২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ তুরস্কের উসমানী খিলাফতের জানিসারী বাহিনী

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

তুরস্কের উসমানী (ঙঃঃড়সধহ) খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গাজী উসমান। এই উসমানের নামেই রাজত্বের নাম হয় উসমানী সালতানাত। জানিসারী বাহিনী ছিল এই সালতানাত বা খিলাফতের অত্যন্ত শক্তিধর সেনাবাহিনী। এই বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য সংগ্রহ করা হতো বসনিয়া, হারজেগোভিনাসহ তদানীন্তন বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে। জানিসারী বাহিনীর প্রবল প্রতাপে ইউরোপের সব খ্রীস্টান রাজা প্রতিক্ষণ সন্ত্রস্ত থাকত।

ইসলামের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল দীর্ঘ অধ্যায় সংযোজিত হয়েছিল উসমানী আমলে। পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল, সমগ্র মিসর ইউরোপের কৃষ্ণসাগরের পশ্চিম তীর থেকে শুরু করে আদ্রিয়াতিক সাগরের পূর্ব তীর পর্যন্ত সমগ্র ভূখ-, এশিয়া মাইনর, আনতোলিয়া এবং ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ, সমগ্র বলকান উপদ্বীপ বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়াসহ বিশাল অঞ্চল ছিল উসমানী খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব খিলাফতের নিশানবাহী হিসেবে উসমানী খিলাফতকে খুবই সম্মান করত। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর রফিকুল আলা আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর কাছে চলে যাওয়ার পরে তাঁর খলীফা হিসেবে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু সর্বসস্মতিক্রমে প্রথম খলীফা নির্বাচিত হন।

৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করলে খলীফা হন হযরত উমর ফারুক রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু। তাঁর দশ বছরের খিলাফত আমলে তদানীন্তন জানা পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল খিলাফতের অধীন এসে যায়। ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে আততায়ীর ছুরিকাঘাতে তিনি শহীদ হলে খলীফা নির্বাচিত হন হযরত উসমান রাদিআল্লাহ্ ুতা’আলা আন্হু। ১২ বছরকাল তিনি খলীফা ছিলেন। তিনি শহীদ হলে খলীফা হন হযরত আলী করমুল্লাহ ওয়াজহাহু। হযরত আলী কারমুল্লাহু ওয়াজহাহু মদীনা মনওয়ারা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন কুফায়। তিনিও খারেজী নামে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক নিযুক্ত আবদুর রহমান ইবনে মলজুন নামের আততায়ীর তলোয়ারের আঘাতে কুফা মসজিদে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে তিনদিন পর শহীদ হন।

কিছুদিন খিলাফত নিয়ে টানাপড়েনের উদ্ভব ঘটে। অতঃপর সিনিয়র গবর্নর আমীর মুআবিয়া রাদিআল্লাহ্ তা’আলা আন্হু খলীফার দায়িত্বভার গ্রহণ করে প্রাদেশিক রাজধানী দামেস্কে খিলাফতের রাজধানী স্থাপন করেন এবং উমাইয়া খিলাফতের পত্তন করেন। প্রায় ৯০ বছর উমাইয়া খিলাফত টিকে ছিল। তারপর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত আব্বাস রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হুর এক উত্তর পুরুষ আবুল আব্বাস আসসাফফার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি, রোববার জাব নদীর তীরে সংঘটিত এক যুদ্ধে উমাইয়াদের পতন ঘটে এবং আব্বাসীয় খিলাফতের সূচনা হয়। আবুল আব্বাস সাময়িকভাবে রাজধানী স্থাপন করেন আনবাঁরায়।

৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে আবুল আব্বাস ইন্তিকাল করলে তাঁর ভাই আবু জাফর আল মনসুর খলীফা হন। আল মনসুর দজলা নদীর তীরে বাগদাদ নগরীর পত্তন ঘটিয়ে এখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। বাগদাদ হয়ে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সভ্যতা এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্রস্থল। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল নেতা হালাকু খাঁ কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংস হয়ে গেলে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব খলীফাশূন্য হয়ে পড়ে। অবশ্য পরে সদলবলে হালাকু খাঁ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

১২৬১ খ্রিস্টাব্দে মিসরের কায়রোতে আব্বাসীয় খলীফাদের রূহানী বা আধ্যাত্মিক প্রাধান্য নামেমাত্র পুনরুজ্জীবিত হলেও সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ খিলাফতী শাসন প্রতিষ্ঠার জোরদার কোনো উদ্যোগ কিংবা প্রচেষ্টা বহুদিন অনুপস্থিত থেকেই যায়। বিক্ষিপ্তভাবে মুসলিম শাসনের বাতি প্রজ্বলিত থাকলেও খিলাফতের সেই শৌর্ষ-বীর্য, সমৃদ্ধি, ঐতিহ্য, সেই মহাঐক্য, সংহতি, সমতা, সুশাসন ও সম্প্রীতির যে বাঁধভাঙ্গা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে চর পড়ে যায়। রাজ্যে রাজ্যে দিনকে দিন বিদ্রোহ ও অরাজকতা বাড়তেই থাকে। এই নৈরাস্য ও নৈরাজ্যকর পটভূমিতে গাজী উসমান নামক এক মহাবীরপুরুষ এবং মর্দে মুজাহিদ মুসলিম শক্তিকে নবউদ্দীপনায় ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আবির্ভূত হন। তিনি ইকনিয়ামের সেলজুক শেষ সুলতান দ্বিতীয় আলাউদ্দীন কায়কোবাদের সেনাপতি ছিলেন।

জানা যায়, এই সুলতান দ্বিতীয় আলাউদ্দীন কায়কোবাদ চাঁদ-তারা খচিত পতাকা প্রবর্তন করেন। আজও তুরস্কের পতাকায় তা রয়েছে। সুলতান দ্বিতীয় আলাউদ্দীন কায়কোবাদের ইন্তিকালের পর সেনাপতি গাজী উসমান ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে সালতানাতের মসনদে অধিষ্ঠিত হন।

তিনি এক নতুন সালতানাতের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন, যা উসমানী সালতানাত নামে পরিচিত হলেও পরে উসমানী খিলাফত (ঙঃঃড়সধস ঈধষরঢ়যধঃব) নামে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ইংরেজীতে একে অটোমান এম্পায়ারও বলা হয়। খিলাফতের পরম্পরাগত ধারায় উসমানী খিলাফত মুসলিম জাহানের একতা, সংহতি ও শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে সবার কাছ থেকে সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করে। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে গাজী সুলতানের উত্তরপুরুষ তুর্কী সুলতান প্রথম সেলিম মিসর জয় করেন। সমগ্র মিসর তুর্কিজ সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই সময়ে মিসরে আব্বাসীয় খলীফা মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ তুর্কী সুলতান সেলিমকে মুবারকবাদ জানান। এবং মুসলিম দুনিয়ার খিলাফত প্রদান করেন। সুলতান সেলিম খিলাফতের খিলাত ও খাস নিদর্শনস্বরূপ প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পিরহান মুবারক, ঝান্ডা, লাঠি, দান্দান মুবারক, পবিত্র কেশ এবং সীলমোহর খলীফা মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়ে রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে নিয়ে আসেন এবং তা মর্যাদা ও যতেœর সঙ্গে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এসব পবিত্র নিদর্শন আজও তুরস্কের তোপকাপী জাদুঘরে অতি যতেœর সঙ্গে সংরক্ষিত রয়েছে।

সুলতান সেলিম (১৫১২-১৫২০) খিলাফতের খিলাত ও সনদ পেয়ে মক্কা মুকাররামার হেরেম শরীফ এবং মদীনা মনওয়ারার মসজিদুন নববীর হেরেম শরীফের খাদিম বা সেবক হিসেবে খাদিমুল হারামায়নিশ্ শরীফাইন লকব ধারণ করেন। ইতোমধ্যে উসমানী সালতানাত উসমানী খিলাফত হিসেবে পরিচিত হয়। ইসলামের ইতিহাসের খিলাফতের শেষ নিশান সমুন্নত রেখেছেন তুরস্কে স্থাপিত সালতানাত বা খিলাফতের মহান শাসকগণ; যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন: গাজী উসমান, ওরহান পঞ্চম মুরাদ, প্রথম বায়যীদ, প্রথম মাহ্মুদ, সুলায়মান, দ্বিতীয় মাহ্মুদ, দ্বিতীয় বায়যীদ এবং প্রথম সেলিম। উসমানী আমলে একটি সুঃসাহসী, শক্তিশালী এবং ব্যতিক্রমী সৈন্যবাহিনী গঠিত হয় যা বিশ্বকে চমক লাগাতে সমর্থ হয়। এই বাহিনীর নাম জানিসারী। তুর্কী ভাষায় একে বলা হয় ইয়াকীচেরী বা ইয়ানীচেরী- যার অর্থ নবীন বাহিনী, আবার আরবী-ফারসী মিশ্রিত জানিসারী শব্দের অর্থ প্রাণ উৎসর্গকারী।

জানিসারী বাহিনী বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে দুর্জয় ও চৌকস বাহিনী হিসেবে বিশ্বের সর্বত্র পরিচিত ছিল। এই বাহিনীর দুর্বার গতিরোধ করার মতো সাহস ও শক্তি কারোই ছিল না। ইসমানী সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ রমাদন ইন্তেকাল করলে তাঁর পুত্র ওরহান (১৩২৪-১৩৬২) খ্রি.) স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি পিতার মতোই যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। অতিশয় দূরদর্শী ও বিচক্ষণ এই মহান সুলতান ব্যক্তিজীবনে সূফী ছিলেন। ইসলামের বিজয় পতাকা সবখানে স্থাপন করার লক্ষ্যে, খিলাফতের সমৃদ্ধি, মান-মর্যাদা এবং ঐতিহ্য সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে তিনি একটি সুশৃঙ্খল, সুবিন্যস্ত শক্তিশালী সেনাদল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এই লক্ষ্যে তিনি যে সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেন সেই বাহিনীই জানিসারী বাহিনী। জানা যায়, এই বাহিনী গড়ার ব্যাপারে তিনি তাঁর ভাই আলাউদ্দীন ও উজির সুলায়মানের পরামর্শ গ্রহণ করেন।

জানিসারী বাহিনীর অভিনব যুদ্ধকৌশল শক্তিমত্তা, বীরত্ব, শৃঙ্খলা, সাহসী পদক্ষেপ, দুর্বারগতি ও শৌর্য-বীর্য সারাবিশ্ব কয়েক শতাব্দী ধরে বিস্ময়ের সঙ্গে অবলোকন করে। এই বাহিনীর দুর্বার ও সুদৃঢ় পদচারণায় অতিদ্রুত অঞ্চলের পর অঞ্চল উসমানী সালতানাতভুক্ত হয়ে যায়। মুসলিমগণের বিজয় গৌরবের নিদর্শন এই নবীন বাহিনী সুলতানের পীর তৎকালীন বিখ্যাত সুফী ওলীয়ে কামিল হাজী বেকতাশের (রহ.) দু‘আ লাভ করেছিল। তিনি এই নবীন বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে আল্লাহ্ জাল্লা শানহুর মহান দরবারে হাত তুলে দু’আ করেন: হে আল্লাহ্! আপনি এদের চেহারা উজ্জ্বল করে দিন, এদের তীরকে প্রাণনাশক করে দিন এবং প্রতিটি অভিযানে এদেরকে বিজয় দান করুন। মুনাজাত শেষে পীর হাজী বেক্তাশ নবীন সেনাদলের বিভিন্ন অংশের নেতাদের তাঁর সামনে এনে দাঁড়াতে নির্দেশ দেন। তারা একে একে পীর সাহেবের সম্মুখে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। পীর বেক্তাশ তাঁর আলখেল্লার আস্তিনকে প্রসারিত করে একে একে তাদের মাথায় স্পর্শ করান। এই আস্তিনের পরশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবীন বাহিনীর প্রত্যেকে এক অভূতপূর্ব ফয়েযে আপ্লুত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে কুওয়তের প্রাচুর্য প্রবাহ এমনভাবে প্রবাহিত হয় যে, তারা এক অনন্য শক্তি দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। তারা রূহানী প্রেরণায় অভিষিক্ত হয়।

পীর বেক্্তাশ ছিলেন ইল্মে তাসাওউফের বেকতাশীয়া তরীকার ইমাম। এই তরীকার প্রভাব উসমানী সুলতানদের ওপর প্রবলভাবে ছিল। সব সুলতানই এই তরীকায় মুরীদ ছিলেন। জানিসারী বাহিনী গঠনের ইতিহাসও অভিনব। এই বাহিনী গঠনে দীর্ঘমিয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। যুগোসøাভিয়া, বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া, গ্রীসসহ বলকান উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অল্পবয়স্ক, সুন্দর সুন্দর চেহারার স্বাস্থ্যবান বালকদের এই বাহিনী গঠনের জন্য সংগ্রহ করা হতো।

এসব বালককে অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে আদব-কায়দা, দীনি ইল্ম, যুদ্ধবিদ্যা প্রশিক্ষণ দেয়া হতো এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে রেখে তাদের মানসিক, আত্মিক ও চারিত্রিক উন্নতি সাধন করা হতো। বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে তারা কয়েক বছরের মধ্যেই ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে পা-িত্য অর্জন করত, তরীকতের জ্ঞানে উদ্ভাসিত হতো এবং যুদ্ধের নানামাত্রিক কৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠত। আর এমন করেই তারা সকল বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে এক দুর্জেয় বাহিনীতে পরিণত হতো। উসমানী দ্বিতীয় সুলতান ওরখান সর্বপ্রথম এক হাজার বালককে সংগ্রহ করে তাঁর পীর সাহেব কেবলা হাজী বেক্তাশ ওলীর খানকা শরীফে নিয়ে যান এবং এই বাহিনীর একটা সুন্দর নাম দেবার জন্য অনুরোধ করেন। পীর বেক্তাশ এই বাহিনীর নাম দেন ইয়াকীচেরী বা ইয়ানীচেরী অর্থাৎ নবীন সেনাদল। এই জানিসারী বা ইয়াকীচেরী বা ইয়ানীচেরী বাহিনীর প্রধান রেজিমেন্ট পীর সাহেব বাহিনী নামে পরিচিত ছিল। এই পীর সাহেব বাহিনী দারুণ প্রভাবশালী ছিল। জানিসারী বাহিনীর প্রধানকে বলা হতো আগা এবং তার পরের জনকে বলা হতো বুলকেতখুদাসি। অন্যদিকে পীর বেক্তাশের ইন্তিকালের পর তাঁর খলীফাকে চেরেবী বলা হতো। এখনও তুরস্ক বিশেষ করে আলবেনিয়াতে বেক্তাশীয়া তরীকার ব্যাপক চর্চা রয়েছে এবং বহু মুরীদ রয়েছে। আরও জানা যায়, পীর বেক্তাশ তাঁর যে আলখেল্লার আস্তিন দ্বারা যেসব বালকের মাথায় পরশ বুলিয়ে দিয়েছিলেন সেই আস্তিনের ঝুলানো অংশের অনুকরণে প্রতিটি সৈনিকের টুপির সঙ্গে আস্তিনের ঝুলানো অংশ যুক্ত করে দেয়া হয়। টুপিটাও ছিল পীর বেক্তাশের পশমী টুপির আকৃতিতে বানানো।

জানিসারী বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে বলা হতো পীর হাজী বেক্তাশ (রহ)-এর মানসপুত্র এবং সুলতানের পোষ্যপুত্র। এই বাহিনীর মধ্যে এমন এত জিহাদী প্রেরণা ও প্রাচুর্যপ্রবাহ সঞ্চারিত করা হতো যে, তাদের মধ্যে বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ- এই চেতনা ভীষণভাবে গ্রন্থিত হয়ে যেত। সুলতানের প্রতি এই বাহিনীর অপরিসীম আনুগত্য ছিল, সুলতানকে তারা অতিশয় শ্রদ্ধা ও ভক্তি করত। সালতানাতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সালতানাতের গ-ির সম্প্রসারণ করে সুলতানের রাজত্বকে সর্ববৃহৎ অঞ্চলে পরিণত করার দৃঢ় প্রত্যয়ে তারা বলীয়ান ছিল।

সুলতান জানিসারী বাহিনীর সকল প্রকারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম-আয়েশের যাবতীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন। জানিসারী বাহিনীর সাহস, বলিষ্ঠতা, কর্মনিপুণতা ও যুদ্ধকৌশল সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত। এই বাহিনীর সার্বিক উন্নতির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হতো। রাজস্বের প্রায় অর্ধেক অর্থ ব্যয় করা হতো জানিসারী ও খিলাফতের প্রতিরক্ষা খাতে। জানিসারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হতো। জানিসারী বাহিনীর সংগঠক সুলতান ওরহান ১৩৬২ খ্রিস্টাব্দে সালতানাতকে দক্ষ হাতে বিন্যস্ত করে ইন্তিকাল করলে তাঁর পুত্র প্রথম মুরাদ (১৩৬২-১৩৮৯ খ্রি.) পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। এই সুলতান মুরাদ জানিসারী বাহিনীকে আরও সম্প্রসারিত ও সুবিন্যস্ত করেন। উসমানী খিলাফত প্রায় ৬২৩ বছরকাল স্থায়ী হয়েছিল। দীর্ঘকাল এই খিলাফতকে সুসংহত করায় এবং এর অখ-তা রক্ষায় জানিসারী বাহিনী বিশেষ অবদান রাখে। এই বাহিনী উসমানী খিলাফতের শৌর্ষ-বীর্য ও শক্তি প্রতিপত্তির ইতিহাসে প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করে। ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে এই বাহিনী অনন্য সাহস, শৌর্য ও বীরত্বের ৫০২ বছর স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (স.)

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ