২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্ষমতার আস্ফালন পদ্মাবতীর আখ্যান

  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

ভূপেন হাজারিকা সেই কবেই ভূপালি সুরে আর নিজের কথায় স্বকণ্ঠে গেয়েছেন, প্রেমহীন ভালবাসা দেশে দেশে ভেঙ্গেছে সুখের ঘর, পথের মানুষ আপন হয়েছে আপন হয়েছে পড়’। বিশ্বায়নের বিশ্ব বাস্তবতায় ক্ষমতাধর ক্ষমতাহীন এবং সম্ভাব্য ক্ষমতাবানের আপন বলয় গড়ে ওঠা সত্ত্বেও ক্ষমতাবান চায় ক্ষমতাহীন তার অধীনতা স্বীকার করুক। সম্ভাব্য ক্ষমতাবানকে বৈশ্যতা স্বীকার করাতে নিয়ন্ত্রণের বলয় রেখা নির্ধারণ করা হোক। এর অন্যথা হলেই ছলে-বলে এবং কৌশলে ক্ষমতাবানের আস্ফালনে ক্ষমতাহীনের সুখের ঘর-বাহির এবং অন্দর সব কাচের দেয়ালের মতো ভেঙ্গে চুরমার। ফলাফলে একটা বড় অংশের মানুষ আজ তার ঘর থেকে বেরিয়ে নিরুদ্দেশের যাযাবর। ক্ষমতাধর মনসাকে স্তুতি করতে রাজি না হওয়ায় চাঁদ সওদাগরের প্রথম দফায় ছয় সন্তানকে হারানো, দ্বিতীয় দফায় সমুদ্রে জাহাজডুবি, তৃতীয় দফায় লোহার বাসরঘর সৃজন করা সত্ত্বেও পুত্র লক্ষিন্দরের মর্মান্তিক পরিণতির আলোকে প্রচলিত মিথ অবলম্বনে নুসরাত শারমিন তানিয়ার রচনা ও নির্দেশনায় ভিন্ন ব্যাখ্যার নাটক ‘পদ্মাবতীর আখ্যান’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফর্মেন্স স্টাডিজ বিভাগ প্রযোজিত, কবি বিজয়গুপ্ত ও রাধানাথ রায চৌধুরীর পদ্মাপুরান অবলম্বনে নুসরাত শারমিন তানিয়ার রচনা ও নির্দেশনায়, দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে নাটক পদ্মাবতীর আখ্যান মঞ্চস্থিত হলো গত ২ মে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে।

জীবনের কোলাহলে মনসাকে নামিয়ে এনে চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে বোঝাপড়া, সমঝোতার সীমারেখা নির্ধারণ, সমঝোতা ভেঙ্গে যাওয়ায় মনসার প্রতিহিংসা পরায়ন, বাধ্য করতে কূট কৌশলের অন্বেষণ ও বাস্তবায়ন, একের পর এক সওদাগরের স্বর্বস্ব হরণ প্রভৃতি ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতার দাবানলে সব পুড়ে ছাই হওয়াকে ঘৃণা জানিয়ে, ক্ষমতাবানকে আত্মসংশোধনের আহ্বানের মধ্য দিয়ে এবং ধরিত্রীকে মঙ্গলময় আবহে ভরিয়ে তোলার আকুতির মধ্য দিয়ে শেষ হয় নুসরাত শারমিন তানিয়ার নাটক পদ্মাবতীর আখ্যান। মনসামঙ্গলের পদ্মাবতীর আখ্যান থেকে যেহেতু নাটক রচনা তাই নাটকের নাম পদ্মাবতীর আখ্যান হতেই পারে কিন্তু নাট্যকার যেহেতু মহাকালের মাঝ থেকে সমকালের নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন সে কারণে নাটকের নামকরণ নতুনের দিকে গেলেও তা নাট্যকারের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই যেত। হতে পারত সে নামকরণ, চাঁদ সওদাগরের ভাসান কিংবা দৈবের আস্ফালন অথবা নিয়তির প্রহসন। অপরদিকে দলীয় নাট্যচর্চা কিংবা একাডেমিক নাটক চর্চায় দিনকে দিন নাটক রচনার জায়গাটিতে এক অদ্ভুদ আলসেমি, বুদ্ধিদীপ্ত ফাঁকিবাজি, দলপ্রধান ও নির্দেশকদের অহেতুক সংলাপের উপস্থিতি প্রতীয়মান। ফলে নাটকের লাইন আপ হয়, কোরিওগ্রাফি দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ হয়, স্লোগান ধর্মী সংলাপের মধ্যে দিয়ে খানিকটা খোঁচানোও যায় কিন্তু মনে জায়গা পাবার মতো কিছু একটা নিয়ে দর্শকদের বাড়ি ফেরা হয় না। হলে এ নাটকে মৃত সঞ্জীবনীর ব্যাখ্যা থাকত, চাঁদ সওদাগরের অসহায়তা হৃদয়ে ছুঁয়ে যেত কিংবা মনসা নিজে নিজের হিংসার আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হতো। বর্তমান সম্ভাবনাময় নাট্যকারদের মনে রাখতেই হবে নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকেরের উপলব্ধির কথা, যে নাটক পড়তে ভাল সে নাটক দেখতেও ভাল।

ভাল যে নির্দেশক হিসেবে নুসরাত শারমিন তানিয়া তার একটা বড় কারণ দৃশ্যের তীক্ষèতা, যুক্তির পরমপরতা এবং নির্মাণের নিপুণতায়। হলিউড, বলিউড এবং টলিউডকে ছাড়িয়ে তামিল-কেরালার চলচ্চিত্র যে বিশ্ববাসীর নয়ন সম্মুখে পৌঁছে হৃদয় জয় করে তার কারণ দ্রুত বহমান সময়ে জাম্প কাটের ব্যবহার, সাইকোলজিক্যাল জার্নি এবং সূক্ষ্মাতীসূক্ষ্ম ভাবনার নির্মাণের কারণে। ঠিক এই বিষয়টা ধরতে নির্দেশক সফল। বন্ধনগীত, সর্পিলগীত, সন্তান বাৎসল্য, সন্তান হারানো শোক, নৌবহর ভাসান, কূটনৈতিক বৈঠক, প্রণয়ের কৌশল (সওদাগর-মনসা প্রসঙ্গ বিবেচ্য), বাসরে শয়ন, পতিœর বিলাপ, মনসার ঔদ্ধত্য, চাঁদ সওদাগরের অসহায়তা, সূত্রধরের মধ্যে দিয়ে নাট্যকার-নির্দেশকের দর্শন প্রভৃতি নয়নাভিরামও নান্দনিক। তবে সূত্রধরের শেষ সংলাপ, দর্শকদের বোঝানোর চেষ্টা না করে নিজেদের আত্মোপলব্ধিতে এনে ফেললে কি দাঁড়ায় তা নির্দেশক ভেবে দেখতে পারেন। লাঠি দিয়ে পথ হাতড়ানো ব্যক্তিকে দেখলে মানুষ বোঝে তিনি অন্ধ, তার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন সেকারণেই স্বাভাবিক। আমি অন্ধ তাই আমাকে সহানুভূতি দেখান এটা চিৎকার করে বলাটা কোন কাজের কথা না। অভিনয় শিল্পী থেকে কলাকুশলী সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থী তাই পৃথক মূল্যায়ন করা হলো না। তবে সকলের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়। প্রশংসনীয় প্রযোজনা পদ্মাবতীর আখ্যান যা সমকালকে না ছুঁয়েও সমকালের কথা বলে মহাকালের বহমানতায়।

নির্বাচিত সংবাদ