২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তনু হত্যার বিচার সম্ভব ॥ আইনমন্ত্রী

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তনু হত্যার বিচার সম্ভব ॥ আইনমন্ত্রী
  • ডিএনএ পরীক্ষায় প্রাপ্ত ৩ ধর্ষকের নমুনা মেলাতে শীর্ষ সন্দেহভাজনদের বাছাই শুরু

আরাফাত মুন্না/মীর শাহ আলম ॥ দেশব্যাপী আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার হতে পারে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলেই এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠাতে পারে। এই আইনের ৫ ও ৬ ধারা অনুযায়ী মামলাটি স্থানান্তরে কোন আইনী বাধাও নেই। মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্যেও এসেছে এমন ইঙ্গিত।

এদিকে তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সিআইডি’র ডিএনএ পরীক্ষায় প্রাপ্ত ৩ ধর্ষকের বীর্যসহ অন্যান্য নমুনা মেলাতে টপ সন্দেহভাজনদের ইতোমধ্যে বাছাই শুরু হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে খুব শীঘ্রই বাছাইকৃত সন্দেহভাজনদের ডিএনএ নমুনা ম্যাচ করে ঘাতকদের শনাক্ত করা হবে বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে।

মঙ্গলবার বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে তিন দিনব্যাপী জুডিশিয়াল এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং কোর্সের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলে তনু হত্যা মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা যেতে পারে। আইনমন্ত্রী বলেন, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এটা জনগণের মনকে যথেষ্ট বিচলিত করেছে। জনগণ এটার একটা সুষ্ঠু বিচার চান। এসব প্রেক্ষিত বিচার করে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো যায় কিনা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা বিবেচনা করবে।

এ ঘটনার ময়নাতদন্তের দুটি প্রতিবেদন ভিন্ন হওয়া প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এ সম্পর্কে মন্তব্য করাটা ঠিক নয়। তবে এতটুকু বলব ময়নাতদন্তের রিপোর্টগুলো তদন্তের অংশ। এগুলো যখন পুলিশ আদালতে তার প্রতিবেদন দাখিল করবে তখন এই দুটো প্রতিবেদন সম্পর্কে পুলিশের একটা মন্তব্য থাকবে। এখন আদালতে যদি কোন আবেদন করা হয়, তাহলে এটা সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার, তারা কি নির্দেশনা দেবে।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যে মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করিবে শুধু সেই মামলাই এই ট্রাইব্যুনাল বিচার করিবে? আর এই আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, জনস্বার্থে, হত্যা, ধর্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য এবং মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধের বিচারাধীন কোন মামলা উহার যে কোন পর্যায়ে ক্ষেত্রমত, দায়রা আদালত বা বিশেষ আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত হইতে বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করিতে পারিবে?

৩ ধর্ষকের নমুনা মেলাতে সন্দেহভাজনদের বাছাই শুরু ॥

দেশব্যাপী আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সিআইডি’র ডিএনএ পরীক্ষায় প্রাপ্ত ৩ ধর্ষকের বীর্যসহ অন্যান্য নমুনা মেলাতে টপ সন্দেহভাজনদের ইতোমধ্যে বাছাই শুরু হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে খুব শীঘ্রই বাছাইকৃত সন্দেহভাজনদের ডিএনএ নমুনা ম্যাচ করে ঘাতকদের শনাক্ত করা হবে। এদিকে তনুর মা আনোয়ারা বেগম মঙ্গলবার সিআইডি’র তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত ঘাতকদের গ্রেফতারের দাবি জানান। এর আগে তিনি তার মেয়ে তনুকে হত্যার জন্য দুই সেনা সদস্যকে দায়ী করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। এদিকে সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান বিকেলে সাংবাদিকদের নিকট মামলার যথেষ্ট অগ্রগতি আছে বলে দাবি করেন।

জানা গেছে, গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরের একটি জঙ্গল থেকে তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ ও ডিবি’র পর বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। এর আগে তদন্তকারী সংস্থা ডিবি’র আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে গত ৩০ মার্চ মুরাদনগরের মির্জাপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে পুনরায় তনুর লাশ উত্তোলন করে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয় এবং ডিএনএ ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরির জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সিআইডি জানায়, ডিএনএ পরীক্ষায় ৪ জনের প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এরমধ্যে একটি তনুর এবং অন্যগুলো ৩ ব্যক্তির। হত্যার আগে ঘাতকরা তনুকে ধর্ষণ করেছিল। ওই ৩ ব্যক্তির প্রোফাইলের সূত্র ধরে মামলার তদন্তভার গ্রহণের পর থেকে সিআইডি এ পর্যন্ত যাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে প্রাপ্ত নমুনা ম্যাচ করতে টপ প্রায়োরিটি দিয়ে তাদের বাছাই কাজ শুরু করেছে। সিআইডি কুমিল্লার বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিকদের জানান, ছোট্ট একটি বাছাই তালিকা নিয়ে আদালতের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে এবং তনুর ডিএনএ থেকে প্রাপ্ত নমুনার সাথে ম্যাচ করে ঘাতকদের শনাক্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, এ কাজটি করতে খুব বেশিদিন সময় নেব না। আমরা জাতিকে একটি সুসংবাদ দেয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি দ্রুতই ভাল সংবাদ দিতে পারব।

এদিকে তনুর প্রথম সুরতহাল ও দ্বিতীয় সুরতহাল রিপোর্টে গরমিল এবং প্রথম ময়নাতদন্ত রিপোর্টে হত্যার কারণ উল্লেখ না থাকা ও ধর্ষণের আলামত না পাওয়াসহ ৪৯ দিনেও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় মামলার তদন্তে অনেকটা বেগ পেতে হচ্ছে সিআইডিকে।

সিআইডি সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ময়নাতদন্তকারী মেডিক্যাল বোর্ড মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং আদালতের নিকট আবেদন করে ডিএনএ প্রতিবেদন চেয়েছিল। এখন তা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সরবরাহ করতে সমস্যা থাকার কথা নয়। এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে প্রথম ময়নাতদন্তকারী কর্মকর্তা ডা. শারমিন সুলতানার নিকট সাংবাদিকরা প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও সিআইডি’র ডিএনএ প্রতিবেদনে পার্থক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত ১০ মে কুমিল্লা সিআইডি কার্যালয়ে সপ্তমবারের মতো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গিয়ে তনুর ক্ষুব্ধ মা সাংবাদিকদের বলেন, কুমিল্লা সেনানিবাসের সার্জেন্ট জাহিদ ও সিপাহী জাহিদকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। ওই দিন তনুর পরিবারের ৪ সদস্যসহ ৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি ঢাকার সিনিয়র বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দের নেতৃত্বে একটি দল। তনুর মা ও বাবা গতকাল মঙ্গলবারও কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এ সময় তনুর মা আনোয়ারা বেগম সিআইডি’র ডিএনএ রিপোর্টে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমার বাসার সামনে আমার মেয়েকে মারল। কিন্তু এতদিন হয়ে গেল এখনও তাদের কেন ধরা গেল না। আমার মেয়েকে যারা ধর্ষণ করে হত্যা করেছে তাদের কঠিন শাস্তি চাই। ডিএনএ পরীক্ষা নিয়ে সিআইডির প্রতিবেদনের বিষয়ে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমি চাই তনু হত্যার সাথে যারা জড়িত, সে যে-ই হোক তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হোক।

এদিকে তনু হত্যাকা-, আসামি শনাক্ত-গ্রেফতার, সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নিয়ে দেশব্যাপী প্রতিবাদী ছাত্র-জনতার ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। সেনানিবাসের ভেতর থেকে তনুর লাশ উদ্ধারসহ এ হত্যাকা- ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠে বিভিন্ন মহল থেকে। যদিও সেনাবাহিনী থেকে তদন্তে সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

সেনানিবাসের ভেতরে একটি স্টাফ কোয়ার্টারে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তনু। হত্যাকা-ের দিন সন্ধ্যায় ৩০০ গজ দূরে আরেকটি স্টাফ কোয়ার্টারে ছাত্র পড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে না ফেরার রাতে ইয়ার হোসেন মেয়েকে খুঁজতে বের হন। দুই স্টাফ কোয়ার্টারের মাঝের অনেকটা নির্জন পথের ধারে ঝোঁপের মধ্যে অচেতন অবস্থায় তনুকে পান তিনি। তনুকে পাওয়ার আগে খোঁজার সময় অপরিচিত কয়েক যুবককে দ্রুত সরে পড়তে দেখেছিলেন বলে ইয়ার হোসেন জানান। নিম্নবিত্তের পরিবারের সন্তান তনু টিউশনি করে তার পড়ার খরচ জোগানোর পাশাপাশি নাট্য সংগঠনে যুক্ত ছিলেন।