১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শীর্ষ দেশের তালিকায়

শীর্ষ দেশের তালিকায়
  • প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা বাড়ছে ;###;সঠিক পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ- অধিকাংশ জরিপে এ মত আসছে

তৌহিদুর রহমান ॥ জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ দমন, ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগের উন্নত পরিবেশ সৃষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রগতির ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে বিশ্বের শীর্ষ দেশের তালিকায় উঠে আসছে বাংলাদেশ। বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন সঠিক পথে এগিয়ে চলছে। বর্তমান সরকারের প্রতিও মানুষের আস্থা বাড়ছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৌশলী হিসেবেও মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারলে অচিরেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হবে।

ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), পিউ রিসার্চ সেন্টার, গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশন, কোফেস, ফরচুন সাময়িকীসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রভাবশালী গবেষণা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হচ্ছে; বাংলাদেশ সঠিক পথে এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী দেশের তালিকায় রয়েছে। বিনিয়োগের জন্যও উত্তম পরিবেশ বিরাজ করছে বাংলাদেশে। এছাড়া বাংলাদেশ অন্যতম নিরাপদ দেশ হিসেবেও বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

পহেলা এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) জরিপের ফলে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বেড়েছে। অধিকাংশ মানুষই মনে করে, বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। তবে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক চরমপন্থাকে তারা চিহ্নিত করেছেন বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে। দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন সঠিক পথে এগিয়ে চলেছে দেশ।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপের ইতিবাচক ফলের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জরিপের ফলে শেখ হাসিনা সরকারের জন্য একটি বিশেষ অগ্রগতি হিসেবে উঠে আসছে। জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বিএনপি-জামায়াত জোটের সংঘাত থেকে দেশকে বেরিয়ে এনে সঠিক পথে পরিচালিত করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে। বিভিন্ন জরিপে সেই বিষয়টিই উঠে এসেছে। এছাড়া বর্তমান সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপে তাদের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইআরআই একটি বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের সর্বশেষ জরিপের ফলে আমি আনন্দিত। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারলে আরও অগ্রগতি হবে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল জনকণ্ঠকে বলেন, আইআরআই জরিপে সাধারণ মানুষের অভিমত প্রতিফলিত হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের সংঘাত থেকে দেশ বেরিয়ে আসায় শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। নির্বাচন ঘিরে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়। জরিপে সেই বিষয়টিই উঠে এসেছে। এই জরিপ শেখ হাসিনা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।

সর্বশেষ আইআরআই জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত বছরের নবেম্বর থেকে তিন মাসে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থাশীল মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীর ৭৩ শতাংশের মতে বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে। এই হার গত বছরের নবেম্বরের তুলনায় ৯ শতাংশ এবং বিগত দুই বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি।

চলতি বছর ৪ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে দেশের আটটি বিভাগের সব জেলাশহর ও গ্রামাঞ্চলের দুই হাজার ৫৫০ জনের মতামত নেয়া হয়। জরিপে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৭ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা জানিয়েছেন। এর আগে আইআরআই থেকে গত বছর ৩০ অক্টোবর থেকে ১৯ নবেম্বর পর্যন্ত চালানো জরিপে ক্ষমতাসীন দলকে আস্থায় রেখেছিলেন ৪৮ শতাংশ। জরিপে অংশগ্রহণকারীর ৮৩ শতাংশ বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ‘খুবই ভাল’ বা ‘কোন রকম ভাল’ বলেছেন। আর ৭৭ শতাংশ বলেছেন, দেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বলে তারা মনে করেন।

অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির নেতা জন ম্যাককেইনের নেতৃত্বে পরিচালিত আইআরআইকে ডানপন্থীদের একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে সেটা বিবেচনা করলেও বিশ্বের প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইআরআই ইতোমধ্যেই খ্যাতি অর্জন করেছে।

অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করছেন বেশি মানুষ। গত বছরের নবেম্বরের তুলনায় এই জরিপে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সমানসংখ্যক ব্যক্তি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে অর্থনীতির কথা বলেছেন। সমস্যা হিসেবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেছেন ৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ৪৫ শতাংশ ঘুষ দেয়ার কথা বলেছে চাকরি পেতে। এরপর পুলিশকে ঘুষ দেয়ার কথা বলেছে ১১ শতাংশ। এবারই প্রথম সংস্থাটি জরিপে বাংলাদেশে চরমপন্থা নিয়ে মতামত নিয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীর ৫৩ শতাংশ বাংলাদেশে রাজনৈতিক চরমপন্থাকে বড় সমস্যা বলেছেন। অন্যদিকে ৪৪ শতাংশের মতে, ধর্মীয় চরমপন্থা খুব বড় সমস্যা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফরচুনের বিশ্বের প্রভাবশালী শীর্ষ নেতাদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৪ মার্চ প্রকাশিত এই তালিকায় রাজনীতি, ব্যবসা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের শীর্ষ ৫০ জনের নাম উঠে এসেছে। এই তালিকায় দশম স্থানে রয়েছে শেখ হাসিনার নাম। প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের নেত্রী আউন সান সুচি রয়েছেন তৃতীয় স্থানে। ৫০ জনের এই তালিকায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র শেখ হাসিনাই রয়েছেন। মুসলিম একটি দেশে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী শিক্ষা বিস্তারে শেখ হাসিনার কৌশলী পদচারণার বিষয়টিও তুলে ধরেছে ফরচুন। বাংলাদেশের নারীর ৩০ শতাংশের কমপক্ষে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ লাভ এবং নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপর বাংলাদেশের উঠে আসার দিকটিও শেখ হাসিনার কৃতিত্ব হিসেবে দেখছে ফরচুন।

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশিত জরিপে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আগের বছরের চেয়ে নতুন বছর নিয়ে বিশ্বের ৬৮ দেশের মধ্যে সবচেয়ে আশাবাদী দেশ বাংলাদেশ। আর নতুন বছর নিয়ে আসবে অফুরন্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এমন বিশ্বাসেও বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। জরিপে অংশ নেয়া ৬৬ শতাংশ বাংলাদেশী বলেছেন, নিজেদের জীবন নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী দেশের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। এছাড়া নিজেদের জীবন নিয়ে বাংলাদেশে সুখী মানুষের সংখ্যাও ৬০ শতাংশের ওপর।

গ্যালাপের আরেকটি জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম এক নিরাপদ দেশ। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিশ্বের নিরাপদ দেশ হিসেবে ৭৮ পয়েন্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার ওপর অবস্থান করছে। বাংলাদেশের পরের অবস্থানে এই দুটি দেশ। তাদের পয়েন্ট হচ্ছে ৭৭। এক্ষেত্রে ৭৫ পয়েন্ট নিয়ে ফ্রান্সের অবস্থানও বাংলাদেশের নিচে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মধ্যে কেবল শ্রীলঙ্কা ৭৯ পয়েন্ট নিয়ে মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে বাংলাদেশের ওপর অবস্থান করছে। এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশের মধ্যে ৮৭ পয়েন্ট নিয়ে ইন্দোনেশিয়া তালিকার শীর্ষে।

এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টার প্রকাশিত তাদের এক জরিপে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বিনিয়োগবান্ধব দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বাংলাদেশসহ ৪৪টি দেশের ওপর ওই জরিপ চালানো হয়। এছাড়া পিউ রিসার্চ সেন্টারের আরেকটি জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৭১ ভাগ জনগোষ্ঠী বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট। ৫৪ ভাগ জনগোষ্ঠী দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে খুশি।

ফ্রান্সের বিখ্যাত আর্থিক ও বীমা প্রতিষ্ঠান ফ্রেঞ্চ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ফর ফরেন ট্রেড (কোফেস) উদীয়মান অর্থনীতির ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রেখেছে। উদীয়মান দেশের তালিকায় দুই ভাগে ১০টি দেশকে রেখে কোফেস বলেছে, ব্রিকসভুক্ত দেশ নানা সমস্যায় ভুগছে। আর উদীয়মান ১০ দেশ তাদের উন্নতির গতিকে এগিয়ে রেখেছে। এতে পেরু, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও শ্রীলঙ্কাকে একটি দলে রেখে বলা হয়, ভাল ব্যবসার পরিবেশের কারণে দেশগুলোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয় দলে কোফেস রেখেছে বাংলাদেশ, কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া ও ইথিওপিয়াকে। দেশগুলো সম্পর্কে তাদের মন্তব -ব্যবসা করা কঠিন বলে এদের উন্নতির ধারা ব্যাহত হতে পারে।