১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পদ্মা সেতুর ২৩৯০ কোটি টাকা ব্যয় করা যাচ্ছে না

  • ফেরত দেয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ পদ্মা সেতুর বরাদ্দ পাওয়া টাকা ব্যয় করতে পারছে না সেতু বিভাগ। এ জন্য প্রায় ২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। ফলে মূল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী থেকে বরাদ্দ কমে দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার ৯ কোটি ২৯ লাখ টাকায়। তবে এতে বাস্তবায়নে কোন সমস্যা হবে না বলে জানা গেছে। কেননা আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পদ্মা সেতুর কর্মতৎপরতা আরও ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে ফলে নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ অনেক বেশি প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে সংশোধিত এডিপি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা বিভাগের সচিব তারিক-উল-ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, সংশোধিত এডিপির খসড়া তৈরির কাজ এখনও চলমান। আগামী ৫ এপ্রিল এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর বরাদ্দ কমছে কিনা বা কত টাকা কমছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বরাদ্দ কমতে পারে। তবে এখনও এ বিষয়ে কাজ চলছে। বলা যাচ্ছে না কত কমবে। এর আগে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় পদ্মা সেতুর বরাদ্দ কমার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা, এর জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি এই মুহূর্তে আমার মাথায় নেই।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায় সরকার। এজন্য চলতি অর্থবছর (২০১৫-১৬) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি) পদ¥া সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয় ৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে অর্থ ছাড় করা হয়েছে এক হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। তবে ব্যয় হয়েছে আরও কম, অর্থাৎ ৮৯২ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বরাদ্দের মাত্র ১২ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ফলে পুরো বছরে বিশাল এ বরাদ্দের বড় অংশই অব্যবহƒত থেকে যাবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধিত এডিপিতে পদ¥া সেতুর বরাদ্দ কমিয়ে ৫ হাজার ৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়। এ হিসেবে চলতি অর্থবছর বরাদ্দ কমছে ২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে সংশোধিত এডিপিতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ কমিয়ে করা হয়েছিল সাত হাজার ৬০০ কোটি। সেখান থেকে আবার অর্থবছর শেষে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা ফেরত দেয় সেতু বিভাগ। একইভাবে গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তবে তা কমিয়ে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা করা হয়েছিল।

সূত্র জানায়, বরাদ্দ দেয়া অর্থ ব্যয় করতে না পারলেও আরেক দফায় বেড়েছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়। মূল সেতু, নদী শাসন কাজ, সংযোগ সড়ক, পরামর্শক সেবা, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন কার্যক্রম খাতে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ব্যয় বাড়ছে বলে জানা গেছে। আগের হিসাবের তুলনায় ৮ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় এ নিয়ে দু’দফা বাড়ানো হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে আর ব্যয় বাড়ানো ও প্রকল্প সংশোধন করা হবে না বলে পরিকল্পনা কমিশনে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে সেতু বিভাগ।

গত জানুয়ারি মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির নতুন ব্যয়ের প্রস্তাব (সংশোধনী প্রস্তাব) অনুমোদ দেয়া হয়।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, মূল সেতু, নদী শাসন কাজ, সংযোগ সড়ক, পরামর্শক সেবা, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন কার্যক্রম খাতে ব্যয় বেড়েছে। অর্থের উৎসের পরিবর্তন, চুক্তি মূল্য ও চুক্তির মেয়াদ পরিবর্তনের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবে প্রায় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতুটির ব্যয় হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২৭ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। বৈদেশিক সহায়তার উৎস ভারতের অনুদানের অর্থ। পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি খাতে ব্যয় বাড়ার কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণে আরও অর্থ প্রয়োজন। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণে তিন হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, নদী শাসনে চার হাজার ৩২০ কোটি টাকা, সংযোগ সড়ক নির্মাণে ৬৩৮ কোটি টাকা, পরামর্শক বাবদ ১৭৬ কোটি টাকা, নতুন খাতে ১২৫ কোটি টাকা, জমি অধিগ্রহণে ২১২ কোটি টাকা এবং পদ্মা নদীর মাওয়া অংশে ভাঙ্গন ঠেকাতে ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম এর আগে বলেছিলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে কোন ধরনের অবহেলা করছে না সেতু বিভাগ। সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই পদ্মা সেতু ব্যবহার করতে পারবে মানুষ। প্রকল্পটির আওতায় মূল সেতু ও নদী শাসনের কাজ বাস্তবায়নে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এসব চুক্তি আগের প্রাক্কলিত হিসেবের তুলনায় অনেক বেশি।

সূত্র জানায়, ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত এবং সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে থাকা প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব প্রায় ছয় মাস আগে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় সেতু বিভাগ। প্রস্তাবে সেতু বিভাগের ভবন নির্মাণ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ কয়েকটি খাতের ব্যয় নিয়ে আপত্তি তোলে কমিশন। কয়েক দফা বৈঠকেও সমাধান না হওয়ায় প্রকল্পটির বেশ কয়েকটি খাতে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে ৫০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দেয় পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। এর পর একনেক সভার আগামী বৈঠকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এরই মধ্যে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন।