২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রতিবন্ধী হলেই অটিস্টিক বলবেন না ॥ পুতুল

বিডিনিউজ ॥ প্রতিবন্ধী হলেই অটিস্টিক না বলতে সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন বুদ্ধি-প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করে আসা সায়মা হোসেন পুতুল। তিনি বলেন, অটিজম নামটা এত বেশি পরিচিত হয়ে গেছে যে কোন কিছু হলে আমরা অটিজম বলি। আমি অনুরোধ করব, এত সহজে সবাইকে অটিস্টিক বলবেন না।

শনিবার আন্তর্জাতিক অটিজম সচেতনতা দিবসে এক ভিডিও বার্তায় এই আহ্বান জানান গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ ইন বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান সায়মা। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানে সায়মার ভিডিও বার্তাটি প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানে তার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ছিলেন।

অটিজমকে জটিল রোগ উল্লেখ করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সায়মা বলেন, এটা একটা কমপ্লেক্স নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার। এটা শুধু ওই মানুষটাকে এ্যাফেক্ট করে না, পুরো পরিবারকে এ্যাফেক্ট করে।

অটিস্টিকদের পাশে দাঁড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কাউকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা পুরো দেশের উন্নয়ন করতে চাই। আমরা কাউকে ভুলে যাব না। কাউকে ফেলে রেখে এই দেশটা বড় হবে না।

তিনি বলেন, তারা (অটিস্টিক) যেন আমাদের দেশের একটা অংশ মনে করে চলতে পারে। তারা যেন নিজেদের ভিন্ন মনে না করে। শুধু বাবা-মা নয়, পুরো পরিবার, পুরো সমাজকে সহায়তা দিতে হবে। অটিস্টিকদের সমাজের স্বাভাবিক জীবনের অংশ করতে সরকারের নানা উদ্যোগের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা।

বাংলাদেশে ন্যাশনাল স্টিয়ারিং কমিটিতে ১৪টি মন্ত্রণালয় মিলে কাজ করার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক উপায় চিন্তা করছি। যেন আগে ধরা যায়, চিকিৎসা, সামাজিকভাবে চিকিৎসা, স্কুলে শিক্ষা, কর্মজীবী করা- সব কিছু নিয়ে আমরা চিন্তা করছি... অল্প অল্প করে আমরা এগুচ্ছি।’

অটিস্টিকদের চিকিৎসায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পদ্ধতির কথা তুলে ধরে সায়মা বলেন, ‘একেক দেশে একেক জিনিস আছে করার। আমরা আমাদের দেশে একটি নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছি।’

অটিজম মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করার ওপরও জোর দেন তিনি। সায়মা বলেন, আমরা বাংলাদেশে এই দিনটা অনেক বড় করে পালন করি। খুব কম দেশ আছে যে, এত বড় করে দিনটা পালন করা হয়। এজন্য, আমরা অনেক গর্বিত।

অটিজম মোকাবেলায় বাংলাদেশ অনন্য ॥ অটিজম মোকাবেলায় যথেষ্ট জোর দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে ‘অনন্য’ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সায়মা হোসেন পুতুল। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল সেন্টারে আয়োজিত এক আলোচনার মূল প্রবন্ধে পুতুল এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, অটিজমের বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ যা কাজ করেছে, তা গর্ব করার মতো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মডেল অনন্য। নানা ক্ষেত্রে নানামুখী কাজ হচ্ছে সেখানে। এটা সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং সংশ্লিষ্টদের সাড়ায়।

‘সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও’ জাতীয় উন্নয়নে অটিজম আক্রান্তদের সম্পৃক্ত করতে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকন্যা বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অটিজম ও অন্যান্য এনডিডি আক্রান্তদের জন্য পুরো এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আর্লি চাইল্ডহুড সেন্টারগুলোতে অন্তত দুজন প্রতিবন্ধী শিশু ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল অটিজম এ্যান্ড এনডিডি একাডেমি স্থাপন করেছে। জাতীয় পর্যায়ের নাটক, সিনেমা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অটিজম আক্রান্তদের সুযোগ দেয়ারও একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা সায়মা ১২ মিনিটের বক্তব্যের শুরুতে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তার মা শেখ হাসিনার অবদানকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে একযোগে কাজ করছে জানিয়ে তিনি প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ ‘আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি’কে ‘গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ৯০ দশকের মাঝামঝি বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সর্বপ্রথম জাতীয় নীতি নেয়া হয়।

“১৯৯৯ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা, যা পরে জেপিইউএফ-এ পরিণত হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় প্রথম আইন প্রণয়ন ও ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স’ গঠন করে। “এছাড়া অটিজমসহ এনডিডি (নিউরো- ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার) আক্রান্তদের চিকিৎসাসহ যাবতীয় অধিকারের সুরক্ষা আইনের আওতায় আনতে ২০১৩ সালে ‘ডিজএ্যাবিলিটি ওয়েলফেয়ার এ্যাক্ট’ ও ‘দ্য ন্যাশনাল নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার প্রটেকশন ট্রাস্ট এ্যাক্ট’ করা হয়।”

প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করা অল্পকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম উল্লেখ করে সায়মা বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী ‘সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক’ গঠিত হয়, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দৈহিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের সমাজের অংশ বলে গণ্য করার জোর প্রচার চলছে।

অটিজমে আক্রান্তসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের আর্থসামাজিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় তাদের পরিবার ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যে রেজ্যুলেশন গৃহীত হয় তাও বাংলাদেশ উত্থাপন করেছিল বলে জানান তিনি।

‘অটিজম মোকাবেলা : এসডিজি’র আলোকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কৌশল’ শীর্ষক এ আলোচনায় জাতিসংঘ মহাসচিবের স্ত্রী বান সুন-টেক অটিজম আক্রান্তদের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

“অটিজম আক্রান্তদের অধিকার না দেয়ার অর্থ মানবাধিকার লঙ্ঘন। তারাও মেধাবী। তাদের মেধা ও শ্রমকে সকল কর্মকা-ে ব্যবহারের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।” জাতিসংঘে বাংলাদেশ, ভারত, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মিশনের সহায়তার অটিজম স্পিকস এ আলোচনার আয়োজন করে।

এতে আরও বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন-মোমেন, কাতারের স্থায়ী প্রতিনিধি আলইয়া আহমেদ সাইফ আল-থান, যুক্তরাষ্ট্রের সারাহ মেন্ডেলসন, ভারতের সাঈদ আকবর উদ্দিন ও অটিজম স্পিকসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুজান রাইট।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ শামীম আহসানসহ বাংলাদেশ মিশন ও কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।