১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তারা আবার মিথ্যাচার ও অপপ্রচারে নেমেছে!

  • একে মোহাম্মাদ আলী শিকদার

গাড়িতে যারা চলাফেরা করেন এবং কায়িক পরিশ্রম নেই, তাদের জন্য দৈনিক একবেলা অন্তত কিছুটা সময় হাঁটার অপরিহার্যতা সম্পর্কে মানুষ এখন অনেক সচেতন। অবসরপ্রাপ্ত ও বাধাধরা কাজের মধ্যে যারা নেই তাদের জন্য এটা এখন ঢাকা শহরের এক প্রকার ফ্যাশন ও ভাল আড্ডার উপলক্ষ। আমাদের আবাসিক এলাকার হাঁটার জায়গাটি খুবই চমৎকার ও মনোরম। মসজিদের সামনে বড় একটা পুকুরের চারপাশ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে শুধুমাত্র হাঁটার জন্য রাস্তা করা হয়েছে। হাঁটা শেষ করে পুকুর পাড়ের গাছের ছায়ায় পরিপাটি বেঞ্চের ওপর বসার সঙ্গে সঙ্গে এক প্রস্থ আরামদায়ক বাতাস এসে গা-টা যেভাবে জুড়িয়ে দেয় তার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। প্রকৃতির শক্তি ও ভালবাসা দুটোই একসঙ্গে উপলব্ধি করা যায়। সামরিক-বেসামরিক অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ও ব্যবসায়ী লোকজনই এখানে বসবাস করেন। রাজনৈতিকভাবে প্রায় সবাই সচেতন এবং ওয়াকিবহাল। ছোট এলাকা হওয়ায় মোটামুটি সবাই একে অপরের পরিচিত। কয়েক দিন আগে হাঁটার সময় হঠাৎ করে কানে এলো একজন সিনিয়র অবসরপ্রাপ্ত অফিসার সঙ্গী অন্য দু’জন অফিসারকে বোঝাচ্ছেন যে, সরকার নতুন একটি আইন করতে যাচ্ছে তাতে সরকার সম্পর্কে সমালোচনা করলে বা বিরুদ্ধে কথা বললেই পাঁচ বছরের জেল হবে। বাকি দু’জনও প্রথম বক্তার কথায় সায় দিচ্ছেন এবং একজন আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলছেন, যা চলছে তাতে দেশে ধর্ম-কর্ম বলতে আর কিছু থাকবে না। কথাগুলো সঙ্গত কারণেই আমার কানে বেজে উঠল। কারণ, বাসায় নিজ খরচে সাত-আটটা পত্রিকা রাখি, দেশ-বিদেশের টেলিভিশনের খবর মিস করি না, কই আমি তো এরকম কোন খবর এ পর্যন্ত কোথাও দেখিনি। সংবাদ মাধ্যমের অনেক পরিচিতজনের সঙ্গে প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু কথা হয়, তাদের মুখেও এমন খবরের কথা শুনিনি। সবাই পরিচিত হওয়ায় উৎসুক মনে তাদের কাছে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করে বিষয়টি জানতে চাইলাম। প্রথম বক্তা আমাকে সেই একই আইনের কথা আবার শোনালেন। খবরের উৎস জানতে চাইলে বললেন, ফেসবুক ও ইন্টারনেটে নাকি এরকম খবর বেরিয়েছে। বাকি দু’জনও প্রথমজনকে সমর্থন দিচ্ছেন। মহাফাঁপড়ে পড়লাম। এতবড় একটা খবর পত্রিকায় বা টেলিভিশনে এলো না কেন? তবে আরেকটু ঘাটাতেই আসল কথা বের হয়ে এলো। বেশ কয়েকদিন আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শ ও ইতিহাস বিকৃতিরোধে শীঘ্রই একটা আইন আসছে, যার মাধ্যমে এই অপরাধে অপরাধী ব্যক্তিকে পাঁচ বছর পর্যন্ত শাস্তি দেয়া যাবে। কথায় বুঝলাম তারা এটাকেই বলছেন সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার কথা। তারাও স্বীকার করলেন এটাই বিষয়। তিনজনকেই আগের থেকে চিনি বিধায় তাদের এই আলোচনার উদ্দেশ্য নিয়ে আর কোন সন্দেহ রইল না। আমি শুধু বললাম, মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শ, তার ঘোষণাপত্র এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধ্রুবতারাসম উজ্জ্বল ঘটনাবলীর সঙ্গে সরকারকে মিলিয়ে ফেলা আরেকটি ভয়ানক বিকৃতি ছাড়া অন্য কিছু নয়। এটা দেশের ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। এই রকম অপরাধ ঠেকানোর জন্যই আইনের প্রয়োজন, যার উদাহরণ ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশে আছে। তারা একথা মানতে নারাজ। প্রথমজন বিজ্ঞের মতো বললেন, সময়ের সঙ্গে সব কিছুই পরিবর্তনযোগ্য। তাকে বললাম, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কিভাবে পরিবর্তন করবেন, জাতির পিতার নাম কিভাবে পরিবর্তন করবেন। পৃথিবীতে অনেক কিছুই পরিবর্তনশীল, আবার মানুষের জন্মের দিন, তারিখ, ঘটনা, জন্ম সময়ের দাত্রী ও পিতার নাম কখনও পরিবর্তন হয় না। পিতার নাম পরিবর্তন হয়ে গেলে তাতে ভিন্ন অর্থ বোঝায়। যা হোক উগ্র সাম্প্রদায়িক চেতনায় অন্ধ মানুষজনের সঙ্গে রাস্তাঘাটে এসব নিয়ে কথা বলা ভদ্রজনিত নয় ভেবে সেদিন আর কথা বাড়াইনি। তারপর আরও কিছু সময় একা একা হাঁটলাম। তখন মনে পড়ল ২০১৩ সালের কথা। মক্কা শরীফের গিলাপ পরিবর্তনের সময় সেখানকার খাদেমগণ গিলাপ হাতে সারিবদ্ধভাবে যে ছবি তোলেন সেটি পত্রিকায় ছাপিয়ে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান নিচে ক্যাপশন লিখেছিলেনÑ মক্কার খাদেমগণ সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করছেন। ভেবে দেখলাম আমার ওই পরিচিত তিনজনের মতো মানুষের সংখ্যা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে অনেক আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে এরা বড়জোর কেরানি হয়ে পাঞ্জাবিদের লাথি-গুতা খেতেন। কিন্তু আজ তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে বড় অফিসার হয়ে বড় অট্টালিকায় বসবাস করছেন, কিন্তু পাকিস্তানী বীজ মাথায়Ñ মনে ধারণ করে এখনও কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধের সবকিছুকে ছোট ও অবমাননা করেন এবং সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী চিন্তার প্রচার চালান ও কথায় কথায় পাকিস্তানের মতো ভারত বিদ্বেষ ছড়ান। একাত্তরে সক্ষমতা ও সকল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এরা মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। ভীরু কাপুরুষেরা সাহসী বীরের সফলতার পরশ্রীকাতরতায় ভোগে এবং বীরের বীরত্বের ত্রুটি বের করার চেষ্টা করে। এরা হলো সেই শ্রেণীর মানুষ। স্বাধীনতার পর যারা চাকরিতে ঢুকেছেন তারা দুই শ্রেণীর কর্মকর্তাদের দ্বারা পাকিস্তানী সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন। একাত্তরের পুরো সময় বাংলাদেশে অবস্থান করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব বাঙালী সামরিক-বেসামরিক অফিসারগণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছেন পরবর্তীতে তারাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে পাকিস্তানী সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানোর প্রধান কাজটি করেছেন। সঙ্গতকারণে আত্মদহনে এরাই ভয়ানক পরশ্রীকাতরতা ও হীনম্মন্যতায় ভুগেছেন। এদের মধ্যে সামরিক অফিসার ৯৮ জন, পুলিশের শুধুমাত্র অতিরিক্ত এসপি ও তার উর্ধের ১০৪ জন এবং বেসামরিক প্রশাসনের ছিলেন ২৯৬ জন (সূত্রÑ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, এএসএম সামছুল আরেফিন)। এত সংখ্যক অফিসার তখন পাকিস্তানীদের সহযোগিতা না করলে তাদের পতন আরও ত্বরান্বিত হতো। এত অবাধে তারা গণহত্যা চালাতে পারত না।

স্বাধীনতার পর দু’চারজন বাদে এরা সবাই ১৬ ডিসেম্বর যে যেখানে ছিলেন সেখানেই চাকরিতে বহাল থাকেন এবং সব সুযোগ-সুবিধাসহ সর্বোচ্চ পদে পেয়ে বাংলাদেশে আরও ২৫-৩০ বছর চাকরি করেছেন। ১৯৭৩ সলে পাকিস্তান থেকে বাঙালী সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ প্রত্যাবর্তনের পর এদের পাল্লা এত ভারি হয়ে যায় যে, রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। মুক্তিযোদ্ধারা ছিটকে পড়েছেন, আর ওই দুই শ্রেণীর অফিসারগণ ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল অঙ্গনে প্রাধান্য বজায় রেখেছেন, প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়েছেন। এদের শিষ্যরা অনেকেই অবসরে গিয়েছেন এবং অনেকেই এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গার অধিকর্তা হয়ে আছেন। ১৯৭৫ সালের পর জিয়া, এরশাদ, বিএনপি ও জামায়াত-বিএনপির দীর্ঘ শাসনামলে এরা মাত্রা অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়ে সর্বক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যন্ত ডালপালা ছড়িয়েছেন। ১৯৭২ সাল থেকেই আমলাতন্ত্রের বহুবিধ কলাকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের মূল দর্শন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার পথে এরাই প্রধান বাধা সৃষ্টি করেছেন এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বিনষ্ট করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। তারা যে বহুলাংশে সফল হয়েছেন তারই একটা ছোট প্রমাণ সেদিন সকালে হাঁটার সময় আমি দেখেছি। বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের দাবি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত আইনকে এরা বিকৃতভাবে উপস্থাপন ও প্রচার করে মানুষকে উসকে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন- মুজিব পাকিস্তানী মন্ত্রে দীক্ষিত প্রশাসন, যারা ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় বসে পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করেছে তাদেরকে দিয়ে তুমি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়তে পারবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর মহান মহানুভবতার চরম মূল্য দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। একজন পরিণত মানুষের বিশ্বাস, সেটাকে চেতনা, আদর্শ, দর্শন, মূল্যবোধ যা-ই বলি না কেন সেটাই তার সকল কাজের মূল চালিকাশক্তি। সেখান থেকে সে সরে আসতে পারে না, মুক্ত হতে পারে না, এটাই মনুষ্য চরিত্রের সহজাত নিয়ম। বাহ্যিকভাবে, সাময়িক লাভের জন্য মুখে যা-ই বলুক না কেন, যতই চাটুকারিতা করুক, সময় ও সুযোগ পেলেই যে তারা স্বরূপে আবির্ভূত হয় তার বহু উদাহরণ এই স্বাধীন বাংলাদেশেই সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজ ঐতিহাসিকের হাতে ভারতের যে ইতিহাস বিকৃতি, সে সম্পর্কে একবার প-িত নেহরু মন্তব্য করেছিলেন- ‘ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতবর্ষ দু’শ’ বছর ধরে শাসন করছে, তাতে যতটা ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকেরা যেভাবে ভারতের ইতিহাস ও জাতীয় চরিত্রের বিকৃতি ঘটিয়েছে তাতে’ (সূত্র-আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ইতিহাসের রক্ত পলাশ, পৃঃ ৮৪)।

প-িত নেহরুর এই উক্তিটি বাংলাদেশের জন্য আজ শতভাগ প্রযোজ্য। জিয়া, এরশাদের সামরিক শাসনামলে এবং পরে বিএনপি এবং সর্বশেষ জামায়াত-বিএনপির শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সীমাহীন বিকৃতি ঘটেছে। এর ফলে গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। এই ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে হত্যার চেষ্টা করেছেন, যে রাষ্ট্র পাওয়া গেছে ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে এবং ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানের শোষণ, নির্যাতন নিপীড়ন সহ্যের প্রতিদান হিসেবে। তাই আগামীতে কেউ যাতে আর ক্ষতি না করতে পারে তার জন্য শক্তিশালী আইন এখন অতি জরুরী হয়ে পড়েছে। শুনেছি প্রস্তাবিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি রাখা হয়েছে মাত্র পাঁচ বছর। এটা ৩০ লাখ শহীদের আত্মার সঙ্গে প্রহসনের শামিল হবে। একজন মানুষকে হত্যা করলে ফাঁসি হয়। আর একটা জাতি রাষ্ট্রকে হত্যা চেষ্টার শাস্তি মাত্র পাঁচ বছর হতে পারে না। আইন প্রণেতাগণ যেন সতর্ক থাকেন। এই প্রক্রিয়ায় জড়িতগণের মধ্যে যেন কোন বিভীষণ না থাকে। লখিন্দরের বাসর ঘর তৈরি করার রাজমিস্ত্রি গোপনে সাপ প্রবেশের ছিদ্র রেখে দিয়েছিলেন, যা কেউ টের না পাওয়ায় বাসর ঘরেই লখিন্দরের জীবন যায় সর্পের দংশনে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন তৈরির অভিজ্ঞতা আমাদের খুব ভাল নয়। এই আইনের ছিদ্র দিয়ে কুখ্যাত নরহত্যাকারী কসাই কাদের মোল্লা বের হয়ে যেতে চেয়েছিল। তবে শুধু আইন করে এই অপপ্রচারকারী, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতা ঘোষণা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এখন সংবিধানের অংশ। তারপরেও ওই চক্র তাদের রাজনৈতিক ও অর্থ শক্তির জোরে এগুলোকে অবমাননা ও অবজ্ঞা করে চলেছে। একমাত্র ঐক্যবদ্ধ তারুণ্যের জোয়ারই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আবর্জনাকে ভাসিয়ে দিতে পারে। তাই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচী রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশব্যাপী সারাবছর ধরে ব্যাপকভাবে চালাতে হবে।

লেখক : ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক