১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রমোদ মানকিন : যাত্রাশিল্পে যিনি স্মরণীয়

সদ্যপ্রয়াত সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন ছিলেন একজন বিশিষ্ট সংস্কৃতি অনুরাগী। তাঁর সৃজনশীল চিন্তাচেতনার স্বাক্ষর রয়েছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পেও। এসব নানা ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর সান্নিধ্যে থাকা বিশিষ্ট যাত্রানট, বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দে

ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রমোদ মানকিন আর নেই- শোক সংবাদটি যখন টিভি পর্দায় বারবার দেখানো হচ্ছিল, তখন আমার এবং আমার মতো অনেক যাত্রাশিল্পীর বাকশক্তি প্রায় রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ কী মর্মান্তিক দুঃসংবাদ! কয়েক মাস আগেও তো তাঁর সঙ্গে একই মঞ্চে বক্তৃতা করেছি। কত মজার কথা শুনেছি তাঁর মুখ থেকে। আ: স্মৃতি বড় বেদনা!

প্রমোদ মানকিনকে আমি কখনও মন্ত্রী হিসেবে দেখিনি। তাঁর সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা এরকম: তিনি আপাদমস্তক একজন সংস্কৃতি অনুরাগী। রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী এবং বিভিন্ন শিল্প সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে তাঁর ভাষণ ছিল রসময়, তীর্যক ও শাণিত। যাত্রাশিল্প নিয়েও তিনি সৃজনশীল চিন্তা-চেতনার কথা বলেছেন। রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলনে তাঁর অবদান সম্পর্কে যেমন আলোচনা হবে, তেমনি যাত্রাশিল্পেও, যাত্রার মানুষগুলোর কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আপন মহিমায়। আমি এখানে তাঁর যাত্রা সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কয়েকটি ঘটনার সামান্য স্মৃতিচারণ করছি।

জন্ম তাঁর নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরে। পরে ময়মনসিংহের শেষ সীমানা হালুয়াঘাট উপজেলার কচুন্দরা গ্রামে স্ত্রীর নামে গড়ে তোলেন ‘মমতা ভিলা।’ একবার আমরা কয়েকজন যাত্রাশিল্পী তাঁর ওই বাড়িতে বেড়াতে গেলে তিনি অনেক হাসি তামাশা করে বলেছিলেন, ‘সম্রাট সাজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজকে ভালবেসে বানিয়েছেন ‘তাজমহল’। আর আমার সহধর্মিণী মমতার নামে তৈরি করেছি ‘মমতা ভিলা’। এটা নিয়ে বেশ যাত্রাপালা হয় তাই না?’ অনেকেই জানেন তাঁর নির্বাচনী এলাকা হালুয়াঘাটে প্রতি বছর শীত মৌসুমে প্রচুর যাত্রা প্রদর্শনী হতো এক সময় এবং তিনি নিজে এসব অনুষ্ঠান আয়োজনে সহায়তা করতেন। সময় পেলে রাতভর যাত্রা দেখতেন।

২০১১ সালে আমাদের সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ সরকারী অনুদান পেয়েছিল। অনুদানের টাকায় আমরা খুলনা ও চট্টগ্রামে দুটি বড় ধরনের যাত্রা উৎসব এবং কয়েকটি সেমিনার করেছিলাম। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে খুলনার হাদিস পার্কে আয়োজিত ১০ দিনের যাত্রা উৎসব উদ্বোধন করেন এ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন। সেদিন তিনি মজা করে যাত্রার একটি গান গেয়ে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। ওই বছরের অক্টোবরে মানিকগঞ্জের জাবরায় একুশে পদকপ্রাপ্ত যাত্রাভিনেত্রী জ্যোৎস্না বিশ্বাস ও অরুণা বিশ্বাসের যাত্রা বিষয়ক একটি প্রকল্প উদ্বোধনের সময়েও গান গেয়েছিলেন তিনি, পরে বক্তৃতা করেন। জেনেছিলাম, এটি তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তিনি বলতেন ‘যাত্রাগান’ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। সুতরাং কথার আগে দু’এক কলি গান না গাইলে জমবে কেন!

বক্তৃতা-বিবৃতিতে তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘যাত্রার অশ্লীলতা নিয়ে খুব থিওরিটিক্যাল কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে আজকাল। অশ্লীলতা কম-বেশি কোথায় নেই? আমাদের সমাজ কি অশ্লীলতামুক্ত? এক সময় কি পচা আবর্জনায় ভরপুর ছিল না ঢাকার সিনেমা? আসলে যাত্রাশিল্প ক্ষেত্রে অশ্লীলতার বিষয়টি বেশি করে দেখা হয়। ২০১১ সালের নবেম্বরে গাজীপুরে আরেকটি যাত্রা উৎসব উদ্বোধন করতে গিয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন বলেন, ‘এদেশের যাত্রাশিল্প ও শিল্পীদের মূল্যায়নের জন্য বর্তমান সংস্কৃতিবান্ধব সরকার একটি যাত্রা-নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা এখন সমাপ্ত প্রায়’। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০১২ সালের ৩০ আগস্ট এদেশে প্রথম যাত্রা নীতিমালা গেজেটভুক্ত হয়। এই নীতিমালা যাতে আলোর মুখ দেখে, সেজন্য তিনি এবং শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী প্রচুর পরিশ্রম করেছেন।

কয়েক বছর আগে বিটিভিতে অরুণা বিশ্বাসের পরিচালনায় ও জ্যোৎস্না বিশ্বাসের উপস্থাপনায় ‘যাত্রালোক’ নামে একটি প্রামাণ্য অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো। এতে বিভিন্ন পর্বে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মুখোমুখি করা হতো যাত্রাশিল্পীদের। একবার অনুষ্ঠান রেকর্ডিংয়ে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন প্রমোদ মানকিন ও নাট্যকার মান্নান হীরা। অরুণাকে খুব স্নেহ করতেন মন্ত্রী।

তাঁকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা। কয়েক পাতা লিখলেও তা শেষ হবে না। মুঠোফোনে যতবারই তাঁকে কল করেছি, দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তিনি ধরেছেন। যাত্রার খবর জানতে চাইতেন। তাঁর এমপি হোস্টেলের বাসায়ও কয়েকবার গিয়েছি। তদ্বিরের জন্য এলাকার কেউ তাঁর কাছে এলে বলতে শুনেছি, ‘আমি তো ছোট মন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী অর্থে)। ছোট ছোট কাজ করতে পারব। বড় কাজ আমাকে দিয়ে হবে না।’ সর্বশেষ, আমার শ্রদ্ধাভাজন প্রিয় মানুষ প্রমোদ মানকিনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল গত নবেম্বর মাসে ময়মনসিংহ শহরে, এক যাত্রা উৎসবে। জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় এটি আয়োজন করেছিল যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ- ময়মনসিংহ জেলা শাখা। তখন প্রমোদ মানকিন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী নন, দু’বছর আগেই তিনি নতুন দায়িত্ব পান সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। অর্থাৎ সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হয়ে তিনি প্রথম যাত্রা বিষয়ক কোন অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন তাঁর নিজের জেলা ময়মনসিংহ শহরে। সেই অনুষ্ঠানে তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন- ‘দেখলেন তো, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।’ এরপর যখন জানতে পারলেন, অভাবগ্রস্ত দরিদ্র যাত্রাশিল্পীরা স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ আমির আহম্মদ চৌধুরী রতনের নেতৃত্বে এই বিশাল আয়োজন করেছে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে দিয়ে মঞ্চে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেয়ার ঘোষণা দেন। এতগুলো টাকা তখন তাঁর কাছে ছিল না। মুঠোফোনে স্ত্রীকে বললেন, ‘শিগগির ৫০ হাজার টাকা নিয়ে রওয়ানা হও। যাত্রাওয়ালারা আমাকে আটকাইয়া রাখছে।’ ভাবা যায়! সেই রাত ১১টার সময় মন্ত্রী-পতœী, আমাদের শ্রদ্ধেয় বৌদি সেই হালুয়াঘাটের গ্রামের বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে এসে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

সেই দিনের ঘটনায় আমাদের প্রত্যেকের চোখে জল ছলছল করছিল। যাত্রাজগতের প্রিয় বন্ধু প্রমোদ মানকিন আজ আর ইহ জগতে নেই। দেশজ সংস্কৃতির অমৃতের সন্তান চলে গেলেন অমৃতলোকে। এই দুঃখ ও গভীর শোকের সান্ত¡না কোথায়! কত মন্ত্রী আসবেন কত মন্ত্রী যাবেন, কিন্তু যাত্রাদরদী প্রমোদ মানকিনের মতো আর কোন মন্ত্রীর দেখা পাব কি?