২০ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার চান এরশাদ

নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার চান এরশাদ
  • জাতীয় পার্টির বর্ণাঢ্য সম্মেলন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কারের দাবি জানিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, চলমান নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার না হলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। গণতন্ত্রও টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। শনিবার সকালে দীর্ঘ সাতবছর পর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত দলের অষ্টম জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সকাল সাড়ে ১০টার পর সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ সময় শিল্পীরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সকাল থেকে বিভিন্ন জেলা ও থানা থেকে দলে দলে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আসতে থাকেন। এরশাদের নয় বছরের শাসনামলের বিভিন্ন উন্নয়নচিত্র ব্যানার ও ফেস্টুনের মাধ্যমে তুলে ধরেন তারা। নানারকম বাদ্য বাজনা আর ব্যান্ডপার্টির তালে তালে নেচে গেয়ে আসেন তৃণমূলের কর্মী সমর্থকরা। হাতি ও ঘোড়ার গাড়িও আনা হয় সম্মেলনস্থলে। সম্মেলন উপলক্ষে নতুন গেঞ্জি, ফুলের মালাসহ নানা ঢঙ্গে সেজে আসেন কর্মীরা। মিছিল আর সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত হয় চারপাশ।

বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে ঢাকা-৪ আসনের এমপি আবু হোসেন বাবলার শোডাউন ছিল চোখে পড়ার মতো। সকল নেতাকর্মীর গলায় ঝোলানো ছিল ডেলিগেটস ও কাউন্সিলর লেখা কার্ড। মিলনায়তনের বাইরে ফাঁকা জায়গা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চেয়ারসহ সামিয়ানা টাঙ্গানো হয়। ভেতরে জায়গা স্বল্পতার কারণে বাইরে বিভিন্ন স্পটে স্ক্রিনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। এতসব আয়োজনের কারণে দলের নেতারা বলছেন, জাতীয় পার্টির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সম্মেলন। সকলেই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তবে সম্মেলনের কারণে জাতীয় প্রেসক্লাব, মৎস্য ভবন, শিল্পকলা, কাকরাইল, শাহবাগসহ আশপাশের রাস্তায় দিনভর ছিল যানজট। রাস্তার ওপর এলোমেলোভাবে বাস ও বিভিন্ন পরিবহন রাখায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়।

এবারের সম্মেলন উপলক্ষে গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হলেও দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী থাকছেন এরশাদই। তিনি ইচ্ছে করলে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এমন এখতিয়ার গঠনতন্ত্রে রয়েছে। তাছাড়া নতুন করে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান পদ যুক্ত করা হয়েছে। ফলে নিজ ঘরেই সর্বময় ক্ষমতা। এদিকে দলের সর্বোচ্চ চার পদে কোন পরিবর্তন হয়নি। অষ্টম জাতীয় সম্মেলনেও পার্টির চেয়ারম্যান হয়েছেন এরশাদ। মহাসচিব হয়েছেন এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার।

সম্মেলনে এরশাদ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে সব দলের প্রার্থীরা অংশ নেবে। দলকে ভোট দেবেন ভোটাররা। ব্যক্তিকে নয়। ভোটের আনুপাতিক হারে সরকার গঠন করার প্রস্তাব দেন তিনি। বলেন, এখন দেখি ৪০ ভাগ ভোট পেয়ে বিভিন্ন দল সরকার গঠন করে। নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার করা গেলে দেশে সহিংসতা হবে না। উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করেন এরশাদ। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন হবে না।

দেশের উন্নয়নের অন্তরায় হিংসার রাজনীতি একথা উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, আমাদের সবাইকে হিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটিই আমাদের প্রধান শত্রু। সবার মনেই কেন যেন হিংসা কাজ করে। সকল ধর্মের মানুষের নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে এরশাদ বলেন, আমরা ভাল নেই। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। কারও জীবনের নিরাপত্তা দেখছি না। একের পর এক মানুষ হত্যা হচ্ছে। কিন্তু আমরা সবাই হাত গুটিয়ে বসে আছি। কেউ কিছু বলছি না। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সমালোচনা করে বলেন, যে নির্বাচনে ৮৪ জন মানুষ নিহত হয় সে নির্বাচন কখনই স্বচ্ছ হতে পারে না। বাস্তবতা হলো এ নির্বাচন কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এটা কোন নির্বাচন হতে পারে না। ক্ষমতার প্রভাবে অনেক প্রার্থী পাস করেছেন। এক কথায় পেশিশক্তি দিয়ে জয়লাভ করেছে ক্ষমতাসীন দল।

এরশাদ দাবি করেছেন, জাতীয় পার্টি সৃষ্টি হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। জাতীয় পার্টি ছেড়ে যাওয়া নেতাদের আবার দলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে তার ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। সেনাপ্রধান হিসেবেই তাঁর ওপর দায়িত্ব এসেছিল। তখন যে কেউ সেনাপ্রধান থাকলে তাঁর ওপর ওই দায়িত্ব আসত।

এরশাদ দাবি করেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে তিনি ব্যারাকে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। এ জন্য ১৯৮৪ সালে নির্বাচন দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান দলগুলো সে নির্বাচনে অংশ নেয়নি বলে তিনি ব্যারাকে ফিরে যেতে পারেননি। প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন, দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ, কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মশিউর রহমান রাঙা, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, তাজুল ইসলাম, ফখরুল ইমাম, এম এ সাত্তার, মীর আবদুস সবুর আসুদ প্রমুখ।

দেশের ইতিহাসে জাতীয় পার্টির অষ্টম জাতীয় সম্মেলনই সবচেয়ে সফল। এ সম্মেলনের মাধ্যমেই জাতীয় পার্টি ঘুরে দাঁড়াবে। দেশের মানুষের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে এরশাদ আরও বলেন, জাতীয় পার্টির বয়স ৩০ বছর ৫ মাস হলো। এরমধ্যে ৮টি সম্মেলন পার করেছে। দেশের ইতিহাসে কোন রাজনৈতিক দল এরকম সফল সম্মেলন করতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, জাতীয় পার্টি ছাড়া এ দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের উন্নয়নে এই সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় পার্টি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আপনারা সারাদেশে এই বার্তা পৌঁছে দিন। সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে কাউন্সিল অধিবেশনে জাতীয় পার্টির ৭১টি সাংগঠনিক জেলা থেকে আসা ১৯ হাজার ৭শ’ কাউন্সিলর অংশ নেন। ডেলিগেট ছিলেন আরও প্রায় ৫০ হাজার।

দলের ভেতরের নানা দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ ও অভিন্ন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি বলেন, শুধুমাত্র লোক সমাগম ও সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় নয়, দলের মানুষগুলোকে হতে হবে ঐক্যবদ্ধ। এজন্য প্রয়োজন এক ও অভিন্ন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও শৃঙ্খলাবোধ। জাতীয় পার্টিকে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। কাউন্সিলের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তিন বছরের জন্য দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন ও বিগত দিনের রাজনীতি পর্যালোচনা করে আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের জন্যই আজকের এ সমাবেশ।

জিএম কাদের বলেন, রাজনৈতিক পরিবেশ স্বস্তিদায়ক, সুষ্ঠু ও স্থিতিশীল না থাকায় দেশে কাক্সিক্ষত বিনোয়োগ হচ্ছে না। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল হয়ে আসছে। বেকার সমস্যা মহামারীর ন্যায় ছড়িয়ে পড়ছে। দেশীয় সম্পদ পাচার হয়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠছে প্রতিদিন। সাধারণ মানুষ এই নিরাপত্তাহীনতা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি চায়। তারা চায় জনস্বার্থের রাজনীতি। হঠাৎ করে অল্প দিনে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্ভব নয়। তবে শুরু কোন না কোন দলকে করতে হবে।

এরশাদ ফের চেয়ারম্যান মহাসচিব রুহুল ॥ জাতীয় পার্টি কাউন্সিলে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং মহাসচিব হিসেবে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ফের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়াও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হিসেবে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও কো-চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরকে নির্বাচিত করা হয়েছে। পরে নবনির্বাচিতদের ফুলের তোড়া দিয়ে নেতাকর্মীরা অভিনন্দন জানান। শনিবার দুপুরে দলের অষ্টম জাতীয় সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্বের এই কাউন্সিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলাম তাদের নাম প্রস্তাব করেন। পরে উপস্থিত কাউন্সিলররা এই প্রস্তাব সমর্থন করেন।

দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নির্বাহী কমিটি গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে। এর আগে দলের গঠনতন্ত্র পাস করা হয়। কো-চেয়ারম্যান পদের অনুমোদন ও পার্টির চেয়ারম্যানের ৩৯ ধারায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে সেই গঠনতন্ত্রে। উল্লেখ্য দলের যাত্রা শুরু থেকে এরশাদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।