১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লাঞ্ছিত সেই প্রধান শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত

লাঞ্ছিত সেই প্রধান শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত

নিজস্ব সংবাদদাতা, নারায়ণগঞ্জ ॥ নারায়ণগঞ্জের বন্দরের কল্যান্দী এলাকায় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনির শিকার ও কান ধরে ওঠবস করানো পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ। সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা একটি চিঠি মঙ্গলবার দুপুরে ওই প্রধান শিক্ষকের কাছে পৌঁছেছে বলে সাংবাদিকদের জানান।

এদিকে ওই প্রধান শিক্ষককের কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও বন্দর এলাকার জনতার মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় ফেইসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ওই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ায় এখন ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সর্বত্র বইছে নিন্দার ঝড়।

শুক্রবার ১৩ মে ইসলাম ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত করে মন্তব্য করার অভিযোগে ও এক ছাত্রকে প্রহার করার ঘটনায় বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত উত্তেজিত জনতার হাতে গণপিটুনিতে আহত হন। পরে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাতীয়পার্টি দলীয় এমপি সেলিম ওসমান একই অভিযোগে তাকে কানে ধরে ওঠবস করিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। ওই প্রধান শিক্ষক এখনও (মঙ্গলবার) নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে ৩শ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে গত ১৩ মে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ চারটি কারণ উল্লেখ করে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেন। চারটি কারণ উল্লেখ করে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতি ওই বরখাস্তের চিঠিটি নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে ৩শ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন ওই প্রধান শিক্ষকের কাছে মঙ্গলবার দুপুরে পৌঁছে।

চিঠিতে বরখাস্তের কারণ উল্লেখ্য করা হয়- আপনি ছাত্রদের উপর শারীরিক নির্যাতন করেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকুরী দেয়ার নাম করে অর্থ গ্রহণ করেছেন, ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন, বিদ্যালয়ের ছুটি ব্যতিরকে অনুপস্থিত থাকেন এবং প্রায়ই দেরি করে বিদ্যালয়ে আসেন। চিঠিতে আরও উল্লেখ্য করেন, গত ১৩ মে ২০১৬ইং তারিখের ম্যানেজিং কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক আপনাকে (ওই প্রধান শিক্ষককে) পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। অনুলিপি দেয়া হয়েছে স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও বন্দর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে।

নাম প্রকাশ্যে বন্দরের এক ব্যক্তি জানান, ওই প্রধান শিক্ষককের কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও বন্দর এলাকার ছাত্র, যুবকসহ বিভিন্ন পেশার লোকজনের মোবাইলে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় ফেইসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ওই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ায় এখন ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সর্বত্র বইছে নিন্দার ঝড়।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, সেই দিন মসজিদের মাইকেও ধর্মীয় অনুভুতুতিতে আঘাতের কথা প্রচার করে জনতাকে উত্তেজিত করা হয়েছিল। মাইকে প্রচারের পর পর কয়েক হাজার জনতা স্কুল মাঠে জড়ো হয়। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে এ ঘটনা ঘটলেও গণপিটুনির ঘটনার আগে ঘটনা জানতেন না পার্শ্ববর্তী কল্যানদি বায়তুল আতিক জামে মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সকাল দশটার দিকে স্কুলের কয়েকজন ছাত্র এসে তার কাছে মসজিদের চাবি চায়। তিনি তাদের জানান, শুক্রবার মসজিদ খোলাই থাকে। চাবির প্রয়োজন নেই। এরপর ছাত্ররা গিয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়, ‘আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল নিয়ে প্রধান শিক্ষক কটুক্তি করেছেন। স্কুলের উপর হামলা চলছে। আপনারা তাড়াতাড়ি সমাধান দেন। মাতব্বর সাহেবরা কে কোথায় আছেন। তাড়াতাড়ি আসুন। হেডমাস্টার কটুক্তি করার কারণে ছাত্ররা উত্তেজিত হয়েছে। স্কুল রক্ষা করুন। মাইকে কয়েকজন ছাত্রের কন্ঠ আমি শুনেছি। এসময় আমরা জানতে পারি তিনি ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করেছেন। এলাকার অনেকেই তা শুনেছে।

বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মৌসুমী হাবিব জানান, ঐ দিনেই (১৩ মে) বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ প্রধান শিক্ষক প্রধান শ্যামল কান্তি ভক্তকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। বরখাস্ত করার চিঠির অনুলিপি আমি হাতে পেয়েছি। তিনি আরও জানান, শিক্ষকের বিষয়টি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি তদন্ত করছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী ৫ কার্য দিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। আমার জানামতে ওই প্রধান শিক্ষক এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।