২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের ঘরে

  • ঋণ ও আমানতের গড় সুদহার ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ

রহিম শেখ ॥ বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। সেই বাধা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ। আগের মাসেও যা ছিল ১১ দশমিক ০৫ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদহার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে সুদহার কমানোর পর এবার ঋণে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর এমডিরা বৈঠক করে সব ধরনের ঋণে ১ থেকে ২ শতাংশ সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানতের সুদহার ফেব্রুয়ারি মাসে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও বেসরকারী ও বিদেশী ২৭ ব্যাংকের স্প্রেড এখনও ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বেসরকারী খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের। এরপরে রয়েছে বিদেশী খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের।

সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের দীর্ঘদিনের দাবি ব্যাংক ঋণের সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। সুদহারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ব্যাংকগুলোকে সুদহার কমিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়ে আসছে। গত কয়েক মাস ধরে আমানত ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রে সুদ হার কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ এবং স্প্রেড ৪ শতাংশের কাছাকাছি নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইএ’র সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদহার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ী সমাজ। এই সুদহার ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসছে ব্যবসায়ীরা বাঁচবেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় ব্যাংক ঋণের সুদহারও কিছুটা কমে এসেছে। তবে সেটা কাক্সিক্ষত মাত্রায় নয় বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ২ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ সুদ। স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিশেষায়িত ব্যাংকের স্প্রেড সবচেয়ে কম মাত্র ১ দশমিক ৭৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ সুদ। এই খাতের ব্যাংকগুলোর ঋণের ক্ষেত্রে ভারিত গড় সুদহার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারী ব্যাংকগুলো ঋণের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ সুদ। স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিদেশী ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ সুদ দিয়ে ঋণের বিপরীত আদায় করছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ সুদ। এ খাতের ব্যাংকগুলোর স্প্রেড সবচেয়ে বেশি ৭ দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না ২৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর মধ্যে ১টি সরকারী, ১৯টিই বেসরকারী ও ৬টি বিদেশী ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণের সুদের হার কমাতে ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ রয়েছে। যেসব ব্যাংকে বেশি ব্যবধান রয়েছে তাদের নামিয়ে আনার জন্য একাধিকবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বেসরকারী খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে বিদেশী খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধানের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বেসরকারী খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। তাদের এই ব্যবধান ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এই ব্যাংকটিও খুব কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে। আবার ঋণের সুদের হার বেশি। যে কারণে তাদের স্প্রেডও বেশি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ওয়ান ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

চতুর্থ অবস্থানে থাকা উত্তরা ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা আইএফআইসি ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ, সিটি ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৫ দশমিক ২১ শতাংশ, যমুনা ব্যাংকের ৫ দশমিক ২২ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়ার ৫ দশমিক ২১ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ।

নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, এনআরবি ব্যাংকের ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও মেঘনা ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এদিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমার অজুহাত দেখিয়ে বিদেশী ব্যাংকগুলো সঞ্চয়ী হিসাবে সুদ দেয় না। এছাড়া নির্ধারিত ছকের বাইরে টাকা তোলার কারণেও সুদ দেয় না। এসব কারণে বিদেশী ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে কোন সুদ পায় না।

বিদেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের স্প্রেড ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ, সিটি ব্যাংক এনএ’র ৭ দশমিক ২১ শতাংশ, ব্যাংক ইন্ডিয়ার ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ, এইচএসবিসি ব্যাংকের ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ, স্টেট ও কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ০৬ শতাংশ। উল্লেখ্য, শতাংশ থেকে শতাংশের মধ্যে কমবেশির তুলনা করতে শতাংশীয় পয়েন্ট ব্যবহার করা হয়। যেমন ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশ হলে এটি ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমল বলে বিবেচিত হবে।