১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রান্তজনের বীরত্বগাথা চা বাগানে গণহত্যা

  • প্রণব কান্তি দেব

‘সময় সবকিছু ভুলিয়ে দেয়; ভুলিয়ে রাখে, বেদনাগাথাও সময়ের হাত ধরে ছাইচাপা পড়ে যায়। প্রাত্যহিকতা জীবনের পথে অগ্রসর হতে সহায়তা করে মানুষকে। তাই বলে কি মানুষ বেমালুম ভুলে যায় সবকিছু?’ (রক্তে রাঙা রাজঘাট, পৃ: ১৮)। পাঠক হৃদয়ে ছোড়ে দেয়া অপূর্ব শর্মার এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন এর পরের বাক্যে- ‘না ভোলো না।’ পোড়া মনে বার বার জেগে উঠে বেদনার দাগগুলো। ‘চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১’ গ্রন্থটির পাতায় পাতায় মনে হয় যেন মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধে বাংলার প্রান্তবর্তী এক বিশাল জনগোষ্ঠীর ত্যাগ, বীরত্ব আর শোকগাথা, যেন ফুটে উঠেছে সরল জীবনের মানুষগুলোর সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার ধ্রুপদী কাহিনী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নানা শ্রেণীপেশার মানুষের দান-অবদান ইতিহাসের পাতায় উঠে এলেও চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর কথা আড়ালেই রয়ে গিয়েছিল। অবশ্য সাহিত্যের ঝঁনধষঃবৎহ তত্ত্ব মতে, এসব প্রান্তবর্তী মানুষেরা চিরকালেই আড়ালে থাকে। কিন্তু লেখক, গবেষক অপূর্ব শর্মা তাদের টেনে তুলে আনেন অন্তরের পরম মমতা দিয়ে। বাঙালীর ইতিহাস বিনির্মাণে এইসব সহজ, নির্লোভ, নির্মোহ, সাধারণের চেয়েও সাধারণ একদল মানুষের যে অসীম আত্মত্যাগ লুকিয়ে আছে, এই গ্রন্থ পাঠে তা আমাদের সামনে উঠে আসে। কখনো বেদনা, কখনো বীরত্ব কখনো বা বিদ্রোহ আবার কখনো বা প্রতিরোধ। গ্রন্থটি পাঠে কখনো আদ্র হয়ে উঠে চোখ, কখনো রক্তে জাগে শিহরণ। কখনো মায়া জাগে, কখনো শ্রদ্ধায় অবনত হয় চিত্ত।

মোট ৭৫টি উপ শিরোনামে বিভক্ত গ্রন্থটির প্রতিটি অধ্যায়ে লুকিয়ে আছে মুক্তির সংগ্রামে চা-জনগোষ্ঠীর বলিদানের হৃদয়স্পর্শী বিবরণ; কোথাও আছে হত্যার কারণ বিবৃত, কোথাও আছে হত্যার মর্মন্তুদ বর্ণনা। ‘কালিঘাটে কালরাত’, ‘মির্জাপুরের মীরজাফর’, ‘কলাপাড়ায় লাশের কয়লা’, ‘বাজারে যাওয়া হয়নি নকুলের’, ‘ভাড়াউড়ার ভয়াল দিন’, ‘রক্তে রাঙা রাজঘাট’, ‘সাতগাঁওয়ে স্বাধীনতার শত্রু’- প্রভৃতি অধ্যায়গুলোতে একদিকে যেমন বিবৃত হয়েছে পাক সেনাদের পাশবিক অত্যাচারের চিত্র অন্যদিকে তেমনি উঠে এসেছে দেশ-মাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে সরলপ্রাণ মানুষের আত্মদানের গল্প। তাই আলোচ্য গ্রন্থটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠের এক নিবিড় অনুষঙ্গ বলে আমরা অনায়াসে আখ্যায়িত করতে পারি। এ গ্রন্থটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একাত্তরে কীভাবে বাংলার কুলি, মজুর, শ্রমিক, কৃষাণ, তাঁতি, তরুণ-যুবক-বয়োবৃদ্ধ নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে অকাতরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মরণপণ সংগ্রামে। গ্রন্থে আমরা প্রত্যক্ষ করি, পাক সেনাদের বর্বোরচিত আক্রমণের বিবরণ। মালিক থেকে শ্রমিক, তরুণ থেকে তরুণী কেউ বাদ যায়নি পাক হানাদারদের শ্যোন দৃষ্টি থেকে। সত্যিকার একাত্তরে গোটা বাংলাদেশজুড়ে এদেশের স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষের উপর যে নির্দয়, অমানবিক, পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিল পাকবাহিনী, এ গ্রন্থের আলোচ্য চা-জনগোষ্ঠীও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। অপূর্ব শর্মার বিবরণগুলো হৃদয়গ্রাহী, কাব্যিক শিরোনামগুলো নাড়া দেয় ভেতরটাকে। ঘটনার বর্ণনায় আছে তথ্যে সন্নিবেশ, কোথাও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ। ইতিহাসের মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলোকে লেখক কখনো দেখেছেন সংবাদকর্মীর চোখে আবার কখনো একজন গবেষকের চোখে। লেখনীর ভাষা ও উপস্থাপনা আমার কাছে কখনো মনে হয়েছে ‘ঘধৎৎধঃরাব খরঃবৎধঃঁৎব’এর মতো। গ্রন্থের শেষভাগে ‘পরিশিষ্ট’ অংশটুকু নতুন প্রজন্মকে, মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস অনুসন্ধানী পাঠকদের তথ্যভা-ার সমৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস।

পরিশেষে, এটুকু বলতে পারি যে, ১২০ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর বলিদানের এক শোকগাথা। গ্রন্থ পাঠে পাওয়া যায় যেমন একদল সহজ মানুষের দেশের তরে আত্মোৎসর্গের সরল আখ্যান, তেমনি আবার পাওয়া যায় পাকসেনাদের হৃদয়হীনতার করুণ চিত্রও। এ গ্রন্থটি যেমন মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের কাছে তথ্যের বাতায়ন খুলে দেয় তেমনি ইতিহাস অনুসন্ধানীদেরও দিতে পারে তৃষ্ণা নিবারণের বার্তা। সব মিলিয়ে বলা যায়, অপূর্ব শর্মার শ্রম ও নিষ্ঠালব্দ ‘চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১’ গ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থ মালার কাতারে এক হৃদয়স্পর্শী, তথ্যভিত্তিক সংযোজন।