিয়া। ছোট্ট রাফিয়ার চোখেও পানি চলে আসে। ছোট্ট হাতে মায়ের চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে মাকে সে জড়িয়ে ধরে। বড় ভাইয়ার ঘরের টিভি থেকে তখন ভেসে আসছিল “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না।”

দিনাজপুর সরকারী বালিকা বিদ্যালয়, দশম শ্রেণী

দিনাজপুর