২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খেলাপী ঋণ বাড়ছে, বড় বড় ঋণ বাড়ছে ॥ উপায় কী?

  • ড. আর এম দেবনাথ

আবার খবর খেলাপী ঋণের। গত সপ্তাহের শেষের দিকের সবচেয়ে বড় খবর এটা। এতে বলা হয়েছে গত তিন মাসে খেলাপী ঋণের পরিমাণ বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। খবরটা এমনভাবে বিভিন্ন কাগজে প্রকাশিত হয়েছে যে, মনে হয় দেশের সর্বনাশ হয়ে গেছে। হ্যাঁ, খেলাপী ঋণ ভাল জিনিস নয়। খেলাপী ঋণ মানে গ্রাহকরা শর্ত মোতাবেক, চুক্তি মোতাবেক ঋণের টাকা ব্যাংকে ফেরত দিতে পারছে না। এ খবর কিভাবে ভাল হয়? বস্তুত এটা কোন দেশের জন্যই ভাল নয়। শত হোক ব্যাংকের টাকা সরকারের নয়, এই টাকা আমানতকারীদের। আমানতকারীদের টাকা ঋণগ্রহীতারা মেরে দিলে অথবা ফেরত না দিলে এই খবর কখনও ভাল হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ‘ঋণ খেলাপ’ (লোন ডিফল্ট) একটা ‘নেসেসারি ইভিল’। এর হাত থেকে বাঁচার কোন পথ নেই। বাঙালী ব্যবসায়ীরা এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য বার্ষিক হিসাবের ব্যবস্থা করেছিল। পহেলা বৈশাখে দেনা-পাওনার চূড়ান্ত হিসাব। যত টাকা পাওনা তার চেয়ে কিছু কম দিয়ে গ্রাহকরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে হিসাব চূড়ান্ত করে মিষ্টি খেত। ব্যবসা করলেই ‘ব্যাড ডেট’ বা কুঋণ হয়। কিছু লোক টাকা দেয় না, দিতে পারে না। বুক-কিপিং এবং এ্যাকাউন্টিংয়ে সে জন্য ‘ব্যাড ডেট’ পড়ানো হয়, ব্যাড ডেটের জন্য ‘প্রভিশন’ রাখার রীতি পড়ানো হয়। এই সমস্যা থেকে মুক্তি কোন দেশের নেই। যেমন আমেরিকা। সে দেশে কত নিয়ম-কানুন। কঠোর বিধিমালা। ব্যাংক চালায় অক্সফোর্ড, এমআইটি, হার্ভার্ড ইত্যাদি নামীয় বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্ররা, যারা বাজার অর্থনীতির ধারক-বাহক। তাদের ব্যাংকাররা সঠিকভাবে ঋণ প্রস্তাব প্রসেসিং করে। রাজনৈতিক প্রভাব সেখানে নেই। গ্রাহকদের রেইটিং হয়। নিয়মিত কঠোর ‘অডিট’ হয়। এতদসত্ত্বেও ৫-৭ বছর আগে কী দেখলাম? কোন আমেরিকান ব্যাংক নেই। বিরাট ধস। ব্যাংকের গ্রাহকরা পয়সা ফেরত দিতে পারছে না। ট্রিলিয়ন, ট্রিলিয়ন ডলার ঢেলে মার্কিন সরকার ব্যাংকগুলোকে বাঁচায়। এর থেকে কী শিক্ষা পাওয়া গেল? এই সমস্যা থেকে কী ভারত মুক্ত, এর থেকে কী চীন মুক্ত? না, কেউ মুক্ত নয়। ওরাও এখন ভুগছে এই সমস্যায়। সকল দেশের ব্যাংকিং খাত ভুগছে ঋণ খেলাপের সমস্যায়।

বলেছি ‘ঋণ খেলাপ’ ‘নেসেসারি ইভিল’। কেউ কেউ বলেন, ‘ব্যাংকিং ইজ অর্গানাইজড রোবারি’। এটা শিল্পায়নের ‘কস্ট’। সরকার তা পুষিয়ে দেয়, বিশেষ করে যেসব দেশ ব্যাংকের টাকায় শিল্পায়ন করে। ভারত, চীন, বাংলাদেশে ব্যবসা, বড় ব্যবসা, শিল্প হচ্ছে ব্যাংকের টাকায়। এখানে পুঁজি বাজারের টাকা খুবই কম। অতএব খেলাপী ঋণের কথা থাকবে। দুদিন পর পর তা ছাপা হবে। তবে কথা হচ্ছে খেলাপী ঋণের পরিমাণ কত হওয়া উচিত? মোট প্রদত্ত ঋণের ৫ শতাংশ, ৭ শতাংশ, ১০ শতাংশ? উত্তর, যত কম রাখা যায় ততই ভাল। কিন্তু আমাদেরটা বেশ বেশি। আগের সরকারী ব্যাংকের ছিল বেশি, এখন বেসরকারী ব্যাংকের। ‘খেলাপী ঋণ’ সম্পর্কে অনেকের ধারণা অস্পষ্ট। কেউ কেউ মনে করেন খেলাপী ঋণ মানেই টাকা সব গেছে। না, তা নয়। খেলাপী ঋণের অনেক স্তর আছে। তিন-চারটা স্তর পেরিয়ে তা হয় ‘ব্যাড ডেট’ বা কুঋণ। ‘কুঋণ’ হওয়া মানে প্রথমত এই টাকা হিসাবের খাতা থেকে আলাদা করে অন্য খাতায় নেয়া হয়। তার বিপরীতে মুনাফা থেকে ‘প্রভিশন’ তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ব্যাংকের কোন ক্ষতি না হয়। তারপর চলবে মামলা। মামলা করে টাকা আদায় হবে। প্রত্যেকটি ঋণের বিপরীতে ‘মর্টগেজড প্রপার্টি’ আছে, যা বিক্রি করে ব্যাংক টাকা আদায় করবে। এখানে অবশ্য দুটো সমস্যা হয়। মামলায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। প্রপার্টির দাম অনেক সময় ঋণের টাকার সমান হয় না। এ দুটো সমস্যার সমাধান দরকার।

আরেকটা কথা, খেলাপী ঋণ কী? খেলাপী ঋণকে ব্যাংকাররা শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ বলে (ক্লাসিফাইড লোন)। এটা করার নিয়ম আছে, এটা আন্তর্জাতিক নিয়মে তৈরি কোন ঋণ কখন কী ধরনের শ্রেণীবিন্যাসে পড়বে তা বাংলাদেশ ব্যাংক বলে দেয়। কোন ঋণের বিপরীতে কত ‘প্রভিশন’ রাখতে হবে তাও বলে দেয়। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনেই এসব করে। এখানে নিজের মর্জিমতো কিছু করা চলে না অঙ্কের মতো। শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের কারণ অনেক হতে পারে। কোন কোন ঋণ ব্যবসায়ীর ইচ্ছাকৃত কা-ের জন্য শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ হতে পারে। ব্যবসায়ীর টাকা আছে, ব্যবসাও ভাল, কিন্তু ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয় না। এ ধরনের ব্যবসায়ী বাংলাদেশে অনেক। তবে বহু ঋণ শ্রেণীবিন্যাসিত হয় ব্যবসায় মন্দার কারণে। এসব ব্যবসাকে ব্যাংকাররা বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে। তাও আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মের অধীনেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ‘রিসিডিউলিং’ বলে একটা পদ্ধতি তৈরি করেছে। পাঁচ বছরে একটা ঋণ পরিশোধ করার কথা। ব্যবসায়ী একটা ব্যবসায়িক কারণেই সেই টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। তখন ব্যাংকাররা নিয়মের অধীনে ৫ বছরের জায়গায় ৭ বছর সময় দেয়। এতে ব্যবসায়ীর কিস্তি কম পড়ে। তার টাকা পরিশোধে সুবিধা হয়। যখন দেখা যায় রিসিডিউলিং বা পুনঃতফসিলে হচ্ছে না তখন ঋণকে পুনর্গঠন করা হয়। যত সমালোচনাই করা হোক না কেন, এসব পদ্ধতিই বাজার অর্থনীতির। পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্যই এসব ব্যবস্থা। সব দেশেই তাই। প্রতিবেশী ভারতেও তাই। পুনর্গঠিত ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীকে বেশি সময় দেয়া হয় ঋণ পরিশোধের জন্য। সুদের হার কমানো হয়। ‘গ্রেইচ পিরিয়ড’ দেয়া হয় যাতে ব্যবসায়ী ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে পারে।

আমাদের দেশের সমস্যা হচ্ছে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের’ নিয়ে। তাদের জন্য কঠোর ব্যবস্থা হওয়া দরকার। আর ব্যবসায়িক কারণে যারা খেলাপী হয় তাদের জন্য আলাদা ট্রিটমেন্ট হওয়া উচিত। যেমন ‘শিল্প বিল্ডিং’ ঋণ। এক সময় বলা হলো গার্মেন্টসের পরই জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনা। অতএব ব্যাংকাররা সেখানে ঋণ দিল। গত মন্দায় ইউরোপ থেকে জাহাজের অর্ডার হ্রাস পেল, অর্ডার বাতিল হলো। এখন করা কী? এর জন্য কে দায়ী? ব্যবসায়ী দায়ী, ব্যাংকাররা দায়ী? না মিডিয়া দায়ীÑ যারা বলল জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনা আকাশচুম্বী। প্রকৃতপক্ষে খেলাপী ঋণের সঙ্গে বড় সম্পর্ক ব্যবসার। ব্যবসা ভাল না চললে কেউ ব্যাংকের টাকা ফেরত দেবে না এ কথা বাস্তব সত্য।

ব্যবসায় মন্দা চললে ব্যবসায়ীর ক্যাশ জেনারেট হয় না। তাই সে টাকা দিতে গড়িমসি করে এবং তা তারা করবেই। মিডিয়া তো বর্তমানে প্রতিনিয়ত বলছে ব্যবসায় মন্দা চলছে। বিনিয়োগ কম। গ্যাস নেই। বিদ্যুত নেই। আমদানি কম। রেমিট্যান্স কম। সরকারের রাজস্ব আদায় কম। ভ্যাট আদায় কম, কাস্টমসের টাকা আদায় কম। এটাই যদি সত্য হয় তাহলে খেলাপী ঋণ বাড়বে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? এ কথা সবার বোঝা উচিত। তবে সব ব্যবসা এর মধ্যে পড়বে না। যাদের ব্যবসা ভাল তারা নিয়মিত টাকা ফেরত দেবে এটাই কাম্য। সুযোগ সন্ধানী কেউ হবে না। কিন্তু এই দেশে ব্যবসায়ীরা তাই হয়। রোজার আগেই পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি আর কী?

আরেকটা কথা। বড় বড় ঋণ বাড়ছে বলে অভিযোগ। এটা সত্যি কথা যে, বড় বড় ঋণ বাড়ছে। এখন বলুন বাজার অর্থনীতি কী বলে? এই অর্থনীতিতে বড়রা বড় হবে। ইস্পাত কারখানার মালিকরা, রি-রোলিং মিল খেয়ে ফেলবে, বড় বড় কোম্পানি লবণ উৎপাদকদের শেষ করে। হলুদ, মরিচ যারা গুঁড়া করে বিক্রি করে তাদের শেষ করবে বড় বড় কোম্পানি। কোম্পানিগুলোর নাম বলার দরকার আছে? ছোটদের জায়গা বাজার অর্থনীতি রাখে না। বড়রা বড় হলে তাদের ঋণের চাহিদাও বেশি হবে। অতএব বড় বড় ঋণ হবে। অবকাঠামো যথা বিদ্যুত, ওভার পাস ইত্যাদিতে ঋণ দিলে বড় বড় ঋণ বাড়বেই। এর থেকে বাঁচার পথ কী? কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলতে পারে মোট ঋণের ২০ ভাগ হবে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ। এছাড়া উপায় কী?

লেখক : সাবেক শিক্ষক, ঢাবি

নির্বাচিত সংবাদ