২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সৌদিতে বিদ্রোহে ইন্ধন আইএসের

  • অনলাইনে সদস্য সংগ্রহ করে দেশটিতে অনুপ্রবেশ করেছে জঙ্গীরা

তারা কট্টর জঙ্গী ছিলেন না। একজন ছিলেন ফার্মাসিস্ট, আরেকজন হিটিং এ্যান্ড কুলিং টেকনিশিয়ান। আরেক জন হাইস্কুল ছাত্র। তারা ছিলেন ছয় জ্ঞাতি ভাই, সবাই সৌদি আরবে থাকতেন, সবারই একই গোপন মিশন ছিল। তারা ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন এবং তারা আরেক জ্ঞাতিভাই সৌদি সন্ত্রাসদমন বাহিনীর সার্জেন্টকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।

আর তারা তাই করেছিলেন। ফেব্রুয়ারিতে দলটি সার্জেন্ট বাদের আল রশিদিকে অপহরণ করে সৌদি আরবের মধ্যাঞ্চলীয় বুরাইদ শহরের দক্ষিণে এক রাস্তার পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এ দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করার সময় তারা ইসলামের আদর্শ পরিত্যাগ করার দায়ে সৌদি রাজপরিবারকে নিন্দা জানায়।

তারপর তারা মরুভূমিতে পালিয়ে যান। ভিডিও দ্রুত রাজতান্ত্রিক দেশটির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়লে দেশটি হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। অথচ দেশটি সন্ত্রাসী আন্দোলন রোধ করতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এ আন্দোলন সহিংসতার বিস্তার ঘটায় বলেই কেবল নয়, এটি সৌদি আরব প্রচলিত ওয়াহাবি নামে অভিহিত এক রক্ষণশীল সুন্নী মতবাদের কিছু কিছু দিককেও গ্রহণ করেছে বলেও এটিকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক বলে দেখা হচ্ছে। এ আন্দোলনের অনুসারীরা সৌদি রাজতন্ত্রকে অবৈধ প্রতিপন্ন করতেও ঐসব দিককে কাজে লাগাচ্ছে।

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ওয়াহাবি ইতিহাসের এক প-িত কোল বুনজেল বলেন, ওয়াহাবিবাদ ইসলামিক স্টেটের মতবাদের মৌলিক দিক। এটি তাদের ধর্মের প্রকৃতি তুলে ধরে এবং আমার মতে তাদের সমগ্র মতবাদের সবচেয়ে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য। ২০১৪-এর শেষ দিক থেকে এ পর্যন্ত সৌদি আরবে ২০ সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে। এদের মধ্যে সার্জেন্ট রশিদির হত্যাকা-ই এমন তৃতীয় ঘটনা, যেখানে নাগরিকরা গোপনে ইসলামিক স্টেটে যোগ দেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের হত্যা করে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তারা তাদের তৎপরতা সমর্থন করতে গিয়ে বলে যে, সৌদি আরবে ধর্মের বিকৃত রূপেরই চর্চা করা হয়। অথচ সৌদি আরব নিজেকে একমাত্র সত্যিকারের ইসলামী রাষ্ট্র বলে দাবি করে থাকে। ইসলামিক স্টেট এর পূর্ববর্তী আল-কায়েদার মতোই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার উদ্দেশ্যে ধর্মকে বিকৃত করার দায়ে সৌদি রাজতন্ত্রকে অভিযুক্ত করে থাকে। কিন্তু কয়েক বছর আগেই সৌদি আরবে কায়েদা নেটওয়ার্ককে নির্মূল করা হয়েছিল। দলটির নেতৃত্ব বিদেশে অবস্থান করে বেসামরিক মুসলিমের হত্যাকা- নিরুৎসাহিত করেছে। কিন্তু ইসলামিক স্টেট অনলাইনে সদস্য সংগ্রহ করে সৌদি আরবে অনুপ্রবেশ করতে সমর্থ হয়েছে। দলটি দেশটিতে অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশে সুন্নী ও শিয়াদের হত্যা করতে ইচ্ছুক এমন অনুগত সদস্য খুঁজে পেয়েছে। প্রায় ৩,০০০ সৌদি বিদেশের জঙ্গী দলগুলোতে যোগ দিয়েছে, আর ৫,০০০ এরও বেশি সন্ত্রাসের অভিযোগে দেশেই কারারুদ্ধ রয়েছে। ইসলামী জঙ্গী দলগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের এক জটিল ইতিহাস রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে দেশটি বসনিয়া, চেচনিয়া ও আফগানিস্তানের সেখানে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করেছিল মতস্থানগুলোতে এর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এর পক্ষে যুদ্ধ করতে ঐসব দলকে মদদ যুগিয়েছিল। কিন্তু ২০০৩ সালেই সেই মদদ যোগানোর অবসান ঘটে, কারণ তখন আল কায়েদা সৌদি আরবের দিকেই দৃষ্টি দেয় এবং দেশটিতে কয়েক দফা মারাত্মক হামলা চালায়। এখন ইসলামিক স্টেট সৌদি আরবেরই রক্ষণশীল মতবাদের কোন কোন দিককে দেশটির বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়ে এক নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। বছরের পর বছর ধরে শাসকদের প্রতি আনুগত্যের ওপর জোর দিয়ে এবং স্বধর্ম ত্যাগী বলে দেখা হয় এমন ব্যক্তিদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানোর নিন্দা করে ওয়াহাবিবাদকে রাজ পরিবারের স্বর্থে ঢেলে সাজানো হয়েছে। তথাপি ইসলামিক স্টেটের অনেক শত্রুর মধ্যে একমাত্র সৌদি আরবই কোরান ও অন্যান্য ধর্মীয় ভাষ্যকে এর সংবিধান হিসেবে গণ্য করে, স্বধর্মত্যাগ শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করে এবং অননুমোদিত সব ধরনের ধর্ম পালন নিষিদ্ধ করে।

সৌদি পরিবার এবং শেখ মুহম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নামের এক ধর্মীয় নেতার মধ্যকার মিত্রতার ভিত্তিতে দেশটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সৌদি পরিবারের সদস্যরাই বাদশা হন। আর সামরিক বিজয়কে কাফের বলে গণ্য করা হয়েছিল এমন ব্যক্তদের বিরুদ্ধে জিহাদ বলে অভিহিত করে যুুক্তিসঙ্গত প্রতিপন্ন করতে ওয়াহাবের শিক্ষাকে কাজে লাগানো হয়। এসব ব্যক্তির অধিকাংশই ছিল অন্যান্য মুসলিম।

ওয়াহাবের বংশধররা এখনও সৌদি রাষ্ট্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করে আছেন। তারা তাদের দেশের ইতিহাসে সহিংসতার ভূমিকাকে খাটো করে দেখান এবং সর্বক্ষমতাশালী রাজ পরিবারের প্রতি সুবিধাজনক হয় এমন সব বিধানের ওপর জোর দেন। যেমন নেতৃত্বকে মান্য করা। ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস।