১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খুনের ধারায় গ্রেফতার নির্মাণ সংস্থার ৩ কর্তা

খুনের ধারায় গ্রেফতার নির্মাণ সংস্থার ৩ কর্তা

অনলাইন ডেস্ক ॥ বৃহস্পতিবার সকালে বিমের উপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসাতে গিয়ে ঢালাই করার সময়ে বেশ কয়েকটি নাটবল্টু খুলে বেরিয়ে এসেছিল। শ্রমিকেরা তখন নির্মাণকারী সংস্থার কর্তাদের সতর্ক করে জানান, কাজ বন্ধ করাই উচিত, না হলে বিপদ হবে। কিন্তু সংস্থার কর্তারা জানিয়ে দেন, কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আর তার পরেই নির্মীয়মাণ বিবেকানন্দ উড়ালপুলে বিপর্যয় হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জেনেছে কলকাতা পুলিশ।

আর সেই জন্য অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানো নয়, একেবারে খুনের অভিযোগে মামলা রুজু করে বিবেকানন্দ উড়ালপুল বিপর্যয়ের ঘটনায় নির্মাণকারী সংস্থার তিন কর্তাকে গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশ। নির্মীয়মাণ উড়ালপুল ভেঙে মৃতের সংখ্যা এ দিন দাঁড়িয়েছে ২৪।

এ দিন দুপুরে ওই সংস্থার ১০ জন কর্তাকে লালবাজারে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। তাঁদের মধ্যে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি সাত জনকে অবশ্য ছেড়ে দিয়েছে পুলি‌শ। তবে সংস্থার এক আঞ্চলিক প্রধান পলাতক, তাঁর খোঁজে তল্লাশি চলছে বলে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন।

কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ দমন) দেবাশিস বড়াল বলেন, ‘‘উড়ালপুল বিপর্যয়ের ঘটনায় নির্মাণকারী সংস্থার তিন কর্তা—মল্লিকার্জুন রাও, প্রদীপকুমার সাহা ও দেবজ্যোতি মজুমদারকে আমরা গ্রেফতার করেছি।’’ গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ওই তিন জনই সংস্থার তরফে সরাসরি বিবেকানন্দ উড়ালপুল নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিলেন। এঁদের মধ্যে মল্লিকার্জুন প্রোজেক্ট ম্যানেজার, প্রদীপ সাহা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও দেবজ্যোতি মজুমদার সাইট ইন-চার্জ। আজ, শনিবার ধৃতদের ব্যাঙ্কশাল কোর্টে হাজির করাবে পুলিশ।

নির্মাণকারী সংস্থা ‘আইভিআরসিএল’-এর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুধীর রেড্ডি-সহ শীর্ষকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছে। কাল, রবিবারের মধ্যে তদন্তকারীদের সামনে হাজির হতে বলা হয়েছে। এ দিন হায়দরাবাদে সংস্থার সদর দফতরে গিয়ে নোটিস ধরিয়ে দিয়ে এসেছেন লালবাজারের গোয়েন্দারা। ওখান থেকে সংস্থাটির এই প্রকল্প সংক্রান্ত কিছু নথিপত্রও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

আমরি হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে ৯২ জনের প্রাণহানির ঘটনাতেও পুলিশ খুনের মামলা রুজু করেনি। ওই ঘটনায় অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছিল। এক গোয়েন্দা-কর্তার বক্তব্য, ‘‘এমন কয়েক জন শ্রমিককে পেয়েছি, যাঁরা নাটবল্টু খুলে আসার পর বৃহস্পতিবার সকালে সংস্থার কর্তাদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করলেও কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়। সেই জন্যই আমরা সংস্থার কর্তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করেছি।’’ শুক্রবার গভীর রাতে গ্যাস কাটারের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা একটি লরির মধ্যে থেকে এক খালাসির মৃতদেহ বার করে আনা হয়। আর কেউ আটকে নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে ওই নির্মাণ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল কার গাফিলতি, কার অবহেলা এবং কাদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে, সেটা খুঁজে বার করার জন্য ডিসি ডিডি টু নগেন্দ্র ত্রিপাঠীর নেতৃত্বে ২৩ জনের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (স্পেশ্যাল ইনভেস্টিগেশন টিম) গঠন করল লালবাজার। বিমের উপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসাতে গিয়ে ঢালাইয়ের সময়ে নাটবল্টু খুলে যাওয়ার পরেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার ফলে বিপর্যয় হয়েছে বলে জেনেছেন গোয়েন্দারা। নকশায় গোলমাল ছিল কি না কিংবা ইমারতি দ্রব্যের গুণমান কেমন ছিল, এই সব ব্যাপারেও বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত লালবাজারের তদন্তে জানা গিয়েছে, ই এম বাইপাস লাগোয়া আনন্দপুরে নির্মাণকারী সংস্থার একটি মিক্সিং প্ল্যান্ট রয়েছে। সেখান থেকে বৃহস্পতিবার দুপুরেও ঢালাইয়ের মশলা এসেছিল।

উড়ালপুল নির্মাণের সামগ্রীতে নির্মাতা সংস্থা আপস করেছিল কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে। ফরেন্সিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা হবে বলে লালবাজার সূত্রে খবর। বিবেকানন্দ উড়ালপুল কেন ভাঙল, তার কারণ খুঁজে বার করতে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা শুক্রবার ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন। রাজ্য ফরেন্সিক বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট চিত্রাঙ্ক সরকার বলেন, ‘‘উড়ালপুলের ভেঙে যাওয়ার অংশের টুকরো সংগ্রহ করছি। ল্যাবরেটরিতে খতিয়ে দেখা হচ্ছে উড়ালপুলের বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত সামগ্রীর গুণমানে ফারাক আছে কি না।’’

সেই সঙ্গে উড়ালপুলের কোন অংশে প্রথম ভাঙন ধরে সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা যেমন, কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রিট ও রবীন্দ্র সরণির ঠিক মুখে উড়ালপুলের একটি স্তম্ভ বা পায়ারের দিকে আঙুল তুলছেন। রাস্তার সংযোগস্থলে ঠিক প্যাঁকাটির মতো মট করে ভেঙে প্রায় ‘ভি’ আকারে বেঁকে আছে সেই থামটি। তার পিছনেই ঢালু হয়ে রয়েছে উড়ালপুলের ভেঙে যাওয়া অংশ। ফরেন্সিক বিজ্ঞানী চিত্রাঙ্কবাবুর কথায়, ‘‘মনে হচ্ছে ৪০ নম্বর পায়ার থেকে গোলমালের শুরু। ঘটনাস্থল থেকে উড়ালপুলের ভাঙা অংশ ছাড়াও রক্তের দাগ ইত্যাদি তথ্যপ্রমাণও সংগ্রহ করা হয়েছে।’’

তবে পুলিশের একটি সূত্রের খবর, যে সব অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছে, তাতে এ ক্ষেত্রে কেএমডিএ-র কয়েক জন কর্তা ও ইঞ্জিনিয়ারও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়বেন।

কারণ, খুনের মামলার সঙ্গে জুড়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারাও। এর ফলে মামলায় নির্মাতা সংস্থার সঙ্গে সঙ্গে তদারকির দায়িত্বে থাকা কেএমডিএ এবং ইমারতি সামগ্রী সরবরাহের দায়িত্বে থাকা সংস্থাও অভিযুক্ত হবে বলে মনে করছেন লালবাজারের কর্তারা। পুলিশ সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার রাতে পোস্তা থানায় দায়ের করা অভিযোগপত্রে তিনটি ভাগ রয়েছে। তাতে নির্মাতা সংস্থার পাশাপাশি নিম্নমানের ইমারতি মালপত্র এবং তদারকির অভাব রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

কেএমডিএ কিংবা স্থানীয় ঠিকাদার সংস্থার কাউকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করেননি তদন্তকারীরা। তবে পুলিশ সত্যি সত্যিই কেএমডিএ-র কর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন লালবাজারের একাংশ। তাঁরা বলছেন, কেএমডিএ-র মাথায় রয়েছেন খোদ পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। ইমারতি দ্রব্য সরবরাহকারী হিসেবে নাম উঠে এসেছে তৃণমূল নেতা সঞ্জয় বক্সী এবং স্থানীয় বিধায়ক স্মিতা বক্সীর আত্মীয়ের সংস্থার নাম। ভোটের আগে এই সব জায়গায় হাত দিয়ে কি শাসক দলকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলবে লালবাজার? পুলিশকর্তারা অবশ্য সদুত্তর দিতে পারেননি।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা