১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কঠোর শাস্তি কাম্য

নারায়ণগঞ্জে এক শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে পালিত হয়েছে নানা ধরনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচী। প্রতিবাদের অভিনব ধরন চোখে পড়েছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ ফেসবুকে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে। সেসব স্থানে শিক্ষার্থীরা ‘সরি স্যার’ লিখে নিজেদের কানে ধরা ছবি পোস্ট করেছেন। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় প্রায় সর্বত্র জাতির মাথা যেখানে হেঁট হয়ে যাওয়ার উপক্রম, সেখানে এই ছবি দেখে আশা জাগে যে, সমাজে এখনও বুঝি মূল্যবোধ একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ৮ মে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে শাসন করার সময় তার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর জের ধরে শুক্রবার বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভা চলার সময় পাশের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে প্রধান শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে লোকজন জড়ো করা হয়। উত্তেজিত লোকজন তাকে নিগৃহীত করেন। পরে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান জেলা শিক্ষা অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রধান শিক্ষককে মারধর ও কান ধরে উঠবস করতে বাধ্য করেন। সর্বশেষ, তাকে বরখাস্ত করা হয়। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য হলো, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দ্বন্দ্বের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে এ ঘটনা সাজানো হয়েছে। বরখাস্তের চিঠি পাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমাকে অপমান-অপদস্থ করা হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’ এ বিষয়ে আরও যা জানা যায় তা হলো, দশম শ্রেণীর যে শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত শিক্ষক শাসন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, সে নিজে গণমাধ্যমে বলেছে, স্যার ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেননি। স্যার তাকে মারধর করায় সে বিচার চাইতে গিয়েছিল কমিটির কাছে। একই কথা বলেছেন শিক্ষার্থীর মাও। আরও একটা কথা, প্রধান শিক্ষককে যদি বরখাস্তই করা হবে, তাহলে তাকে সর্বসমক্ষে অপমান, অপদস্থ, নিপীড়ন, নিগৃহীত সর্বোপরি কান ধরে উঠবস করানো হলো কেন? স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনও বলেছেন, প্রধান শিক্ষক কখনই ধর্ম নিয়ে কোন কথা বলেননি। তাহলে মসজিদের মাইক নিয়ে কে বা কারা উত্তেজিত করল জনতাকে? সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, এলাকাবাসীর রোষ থেকে প্রধান শিক্ষককে বাঁচাতে এর কোন বিকল্প ছিল না। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি নিজেই শিক্ষককে উঠবস করার ঐ শাস্তি দিচ্ছিলেন।

শিক্ষামন্ত্রী ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। অবশ্য গঠিত তদন্ত কমিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইতোমধ্যে। কেননা, অকুস্থলে উপস্থিত জেলা শিক্ষা অফিসারকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী নিন্দা জানিয়ে বলেছেন ‘এটি একটি ফৌজধারী অপরাধ যারা এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের নিশ্চয়ই শাস্তি পেতে হবে। কারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যায় না।’ তাহলে নারায়ণগঞ্জের এসপি কোন্ যুক্তিতে বললেন যে, এই ঘটনায় কোন ফৌজদারি অপরাধ ঘটেনি বলে পুলিশের কিছুই করার নেই। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পুলিশ কি বলবে? একজন সংসদ সদস্যের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য, আইন প্রণয়ন ও রক্ষা করা। কোন অবস্থাতেই আইন হাতে তুলে নেয়া নয়।

নারায়ণগঞ্জে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণার্হ। সমগ্র জাতি এতে ব্যথিত ও মর্মাহত। সর্বস্তরের মানুষ এতে বিক্ষুব্ধ ও বেদনাহত। একবাক্যে সবাই এর সুবিচার চান। কিন্তু এ ঘটনার বিচার চেয়ে মামলা করবে কে? অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের পক্ষে এ ঘটনায় মামলা করা দুরূহ ও ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা বিষয়টি স্পর্শকাতর। সেক্ষেত্রে আইনমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী সরকারের পক্ষে মামলা করার উদ্যোগ নিতে পারেন স্বপ্রণোদিত হয়ে। নারায়ণগঞ্জের সচেতন সুশীল সমাজ এবং শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দও এই উদ্যোগ নিতে পারেন। অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ন্যক্কারজনক এই দুঃসহ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তারা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। এটা সমগ্র দেশ ও জাতির দাবি।