২১ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একাধিকবার ইসরাইলে যাতায়াত করেছেন আসলাম চৌধুরী

একাধিকবার ইসরাইলে যাতায়াত করেছেন আসলাম চৌধুরী

গাফফার খান চৌধুরী ॥ রাজনীতি ও ব্যবসায়িক কর্মকা-ের আড়ালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী বাংলাদেশে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট হয়ে কাজ করছেন বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের। আসলাম চৌধুরী একাধিকবার ইসরাইলে যাতায়াত করেছেন বলেও জানা গেছে।

কাজের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যত কর্ম পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতেই ইসরাইলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির সদস্য মেনদি এন সাফাদি ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে আসলাম চৌধুরী বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকটি একেবারেই পূর্ব নির্ধারিত ছিল বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। আসলাম চৌধুরী কত দিন ধরে মোসাদের হয়ে বাংলাদেশে কাজ করছেন সে বিষয়ে তথ্য পেতে তার ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও বিদেশ যাতায়াতের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। দুদক তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে। বিমানবন্দরগুলোতে থাকা পুরনো নথিপত্র পর্যালোচনা ছাড়াও দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আসলাম চৌধুরীর বিষয়ে যোগাযোগ চলছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও দেশটির ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির সদস্য মেনদি এন সাফাদির সঙ্গে গোপন বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়। মেনদি এন সাফাদি মোসাদের এজেন্ট বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন খবর প্রকাশের পর থেকেই আসলাম চৌধুরীর গতিবিধির উপর নজরদারি করছিল গোয়েন্দারা। তার দেশত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সর্বশেষ গত ১৫ মে সন্ধ্যায় রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকা থেকে চালকসহ আসলাম চৌধুরীকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রিমান্ডে আসলাম চৌধুরী সঠিক তথ্য দিচ্ছেন না। দেখা সাক্ষাত, অনুষ্ঠানে মেন্দি, এক নারীসহ অন্যদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের ছবি তোলাসহ বিভিন্ন বিষয়ের কথা স্বীকার করেছেন আসলাম চৌধুরী। এসব বিষয় স্বীকার করলেও বৈঠক করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি। এমনকি এই প্রথমবারের মতো মেনদি এন সাফাদি এবং মোসাদের লোকজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন আসলাম চৌধুরী। যদিও মেনদি এন সাফাদিও বলেছেন, আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে তার দেখা সাক্ষাত হয়েছে। তবে কোন বৈঠক হয়নি।

তদন্তকারী সংস্থার একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ধারণা করা হচ্ছে, আসলাম চৌধুরী বাংলাদেশে মোসাদের এজেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত গোপনে কাজ করছেন। তবে ঠিক কতদিন যাবত কাজ করছেন সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন তথ্য মেলেনি। সার্বিক কর্মকা-ে মনে হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে মোসাদের হয়ে কাজ করছেন আসলাম চৌধুরী। আগাগোড়াই তৎপর থাকা আসলাম চৌধুরী বিএনপির দলীয় পদ পাওয়ার পর আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে ক্ষমতায় আনতে নানাভাবেই তৎপরতা চালাচ্ছিলেন তিনি। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে তিনি এমন তৎপরতা চালাচ্ছিলেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলছেন, অন্তত ২৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে আসলাম চৌধুরীর। এক কথায় বিত্তশালী। হরহামেশাই বিদেশে যাতায়াত। ব্যবসায়িকসহ নানা কারণে তিনি বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন। এমনকি তার একাধিকবার ইসরাইলে যাতায়াত করার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে বিমানবন্দর, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিদেশের সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে। বিদেশে যাতায়াত এবং অর্থের সূত্র ধরে তারেক রহমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। পার্টিতে অর্থের যোগান দেয়ার কারণে তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের পদটি পেয়ে যান। পদ পাওয়ার পর তার ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের আড়ালে জোরালো হতে থাকে সরকার বিরোধী তৎপরতা। সেইসঙ্গে মোসাদের এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে তৎপরতা চালাতে থাকেন।

আসলাম চৌধুরী চলতি বছরের ৫ থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত মেনদি এন সাফাদি ও মোসাদের এজেন্টদের সঙ্গে দিল্লী ও আগ্রায় অবস্থান করেন। টানা পাঁচ দিনই তিনি সেখানে ছিলেন। তবে কতবার বৈঠক হয়েছে, সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। মোট পাঁচ দিন পাঁচ রাতই আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে মেনদি ও মোসাদের দিল্লী ও আগ্রায় হরদম কথাবার্তা এবং দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। পাঁচ দিনের টানা অবস্থানের বিষয়টি আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে মোসাদের দীর্ঘ যোগাযোগ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, আসলাম চৌধুরী মোসাদের হয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত গোপনে রাজনৈতিক কর্মকা- আর ব্যবসার আড়ালে কাজ করছিলেন। কাজের অগ্রগতি ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতেই দিল্লীতে ওই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। যা ছিল একেবারেই পূর্ব নির্ধারিত।

ইতোমধ্যেই আসলাম চৌধুরীর একটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। আরও পাসপোর্টের সন্ধান চলছে। বিদেশ সফর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে বিমানবন্দরগুলোতে থাকা পুরনো নথিপত্র পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। আসলাম চৌধুরী মোসাদের সঙ্গে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন, সে বিষয়টি স্পষ্ট। এজন্য তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তথ্য পেতে বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা ও কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, আসলাম চৌধুরী পরস্পর বিরোধী তথ্য দিচ্ছেন। তার তথ্য যাচাইবাছাই চলছে। তার ব্যক্তিগত, ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়াদি ছাড়াও বিদেশ যাতায়াতের তথ্য পেতে বিভিন্ন বিমানবন্দরসহ সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে যোগাযোগ চলছে।

এদিকে আসলাম চৌধুরীর অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান করার ঘোষণা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বুধবার দুদক কার্যালয়ে এক বৈঠকে উপ-পরিচালক মোঃ নাসির উদ্দিনকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জানান কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য। দুদক সূত্রে জানা গেছে, আসলাম চৌধুরীর মালিকানাধীন রাইজিং গ্রুপের বিরুদ্ধে কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে প্যালেস্টাইন প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জিয়াউল করিম দুলু ও সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এবি সিদ্দিক মোল্লা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মোসাদের এজেন্টদের অপতৎপরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, মোসাদের অর্থায়নে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা চলছে। এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।