২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রস্তুত ইডেন, শিরোপা ফয়সালা আজ

প্রস্তুত ইডেন, শিরোপা ফয়সালা আজ

মিথুন আশরাফ, কলকাতা থেকে ॥ সৌরভ গাঙ্গুলীকে দেখা গেল মহাব্যস্ত। তড়িঘড়ি করে এসে ক্রিকেটের নন্দন কানন ইডেন গার্ডেনের উইকেট দেখলেন। কারও সঙ্গে কোন কথা না বলে দ্রুত মাঠও ছাড়লেন। সিএবির প্রেসিডেন্ট তিনি। তার হাতেই ইডেন গার্ডেনে খেলা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব। কোন রকম যেন ভুল না হয়, সেদিকটিতো তাকেই খেয়াল রাখতে হয়। আজকের দিনটি শেষ হলেই তো বাঁচেন গাঙ্গুলী। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচটি শেষ হলেইতো শান্তির ঘুম দিতে পারেন। তাইতো শেষ বেলায় যেন কোন ত্রুটি না থাকে, ফাইনালটি যেন ভালভাবে শেষ হয় এবং ফাইনালের জন্য যে আয়োজনগুলো করা আছে, তা যেন সঠিকভাবে করতে পারে ইডেন গার্ডেন; তাই তদারকি করতে থাকলেন সারাদিন! প্রস্তুত হলো মঞ্চও। সেই মঞ্চে এখন শিরোপা হাতে তুলে ধরবেন কে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ড্যারেন সামি নাকি ইংল্যান্ড অধিনায়ক ইয়ন মরগান, সেটাই অপেক্ষার পালা। আজই অপেক্ষা শেষ হয়ে যাবে। দীর্ঘ ২৭ দিনের রোমাঞ্চেরও অবসান ঘটবে। বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে সাতটায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচ শুরু হবে। ম্যাচটি শেষ হতেই শিরোপার ফয়সালা হয়ে যাবে। পর্দা নামবে টি২০ বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসরের। যে দলই জিতুক, দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলবে। ২০১০ সালে ইংল্যান্ড ও ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে একবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সামিতো অনেকটা ইংল্যান্ডকে হুংকারই দিয়ে বসেছেন। তার বলার ধরন এমন, ‘শিরোপা আমাদেরই। আমরা সেমিফাইনালের মতো ফাইনাল ম্যাচটি জিতে উৎসব, আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যেতে চাই।’ সামি যখন এমন বলছেন। তখন কি আর মরগান মুখ বন্ধ করে রাখতে পারেন। তার কণ্ঠেও তেজ, ‘১৯৭৯ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল হয় লর্ডসে। নিজ দেশে হওয়া ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পারেনি ইংল্যান্ড। তবে এবার সেই প্রতিশোধ নিতে হবে। টি২০ বিশ্বকাপের মাধ্যমে ইডেন গার্ডেনে লর্ডসের প্রতিশোধ নেব।’

ম্যাচের আগে কথার লড়াই জমে উঠেছে। একজন কিন্তু নির্লিপ্ত। তিনি ক্রিস গেইল। যিনি সেমিফাইনালে হতাশ করেছেন। তবে ফাইনালে যে ব্যাটিং ঝড় তুলবেন না, তা বলা মুশকিল। যদি ঝড় ওঠে, তাহলে ইংল্যান্ডতো উড়ে যাবে। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে সামি এমনভাবে কথা বললেন, যেন ফাইনাল ম্যাচটি তার কাছে কোন বিষয়ই মনে হচ্ছে না। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ‘উইকেট কেমন দেখলেন?’ সামি ঠাট্টা করে বলে দিলেন, ‘পিচ ২২ গজেরই। কিন্তু চওড়া ৬০ ফুট। আমাদের খেলতে কোন সমস্যা হবে না!’ হাসতে হাসতে মাঠের অবস্থানই বলে দিলেন সামি। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, কতটা ‘ মোজ-মাস্তি’তে আছেন সামিরা। ফাইনাল ম্যাচের আগে সেমিফাইনালের ‘হ্যান ওভার’ই কাটাতে পারছেন না। এ বিষয়টিই না আবার ‘হিতে-বিপরীত’ হয়ে ধরা দেয়।

দুপুরে যখন দুইদলের অধিনায়ক শিরোপা হাতে ছবি তোলায় পোজ দেন, তখনও আনন্দ করতে থাকেন সামি। কোনভাবেই শিরোপা তার হাত থেকে ছাড়তে নারাজ। ফটোসেশনের পুরোটা জুড়ে সামি নিজের হাতেই শিরোপা রাখালেন। যখন আইসিসির হাতে শিরোপা হস্তান্তর করার সময় আসে, তখন মরগান আগ বাড়িয়েই সামির হাতে এককভাবে শিরোপা দিয়ে দেন। তখন দেখে মনে হচ্ছিল সামি শিরোপা না ছাড়তে চাইলেও মরগান যে দিয়ে দেন আর মুচকি হাসি দেন; তাতে মরগান বোধ হয় ভাবতে থাকেন, ‘আরে আজকে (শনিবার) শিরোপা নিয়ে যত খুশি মজা কর। শান্তি পাও। আনন্দ পাও। কালকে (আজ) সেই হাসি আর থাকবে না। আমার হাতে অটো চলে আসবে শিরোপা!’

ভারতের মাটিতে এর আগেও ইংল্যান্ড ফাইনালে খেলেছে। সেটি ১৯৮৭ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল। সেই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে যায় ইংল্যান্ড। ম্যাচটি ইডেন গার্ডেনেই হয়েছিল। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ চারবার ভারতের মাটিতে ফাইনাল খেলে। একবারও জিততে পারেনি। ১৯৮৯ সালে ৫ দলের নেহরু কাপে, ১৯৯৩ সালে ৫ জাতির হিরো কাপে, ১৯৯৪ সালে ৩ জাতির ওয়ার্ল্ড সিরিজে এবং ২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে খেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ম্যাচটি ছাড়া সবকটি ম্যাচ হয় ইডেন গার্ডেনে। কিন্তু হতাশাই শুধু তাদের পুঁজি হয়ে থাকে। এবার টি২০ বিশ্বকাপে প্রস্তুতি ম্যাচ ছাড়া আর কোন ম্যাচ ইডেন গার্ডেনে খেলেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ইংল্যান্ডতো খেলেইনি। দুইদলই ভারতের মাটিতে ফাইনাল খেলে হতাশাতেই ভুগেছে। প্রথমবারের মতো ভারতের মাটিতে দুইদল ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে।

এ ম্যাচটি নিয়ে অবশ্য ভারতের মাথাব্যথা নেই। কারণ ভারত যে ফাইনালে নেই। তবে ক্রিকেট নিয়েই ঘিরে আছে ভারত। আর সেটিতে বাংলাদেশ আছে যুক্ত। কিভাবে? সেমিফাইনালে ভারত হারের পর, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জেতার পর যে মুশফিকুর রহীম টানা দুটি টুইট করেন; তা নিয়েই মেতে আছে ভারত, ভারতের ক্রিকেটার, কর্মকর্তা, এমনকি সমর্থকরাও। মুশফিকুর টুইট করেছিলেন ‘এটাই হল সুখ...!!! হাহাহা...!!! ভারত সেমিফাইনাল হেরে গিয়েছে’, ‘এটাই হল সুখ... এখন অনেক ভালভাবে ঘুমাতে পারব। উইন্ডিজ দুর্দান্ত!!!’ এ নিয়ে ভারত গরম। সব স্থানে ভারতের প্রতি মুশফিকের বিদ্বেষ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতি তার প্রীতি দেখানোতে ক্ষেপে আছেন ভারত সমর্থকরাও। পরে ক্ষমা চাইলেও কোন কাজ হচ্ছে না। ইডেন গার্ডেনে সিএবির একজনতো এমনও বললেন, ‘এ কি করল তোমাদের মুশফিক! নিজে খেলতে পারে না। দলকে ডুবিয়েছে। আবার এমন বড় কথা!’ বোঝাই যাচ্ছে, ভারত ফাইনালে না যাওয়ায় এখন যতটা সম্ভব অন্যদিক নিয়ে মনোযোগ দিতে চাইছে তারা।

সেই মনোযোগের পরও আজ ফাইনাল হবে। আর সেখানে খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড। সেটিতো ভুলে গেলে চলবে না। তবে ভারতের নিয়ম হচ্ছে প্রতিটি প্রদেশের যে ক্রিকেট সংস্থা আছে, তারাই সেই সংস্থার খেলাগুলো পরিচালনা করে। সেখানে অন্য কোন সংস্থার হাত থাকে না। স্থানীয় সংস্থার কর্মকর্তারা ছাড়া কোন বিষয়ে বিসিসিআইও নাক গলায় না। বাংলাদেশের মতো নয় যে, সব বিভাগে খেলা চালানোর তত্ত্বাবধানে থাকে বিসিবি! যেহেতু খেলাটি হবে ইডেন গার্ডেনে, তাই সিএবির (ক্রিকেট এ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল) কর্মকর্তারাই ম্যাচটি কিভাবে ভাল করে শেষ করা যায়, সেদিকটি নিয়ে ভাবছেন। আর সেই ভাবনায় সিএবির প্রধান হিসেবে গাঙ্গুলীর ওপর সব চাপ পড়ছে।

সেই চাপ গাঙ্গুলী নিচ্ছেনও। এ মাঠে গ্রুপ পর্বে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়েছে। যেটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে ‘হাইভোল্টেজ’ ম্যাচ ছিল। সেই ম্যাচটিই যখন এত ভাল করে আয়োজন করেছেন, সেখানে চাহিদার বাইরে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড ফাইনাল ম্যাচটিতো সহজেই সেরে ফেলা যাবে।

মঞ্চ প্রস্তুত। শুধু ক্ষণ গণনা হচ্ছে। গোনা হচ্ছে, ১০...৯...৮...। এভাবে করে ১ এসে স্টার্ট হয়ে যাবে খেলা। ম্যাচটি শেষ হতেই টি২০ বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসরে শিরোপার ফয়সালাও হয়ে যাবে।