১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লে. জেনারেল জিয়ার হত্যাকাণ্ড প্রশাসকের বয়ান

  • মুনতাসীর মামুন

(গতকালের সম্পাদকীয় পাতার পর)

কয়েক মিনিট পর কমিশনার সাইফুউদ্দিন ফোন করে ডিসিকে জানালেন, রাষ্ট্রপতি নিহত। এ সংবাদ পেয়েছেন লে. কর্নেল মাহফুজ থেকে। এর আগে অলি আহমদ এ দায়িত্বে ছিলেন। অলি বিএনপিতে যোগ দিলে মাহফুজ সে পদে যোগ দেন মাস ছয়েক আগে। রাষ্ট্রপতির রুম থেকে দুই রুম পরে ছিলেন মাহফুজ। এর পর পর প্রটোকল অফিসারও একই খবর পেলেন। ড্রাইভারের অপেক্ষা না করে জিয়াউদ্দিন নিজেই গাড়ি চালিয়ে সার্কিট হাউসের দিকে রওনা দিলেন। পথ থেকে তুলে নিলেন বিভাগীয় কমিশনারকে। তখন ভোরের আলো ফুটছে।

সার্কিট হাউসে যখন পৌঁছলেন তখন তা পরিত্যক্ত মনে হলো। জবুথবু হয়ে কয়েক পুলিশ গার্ড গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এসপি, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার ইতোমধ্যে পৌঁছেছেন। দেয়ালে গুলির দাগ। ছাদের একটা অংশ গোলার আঘাতে উড়ে গেছে। কাঠের টুকরোটাকরা পড়েছে গাড়ি বারান্দায়। সেখানে প্রচুর রক্ত। যে পুলিশ অফিসার ডিউটিতে ছিলেন, এবার তিনি তার কাহিনী শোনালেন।

প্রাথমিকভাবে বাইরে থেকে সশস্ত্র সৈন্যদের একটি কনভয় এবং পরে ভেতর থেকে সৈন্যের দল সার্কিট হাউস আক্রমণ করে। যারা এসেছিল প্রথমে তারা রকেট আক্রমণ করে। তারপর চালায় মেশিনগান। রাষ্ট্রপতির রুম লক্ষ্য করে রকেট শেল ছোড়া হয় কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছাদে আঘাত হানে। ফলে ছাদের এক অংশ ভেঙ্গে পড়ে। পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়েছিল। কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারেনি। আক্রমণকারীরা ঢুকে যায়। ভেতরে তারা রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনীর গার্ড ও পুলিশের সম্মুখীন হয়। গাড়ি বারান্দায় রাষ্ট্রপতির একজন গার্ড ও পুলিশের কনস্টেবল নিহত হন। গাড়ি বারান্দার রক্ত তাদেরই।

আক্রমণকারীরা রাষ্ট্রপতির দুয়ারে পদাঘাত শুরু করলে জিয়া দরজা খোলেন এবং মুহূর্তে গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যান। অন্যদিক থেকে আরেকটি দল জিয়ার নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল আহসানের রুম খুঁজে তাকে হত্যা করে। তিনি জিয়ার রুম থেকে কয়েকটি রুম পরে ছিলেন। এখানেও একজন গার্ড ও একজন কনস্টেবল মারা পড়েন।

জিয়াউদ্দিন দোতলায় উঠলেন, সঙ্গে এসপি ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন অফিসার। রাষ্ট্রপতির রুমের সামনে আরেকটি মৃতদেহ পড়ে আছে রক্তের মাঝে। শরীরটি সাদা চাদরে ঢাকা। মৃতদেহ পাহারা দিচ্ছে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনীর একজন গার্ড। অফিসারটি মৃতদেহ দেখিয়ে জিয়াউদ্দিনকে বললেন, ‘স্যার, ইনি রাষ্ট্রপতি জিয়া।’ তার পুরো শরীর গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গেছে। তাকে চেনার একটি উপায় ছিল, মুখের একাংশ গোঁফসহ ঝুলে থাকা। সামনে যা পড়ে আছে তা দেখে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। ঠাণ্ডা মেঝেতে পড়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির রক্তাক্ত দেহ। তার ভাষায়, ‘ওৎড়হরপধষষু, ংঃধহফরহম মঁধৎফ হবীঃ ঃড় ঃযব পড়ষফ ফবধফ নড়ফু ধিং ধ সবসনবৎ ড়ভ ঃযব াবৎু ভড়ৎপব ঃযধঃ ধিং সবধহঃ ঃড় ঢ়ৎড়ঃবপঃ যরস যিবহ যব ধিং ধষরাব. ডযধঃ বিহঃ ৎিড়হম?’

জিয়াউদ্দিন এরপর ১৯৭২ সাল থেকে জিয়ার উত্থান নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ আছে আমার ও জয়ন্ত কুমার রায়ের লেখা বাংলাদেশের সিভিল সমাজ গ্রন্থে। তাই এখানে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় গেলাম না। জিয়াউদ্দিন বর্ণিত দু’একটি ঘটনা উল্লেখ করব জিয়ার চরিত্র বোঝার জন্য।

১৯৭২ সালে জিয়াউদ্দিন ছিলেন ত্রাণমন্ত্রী কামরুজ্জামানের একান্ত সচিব। তখন মন্ত্রীরা প্রটোকলের ধার ধারতেন না। এন্তার লোকজন যখন খুশি তখন এসে কথা বলতে পারতেন মন্ত্রীদের সঙ্গে। জিয়া সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন কামরুজ্জামানের। তিনি প্রায়ই আসতেন সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্য। এমনিও আসতেন। কামরুজ্জামান যখন বাকশাল পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের জুন মাস থেকে কামরুজ্জামানের কাছে আসা বন্ধ করে দেন। ১৯৭৫ সালে বাকশালকে সকল সর্বনাশের মূল বলে আখ্যায়িত করেন।

নিজেকে জনপ্রিয় করার জন্য জিয়া ঘুরে বেড়াতেন তা আজ ‘মিথে’ পরিণত। এসব ‘ঘুরে বেড়ানো’ ডেপুটি কমিশনার হিসেবে কীভাবে ব্যবস্থা করতে হতো তা জিয়াউদ্দিন ১৯৭৬ সালে ইউপি নির্বাচনের প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তিনি তখন নোয়াখালীর ডিসি। নির্বাচনের আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তাকে ফোন করে জানালেন, তার কাছে একটি খাম পাঠানো হচ্ছে বিশেষ ব্যক্তির মারফত। তিনি নিজে যেন তা গ্রহণ করেন এবং কুরিয়ার চলে যাওয়ার পর খোলেন। জিয়াউদ্দিন তো উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছেন। কী বার্তা আছে খামে কে জানে। কুরিয়ার ব্যক্তিটি এলেন। খাম হস্তান্তর করে জানালেন, তাকে এখন কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের ডিসির কাছেও খাম পৌঁছাতে হবে।

খাম খুলে দেখেন কড়কড়ে নোটে পঁচিশ হাজার টাকা। আর কিছু নেই। তিনি ভাবলেন তাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে না তো। যুগ্ম সচিবকে ফোন করলেন। মনে হলো তিনি ফোনেরই অপেক্ষা করছিলেন। টাকা কীসের জন্য জিজ্ঞেস করতেই যুগ্ম সচিব জানালেন, ইউপি নির্বাচনে খরচের জন্য। কী খরচ? এই আর কি, অনেক কিছুর জন্য তো খরচ হতে পারে। আসলে সেটি ছিল ভোট কেনার জন্য সরকারী টাকা। তিনি সে টাকা এসডিও এবং সার্কেল অফিসারের মাঝে বিতরণ করেন খরচের জন্য।

জিয়াউর রহমান ইসলামের কথা বেশ বলতেন। হয়ত অনিয়মিত নামাজ পড়তেন। কিন্তু জুমা পড়ার জন্য যেতেন যাতে সবাই দেখে। নির্বাচনের আগে তিনি চাটগাঁর শাহ আমানত ও বায়েজিদ বোস্তামীতে যান জিয়ারত করতে। তখন তাকে জানানো হলো, কুতুবদিয়া ও চুনাতির পীরও বিখ্যাত। তাদের সেখানে গেলেও ভাল।

জিয়াউদ্দিন চট্টগ্রামের ডিসি। কুতুবদিয়ার পীরের তালাশ লাগালেন। কক্সবাজারের এসডিও জানালেন কুতুবদিয়ায় এ রকম একজন আছেন বটে তবে তার খোঁজখবর কেউ রাখে না। ডিসি ভেবে অবাক হলেন যে, জিয়া কেন সেখানে যাবেন।

যা হোক জিয়ার সফরের আগে ডিসি পৌঁছলেন কুতুবদিয়ায়। শুনলেন, পীর বলেছেন, জনসভাস্থলে তিনি যাবেন না। ডিসি ছুটলেন তার আস্তানায়, দেখেন এক বড় বিছানায় তিনি আধশোয়া, তার পাশে মুরিদরা। ডিসি বিনীতভাবে জানালেন, রাষ্ট্রপতির সময় কম, তার পক্ষে এখানে আসা ঝামেলার। পীর খানিকটা এগোলেই হবে।

পীর রাজি নয়। রাষ্ট্রপতির যদি দেখা করতে হয় তাহলে তার বাসায়ই হবে। ডিসি আর কী করেন। ফিরে চললেন, তার মনে হলো রাষ্ট্রপতি এতে রাজি হবেন না।

ডিসি ফিরে গিয়ে রাষ্ট্রপতির পিএসকে বললেন। পিএস রাষ্ট্রপতিকে জানালেন। বিস্ময়ের পর বিস্ময়। রাষ্ট্রপতি বললেন, তিনি যাবেন। জনসভা শেষে তিনি পীরের আস্তানায় গেলেন। কয়েক মিনিট থাকলেন। তারপর পীরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফিরলেন। বাইরে অপেক্ষমাণ জনতা রাষ্ট্রপতির পীর অর্থাৎ ধর্মভক্তি দেখে মুগ্ধ।

পরে আমরা দেখি এরশাদও ধর্মের নামে এ ধরনের ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে, আমার মনে হয় পাকিস্তানীদের থেকেও এরশাদ ধর্মের নামে বাঙালীদের বোকা বানিয়েছেন বেশি।

চুনাতির পীর অর্থশালী। ডিসি রাষ্ট্রপতির সফরের আগেই গেলেন সেখানে যাতে কুতুবদিয়ার মতো ঘটনা না ঘটে। তিনি একই অনুরোধ জানালেন। পীর বললেন, ইতোমধ্যে তিনি রাষ্ট্রপতিকে তার বাসায় মধ্যাহ্নভোজের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং রাষ্ট্রপতি রাজিও হয়েছেন। তিনি জানালেন, তিনি খবরটি নিশ্চিত হয়ে পীরকে জানাবেন। আল্লাহ ইতোমধ্যে সব ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। ডিসি যেন আল্লাহর ব্যবস্থায় হাত না দেন। জানালেন পীর।

পরের দিন দেখা গেল পীরের কথাই ঠিক। রাষ্ট্রপতিকে পীরের কথা জানাতেই রাজি হয়ে গেলেন। চলবে