১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা -স্বদেশ রায়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইউনিট এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা কম। বাস্তবে সকলেই চায় ব্যক্তি জীবনে যেন এই অভিজ্ঞতা কমই থাকে। নিয়ম মেনে, মোটামুটি নীরোগ থেকে সবাই জীবন কাটাতে চায়। তাছাড়া চিকিৎসা সম্পর্কে কোন জ্ঞানও আমার নেই, বিষয়টি পুরোপুরি টেকনিক্যাল। অনেক সময় মেডিক্যাল রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলে নানান দেশের অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। প্রায় ২০ বছর আগে জীবনে একবারই মেডিক্যাল রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল তাদের তিন দিনের সেমিনার কভার করার জন্য অনুরোধ করে। মেডিক্যাল রিপোর্টার হিসেবে কোন অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেই। ওখানে গিয়ে প্রথম দিনেই বুঝতে পারি চায়না, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স থেকে যে সব রিপোর্টার এসেছে তাদের কাছে ডে টু ডে ইভেন্টস অর্থাৎ প্রতিটি সেমিনারে কি বলা হচ্ছে সেগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাদের দেশে মেডিক্যাল রিপোর্টিং ভিন্নভাবে পত্রিকায় স্থান পায়। আমাদের দেশে এখনও সেভাবে মেডিক্যাল রিপোর্ট কভার করা হয় না। তাই সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেই, এদের হাসপাতালগুলো সম্পর্কে একটা মোটামুটি সম্যক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করি। দেশে ফিরে সার্বিকভাবে এগুলো লিখলে দেশের পাঠক পড়বেন। যদিও মাউন্ট এলিজাবেথ ও তাদের সহযোগী হাসপাতালটি মিলেই ছিল সেমিনারের আয়োজন তাই ওই হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগের প্রধানের সঙ্গে কথা বলা ও তাদের কার্যক্রমের ডেমো দেখার চেষ্টা করি। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হাসপাতালও ঘুরে আসি।

একজন রিপোর্টার হিসেবে মাউন্ট এলিজাবেথ গ্রুপ ও সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হাসপাতাল ঘুরে দেখে দুটো বিষয় সামনে আসে- এক, সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হাসপাতালে খরচ কম। দুই, সেখানে ডাক্তাররা কোন অংশে মাউন্ট এলিজাবেথ গ্রুপের থেকে কম নন। কিন্তু তারপরেও দেখি বিদেশী রোগীর চাপ মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালেই বেশি। বিষয়টি নিয়ে বেশ দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। এর সদুত্তরের জন্য, সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল গ্রুপের সিইও এবং এমডি ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলি (মাফ করবেন, তাঁর নাম উল্লেখ করা উচিত ছিল। কিন্তু বহু বছর আগের ঘটনা হওয়ায়, নাম ভুলে গেছি। নোটবুকগুলো স্টোর রুমে। ধুলো ঝেড়ে বের করা অনেক কষ্টের।), তবে তার সম্পর্কে আগেই একটা কথা বলে নেই- জীবনে যে ক’জন অনুসরণ করার মতো মানুষ দেখেছি এই ভদ্রমহিলা তাঁদের একজন। যাহোক, অনেক কাজের ফাঁকে তিনি আমাকে সাত আট মিনিট সময় দিলেন। ওই সময়ের ভেতর তার কাছ থেকে বিশেষভাবে জানতে চাই খরচ কম হওয়া সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হাসপাতালের থেকে তার ওখানে বিদেশী রোগী কেন বেশি? তিনি হাসি মুখে সহজে উত্তরে দিলেন- আমার এখানে শুধু ভালো ডাক্তার নয়, সেরা মেডিক্যাল টেকনোলজি এবং ওই টেকনোলজি অপারেট করার মতো প্রশিক্ষিত টিমও আছে। বলে তিনি তার রুমের একটি মনিটর ওপেন করলেন এবং দেখালেন কিভাবে সর্বশেষ টেকনোলজি দিয়ে ওই মুহূর্তে মাথা ওপেন না করে কত দ্রুত একটি ব্রেইন অপারেশন হচ্ছে। তিনি জানালেন, এ মুহূর্তে এ টেকনোলজি সিঙ্গাপুরে কেবল তাদের হাসপাতালেই আছে।

বাস্তবে এখন প্রতি মুহূর্তে প্রযুক্তির অগ্রগতি হচ্ছে, তাই লেটেস্ট মেডিক্যাল প্রযুক্তি এবং তা অপারেট করার মতো প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করাই কিন্তু বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার সব থেকে বড় বিষয়। শিক্ষা ও মেধায় আমাদের দেশের ডাক্তারদের অন্য কোন দেশের ডাক্তারদের ওই অর্থে কোন পার্থক্য নেই। আমাদের ডাক্তাররা যা ধারণা করেন, বিদেশে কিন্তু একই ধারণা করেন। পার্থক্য শুধু টেকনোলজিতে। যেমন ২০১০ সালের দিকে চেকআপের জন্য থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে যাই। ওখানে গিয়ে তাদের ডাক্তারদের সঙ্গে আমাদের ডাক্তারদের খুব একটা পার্থক্য মনে হয়নি। পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, ওদের ডাক্তাররা খুব বেশি ওভার লোডেড না, আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় এখনও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কম, তাই তাঁদেরকে ওভার লোডেড থাকতে হয়। তারপরেও প্রতিদিন শত শত রোগীকে যেভাবে ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত, ডা. আবদুল্লাহ এমনকি তরুণ ডাক্তার রাকিবুল আহসান লিটু হাসিমুখে এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন তাও এক বিস্ময়কর বিষয়। তাই বামরুনগ্রাদে সব থেকে বড় পার্থক্য যেটা মনে হয়েছিল তাহলো, আমাদের থেকে তাদের টেকনোলজি ভালো। টেকনিশিয়ানদেরও বেশি দক্ষ ও আন্তরিক মনে হয়েছিল। এই দক্ষতা তৈরি ও আন্তরিক হওয়ার মোটিভেশনটি আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। আমাদের ডাক্তারদের আন্তরিকতার সর্বোচ্চ দেখি ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বা ডা. আবদুল্লাহসহ অনেকের ভেতর অনেক বেশি। তাঁরা যে লোড নেন এবং তারপরেও যে আন্তরিকতা দেখান এটা অতি মানবীয় ক্ষমতা ছাড়া সম্ভব নয়। আর লিটু আমার ছোট ভাই। তার সম্পর্কে আমার বেশি লেখা সম্ভব নয়, তবে তার স্বভাবটিই সমাজকর্মীর। আমার গ-ি সীমিত। হয়ত এখন অধিকাংশ ডাক্তারই দেশে এমন।

যাহোক, ২০১৪ এর নবেম্বরে একদিন ভোর রাতে অসুস্থতা বোধ করলে প্রথমে হলিফ্যামিলি হাসপাতালে যাই, পরে শ্রদ্ধেয় প্রাণদা আমাকে পিজিতে নিয়ে যান। সেখানে ডা. রিজভী ও আবদুল্লাহ ভাই চিকিৎসা করেন। যাহোক, সেখানে ডা. আবদুল্লাহ ভাই ও ডা. রিজভী আমাকে না বললেও চিত্রাকে যা বলেন, তার ভেতর কেমন যেন দুটো অপিনিয়ন পাই। তাই সুস্থ হয়ে গেলেও একটা মানসিক চাপ কোথা থেকে যেন সব সময় কাজ করতে থাকে। এ কারণে বন্ধুবান্ধব সকলে বলতে থাকেন, একটা তৃতীয় অপিনিয়ন নেয়ার জন্য। দিল্লীর অ্যাপোলো, অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সায়েন্সের ডাক্তারদের কাছে আগে কয়েকটি বিষয় নিয়ে চিকিৎসা ও অপিনিয়ন নিয়েছিলাম। তাঁরা খুব আন্তরিক। যোগাযোগও রক্ষা করি। মনে করি তাদের কাছেই যাই। কিন্তু কয়েকজন জোর করতে লাগল, ব্যাঙ্কক হাসপাতালে দেখাই। তাদের বলি বামরুনগ্রাদে আগে একবার গেছি, কিছুটা জানা-শোনা আছে। ব্যাঙ্কক হাসপাতাল কেন? তাদের বক্তব্য এ টাই- এখন ব্যাঙ্কক হাসপাতাল ভালো। এই ভালোর বেশি তারা বলতে পারেন না। কিন্তু রিপোর্টারের মন তো আর ভালো শব্দতে ভরে না। তার জন্য তথ্যের প্রয়োজন পড়ে। তখন মনে পড়ে গেল সিঙ্গাপুর হাসপাতালের সিইও এবং এমডি ভদ্র-মহিলার কথা। অর্থাৎ মেডিক্যাল টেকনোলজি। খোঁজ নিতে শুরু করি। ব্যাঙ্কক হাসপাতালের কিছু টেকনোলজির খোঁজ পাই যেমন সিটি এনজিওগ্রাম ব্যাঙ্কক হাসপাতালে যেটা আছে তার ক্ষমতা ২৫৬ সøাইস, ব্যাঙ্ককের অন্য কোন হাসপাতালে এটা ৬৪ সøাইসের ওপরে নেই। এমআরআই ব্যাঙ্কক হাসপাতালে ৩.৫ টেসলা। সেদেশের ওই মানের অন্য হাসপাতালে যা আছে সেগুলো ১.৫ টেসলা। হার্ট ইভিউলেশান এমআরআই ব্যাঙ্কক হাসপাতালের আছে ৩.৫ টেসলা, অন্য কোন হাসপাতালে নেই। ওপেন এমআরআই শুধু ব্যাঙ্কক হাসপাতালেই আছে। এছাড়া জটিল সার্জারির ওটি, নোভালিস ক্যান্সার রেডিয়েশান, কার্টো সাউন্ড, ও আর এম স্পাইন সার্জারি- এগুলো শুধু তাদের ওখানেই আছে। তখন বুঝতে পারি, অন্য বন্ধুরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন। আর রিপোর্টার হিসেবে আমি খুঁজে পেলাম কেন তারা ভালো বলছেন। এরপরে সেখানে পৌঁছানোর পরে প্রথমেই তাদের হেলথ কার্ডটি করতে গিয়ে হলো এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। ভদ্রলোকের বয়স ষাটোর্ধ। তিনি আমার পাসপোর্ট দেখে বলেন, আপনি রাইটার ও জার্নালিস্ট। পাসপোর্টে যেহেতু লেখা আছে তাই মাথা নাড়তে হলো। নিজে জানি লেখা ও সাংবাদিকতার চেষ্টা করি, দুটোর কোনটাই আমি হতে পারিনি। যাহোক, তিনি কার্ডটি শেষ করে আমার হাতে দেয়ার পরে, একটি সুদৃশ্য কাগজের কার্ড আমার সামনে মেলে ধরলেন, আর বললেন, আমি যেন সেখানে একটা সই করে দেই বা কিছু লিখে দেই যে, তিনি একজন লেখক ও সাংবাদিককে সত্যি অর্থে সেবা দিতে পেরেছেন কিনা? কয়েক সেকেন্ড আড়ষ্ট থাকার পরে সেখানে কিছু লিখে সই করলাম।

চিকিৎসা সেবা সম্পর্কে নিজের এই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে মনে করি, আমাদের পিজি হাসপাতালে, ঢাকা মেডিক্যালে যে ডাক্তাররা আছেন তারা বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন। এর জন্য দরকার শুধু উন্নতমানের মেডিক্যাল টেকনোলজির জোগান দেয়া এবং ওই টেকনোলজি ব্যবহারের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তোলা। আর এই উন্নতমানের প্রযুক্তির জন্য যে খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন তাও কিন্তু নয়। যাদের মেডিক্যাল টেকনোলজি সম্পর্কে ধারণা আছে তারা সব কিছুই জানবেন, তবে একজন রিপোর্টার হিসেবে দুই একটির মূল্য খোঁজ নিয়েছি, যেমন ক্যান্সার রেডিয়েশানের জন্য নোভালিসের দাম বাংলাদেশী টাকায় চারশ ষাট মিলিয়ন। ব্যাঙ্কক হাসপাতালে ক্যান্সার ডায়াগনোসিসের জন্য যে চতুর্থ জেনারেশানের পিইটি আছে এর দাম বাংলাদেশী টাকায় তিনশ’ বাইশ মিলিয়ন। অর্থাৎ ব্যাঙ্কক হাসপাতালে যে সর্বাধুনিক টেকনোলজি আছে, যার জন্য এখন সারা পৃথিবী থেকে সেখানে মানুষ চিকিৎসার জন্য আসছে ওই যন্ত্রপাতিগুলোর মূল্য বাংলাদেশী টাকায় কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী কেবিনেট মিটিংয়ে বসেই পাট শ্রমিকদের বেতন ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নের জন্য সঙ্গে সঙ্গে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার সাহস রাখেন। এ নিয়ে তিনি এক সেকেন্ডের বেশি চিন্তা করেন না। কারণ, তিনি অর্থনীতিকে সেই জায়গায় নিয়ে এসেছেন। তাই দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে অর্থাৎ পিজি হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যালকে ব্যাঙ্কক হাসপাতালের মতো বিশ্বমানে নিয়ে যেতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় বর্তমানের অর্থনীতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাহসের কাছে অতি সামান্য বিষয়। সংশ্লিষ্টদের শুধু প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিশ্চিত করতে হবে, কোনরূপ দুর্নীতি ছাড়া প্রকৃতই সর্বশেষ টেকনোলজি সব সময়ই আনা হবে এবং তা পরিচালনার জন্য দক্ষ মানবশক্তিও সারাক্ষণ তৈরির ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। আশা করা যায় এটুকু হলেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য খুব দ্রুতই বাস্তবে রূপ নেবে। দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে।

swadeshroy@gmail.com