১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশের ঐতিহ্য শতরঞ্জি

১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সা’দত মোহাম্মদ সায়েমের নির্দেশে প্রথম সরকারীভাবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) মাধ্যমে নিসবেতগঞ্জ গ্রামে শতরঞ্জি তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করে। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে প্রথম সরকারীভাবে বিসিক শতরঞ্জি শিল্পে জড়িত ৪৫ জন শ্রমিককে কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা হয়। এর পর থেকে অবধি অবহেলিত শতরঞ্জি শিল্পটি সরকারের দৃষ্টিতে আসেনি। বলা যায় অবহেলার শিকার হয়ে বিলুপ্ত হতে যাওয়া শিল্পটির প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে বেসরকারী উদ্যোক্তারা। তারপরও নানা প্রতিকূলতায় এ পেশার সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তবে বিসিকের উদ্যোগে এই শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে ঢাকার এক ব্যবসায়ী বিসিকের এই কেন্দ্রটি লিজ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে রংপুর শহরের কারুপণ্যের মালিক শফিকুল আলম সেলিমের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শতরঞ্জির ব্যবহার আরও বহুমুখী হয়ে উঠে। তবে কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মধ্য দিয়ে খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের উদ্যোগে ইউরোপিয়ান কমিশনের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে রংপুরের শতরঞ্জির পরিচয় ঘটে।

শিল্প নিয়ে কিছু কথা

রংপুর জেলার তাঁতীরা এক ধরনের মোটা কাপড় তৈরি করে যা শতরঞ্জি নামে পরিচিত। শতরঞ্জি বা ডুরি মূলত এক প্রকার কার্পেট, এক সময়ে সমাজের অভিজাত শ্রেণীর গৃহে, বাংলো বাড়িতে বা খাজাঞ্চিখানায় বিশেষ আসন হিসেবে শতরঞ্জি ব্যবহৃত হতো। বর্তমান আধুনিত সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। শতরঞ্জি ফার্সি ভাষার শব্দ শতরঞ্জ শব্দ থেকে এসেছে। দাবা খেলার ছককে শতরঞ্জ বলা হয় এবং দাবা খেলার ছকের সঙ্গে শতরঞ্জির নকশার মিল থাকার কারণে এটাকে শতরঞ্জি নামে নামকরণ করা হয়। ইংরেজীতে যাকে ঈড়ঁৎংবংঃৎরঢ়বধ ঈড়ৎস ঈধৎঢ়বঃ বলা হয়।

ঘরের শোভায় শতরঞ্জি

শতরঞ্জি আগে শুধু ঘরের মেঝেতে বিছানোর জন্যই তৈরি হতো। সময়ের বিবর্তনে একই বুননে শতরঞ্জির ওয়ালম্যাট, টেবিলম্যাট, কুশন কভার, সোফার রুমাল, জায়নামাজ, পাপোশও তৈরি হচ্ছে। শতরঞ্জিতে বিভিন্ন রঙের সমন্বয় ঘটিয়ে ডিজাইন করা হয়। জানা গেছে, ৬ থেকে ৯টি রঙের ৪০-৫০টি ডিজাইনের শতরঞ্জি বাজারে পাওয়া যায়। পাশাপাশি ইচ্ছা অনুযায়ী নতুন করে বা নিজের পছন্দের নকশা অনুযায়ী ফল, ফুল, কার্টুনের পায়ের ছাপÑ এসব আকারের শতরঞ্জিও পাবেন। শতরঞ্জির দাম নির্ধারণ করা হয় স্কয়ার ফিট হিসেবে। প্রতি স্কয়ার ফিট ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। রংপুরে রয়েছে শতরঞ্জির প্রায় ৩০টি দোকান। শতরঞ্জি পাওয়া যাবে ঢাকার শুক্রাবাদে, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, রাজধানী সুপার মার্কেট, গুলশান-২, ডিসিসি মার্কেট, গুলশান-১ নম্বরে। ফ্যাশন হাউস আড়ং, যাত্রাতে পাওয়া যাবে সুতার তৈরি ও মখমলের শতরঞ্জি।

মালুদা থেকে শতরঞ্জির আঁতুর ঘর

প্রায় ২শ’ বছর আগে এই গ্রামের মানুষদের উদ্যোগে সম্পূর্ণ দেশী প্রযুক্তিতে বাঁশের তৈরি এক প্রকার তাঁত জাতীয় যন্ত্রের মাধ্যমে মোটা সুতি কাপড় ও উলেন সুতা ব্যবহার করে স্থানীয় ভাষায় ‘মালুদা’ নামের এক প্রকার পাটি জাতীয় সামগ্রী তৈরি শুরু করে। মালুদা তৈরিতে শ্রমিকদের মননশীল কারুকাজের উপজীব্য বিষয় ছিল দৃষ্টিনন্দন গ্রামবাংলার চিরায়ত শৈল্পিক আবহ। নান্দনিক এই শিল্পকর্ম উপমহাদেশের সে সময়কার রাজা-বাদশাহদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। যা কালক্রমে ভারতীয় উপমহাদেশের গ-ি ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে বিস্তৃতি লাভ করে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের মি. নিসবেত নামে একজন ব্রিটিশ রংপুর জেলার কালেক্টর ছিলেন। তিনি রংপুরের পীরজাদা গ্রামের শতরঞ্জি শিল্প দেখে মুগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে এর গুণগতমান উন্নয়ন ও এ শিল্পের সম্প্রসারণে সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তার নামানুসারেই তৎকালীন, পীরজাদাবাদ মৌজার একাংশ নিসবেতগঞ্জ নামকরণ করা হয়। জানা যায়, সম্রাট আকবরের দরবারেও দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক ডিজাইনের এই মালুদা ব্যবহার ছিল। পরবর্তীতে জেলার কালেক্টর ব্রিটিশ কর্মকর্তা এই শিল্পকে বেগবান করার জন্য গ্রামটির নামকরণ করেন নিসবেতগঞ্জ। কালের বিবর্তনে সেই মালুদা শতরঞ্জি নাম ধারণ করে।

নিসবেতগঞ্জ শতরঞ্জি পল্লী

এই শিল্পকে ঘিরে শহরের উপকণ্ঠে নিসবেতগঞ্জ এলাকায় গড়ে উঠেছে শতরঞ্জি পল্লী। শতরঞ্জিপল্লীতে গেলে দেখা যাবে, শতরঞ্জি বুননে ব্যস্ত আছেন নারী-পুরুষ। জানা যায়-১৯৯১ সালে নিসবেতগঞ্জ গ্রামে বিসিকের বন্ধ থাকা একটি দোচালা ছোট্ট কারখানা ভাড়া নিয়ে ঝিমিয়ে পড়া শতরঞ্জি শিল্পকে জাগিয়ে তুলতে উদ্যোগ নেন রংপুরের কারুপণ্যের স্বত্বাধিকারী সফিকুল আলম সেলিম। তার কারখানায় শতরঞ্জি বানিয়ে দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় স্টল দিয়ে ব্যাপক পরিচিত ও ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। এভাবে বাড়তে থাকে শতরঞ্জির চাহিদা। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় ‘শতরঞ্জি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। আর এখন সেখানে কারুপণ্যের উৎপাদন কেন্দ্র ছাড়াও স্থানীয় ছোট ছোট মহাজনের নিজস্ব অর্থায়নে পল্লীর প্রায় ২০০ পরিবার এ পেশার জড়িত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। চাহিদা বৃদ্ধির সুবাদে কারুপণ্যের উদ্যোগে শহরের রবার্টসনগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও জেলা সদর, কুড়িগ্রাম এবং উলিপুর পৌর এলাকায়ও গড়ে উঠেছে শতরঞ্জি কেন্দ্র। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শত শত পিস শতরঞ্জি উৎপাদন করা হচ্ছে। তথ্যের আলোকে দেখা গেছে- বাংলাদেশে হস্তশিল্প রফতানি আয়ের শতকরা ৬০ ভাগের অবদান কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের। অসাধারণ এই কাজের জন্য ২০১০ সালে সরকারী পর্যায়ে জাতীয় রফতানি ট্রফির স্বর্ণপদকের পুরস্কার পান কারুপণ্যের স্বত্বাধিকারী সফিকুল আলম সেলিম।

রফতানি বাজার

তথ্য উপাত্ত থেকে দেখ গেছে- ২০০২ সালে প্রথম জাপানে শতরঞ্জি রফতানির করে আয় হয় ২০ হাজার ডলার। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘আইকা’ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন শতরঞ্জি সামগ্রী আমদানি করে তা ইউরোপের চাহিদা পূরণ করেছে। চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ‘আইকা’ ছাড়াও বিবি রাসেল ও কারুপণ্যের উদ্যোগে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার মাছকুটি গ্রামে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শতরঞ্জি কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। রংপুরের নিভৃত পল্লীতে উৎপাদিত শতরঞ্জি সামগ্রী ঢাকার বেশ কয়েকজন রফতানিকারকের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে স্থানীয় শ্রমিকদের ডিজাইনে করা শতরঞ্জি রফতানি করে প্রতি বছর অর্জিত হচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। জানা গেছে- প্রতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ কারুশিল্পসামগ্রী রফতানি হয়, তার ৫০ ভাগই শতরঞ্জি। রফতানি হচ্ছে বিশ্বের ৩৬টি দেশে। বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।

চাই উদ্যোগ

রংপুরের শতরঞ্জি ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ জাপান ও ভারতে সুনাম অর্জন করায় চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি এ শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন আশা। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের দেশগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী শতরঞ্জি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কারণ, শিল্প এলাকায় অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুত সংযোগ না থাকা, কারিগরি জ্ঞানের অভাব, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তারা শতরঞ্জি কারখানা গড়ে তুলতে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের মতে, সরকারী সহযোগিতা পাওয়া গেলে দেশের কাঁচামাল দিয়ে এই শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে দেশীয় শিল্পের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক আয় এবং কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখবে শতরঞ্জি শিল্প।

গবেষক ও কলাম লেখক