২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা ধর্মে ও কর্মে

  • গওহর গালিব

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অভিভাষণে বলেছিলেন- ‘আমি আমার জন্মক্ষণ থেকে আমার অস্তিত্বকে, ঊীরংঃবহপবকে খুঁজে ফিরছি। যখন আমি বালক, তখন ওই আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার কান্না আসত- বুকের মধ্যে বায়ু যেন রুদ্ধ হয়ে আসত।... ওই আকাশটা যেন ঝুড়ি, আমি যেন পাখির বাচ্চা, আমি অই ঝুড়ি চাপা থাকব না- আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।’ সেদিন বড় অসহায় পরিস্থিতিতে নজরুল ইসলাম খোলা আকাশকে একটি খাঁচার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং নিজেকে ওই খাঁচার একটি বন্দী পাখি হিসেবে কল্পনা করেছেন। নজরুলের যে সময়ে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সে সময়ে তাঁর ব্যক্তি মানসে এরকম রুদ্ধশ্বাস তৈরি হওয়া অপ্রাসঙ্গিক ছিল না। কিন্তু আমরা আজ- ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ পেরিয়েও যে সময়ের রূপ পরিগ্রহ করছি- সেখানে কি আমরা সত্যি কোন মুক্ত আকাশ দেখতে পাই?

আজ আমাদের মুক্ত বাক্, মুক্ত স্বর, মূক হয়ে বিমুখ প্রান্তরে বন্দী। আমাদের মন-মনন, বোধ ও বোধি আজ যেন এক জীর্ণ দেয়ালের জলছবি হয়ে ঝুলছে । এই দেয়াল ভাঙ্গার প্রয়োজন আজ জরুরী হয়ে পড়েছে।

সে কারণে এই বন্দী দেয়াল ভাঙ্গার চেতনায় আজ নজরুল সন্দেহাতীতভাবে প্রাসঙ্গিক। ব্রিটিশ উপনিবেশে পরাধীন জাতির সন্তান হিসেবে নজরুলের সে সময়ের দ্রোহে ছিল মুক্তির অন্বেষা। কিন্তু আজ আমাদের দ্রোহ কার ও কিসের বিরুদ্ধে? বলতে দ্বিধা নেইÑ আজ আমাদের দ্রোহ নিজের সঙ্গে নিজেদের। আমাদের অন্তর্জাত ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আজ আমাদের সংগ্রাম মুক্তবুদ্ধির ও শুভচিন্তার।

নজরুল কি এমন রেখে গেছেন যা আজ আমাদের জন্য এই দুর্দিনে আবশ্যক ও অনুসরণীয়। নজরুল যা যা রেখে গেছেন তার কোন কিছুই আজ অবহেলার নয়। তাঁর অতুলনীয় দেশপ্রেম, অসম্প্রদায়িক চেতনা, হিন্দু-মুসলিম ধর্মের প্রতি পরম শ্রদ্ধা, সর্বর্োপরি অকৃত্রিম সাম্যের আদর্শ আজ আমাদের একান্ত কাম্য। একটি সত্যিকার আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক, উদার ও শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নজরুলের আদর্শিক প্রাসঙ্গিকতার আজ আর কোন বিকল্প নেই।

নজরুল তাঁর সমগ্র আদর্শিক ভাবনায় শুধু চিন্তায় ও সৃজনে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং সমভাবে তৎপর ছিলেন কর্মে ও বিশ্বাসে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাংলা সাহিত্যের এক বাঁক বাদলের ক্ষণে নজরুল ইসলামের আবির্ভাব। সূচনালগ্ন থেকে নজরুলের কৃতিত্ব এই যে, ঔপনিবেশিক অধীনতার প্রেক্ষাপটে তাঁর এক একটি কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালী সমাজ নতুন এক বিশ্বাস ও অনুপ্রেরণার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সেদিন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রগতিশীল মুক্তিকামী মানুষ মাত্রই নজরুলের ভাবাদর্শে আলোড়িত হয়েছিল।

আমরা জানি ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ দেশের মুসলমানরা ক্রমেই নিরুৎসাহ, নিরুদ্যম হয়ে এক ভয়াবহ নির্জীবতার শিকার হয়। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত এ মুসলমানরা শুধু সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার বাণীই বিস্মৃত হয়নি; বরং আধুনিক চিন্তা, শিক্ষা, রুচি ও সংস্কৃতি থেকেও রইল যোজন যোজন দূরে। তবে নজরুলের আগমনের মধ্য দিয়েই শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিমুখ মুসলমানদের মধ্যে উন্মেষ ঘটে নবজাগরণের।

মুসলিম সংস্কৃতি ও মুসলমানদের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৌর্য-বীর্য ও বিজয়গাঁথা নজরুলের কবিতার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের সমস্ত মুসলমানদের মধ্যে এক নবচেতনার সৃষ্টি করে। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের শাত্-ইল-আরব, বোধন, খেয়াপারের তরণী, মোহাররম, কামাল পাশা ইত্যাদি কবিতা এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । এভাবে ঔপনিবেশিক সময়পর্বে নজরুলের আর্বিভাবÑতথা তাঁর চিন্তা, চেতনা, মনন ও বোধের সংস্পর্শে অধঃপতিত বাঙালী মুসলিম সমাজ এক নব আলোকের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও হিন্দু কলেজকে কেন্দ্র করে যখন ইংরেজী শিক্ষার সূত্রপাত হলো তখন নতুন শিক্ষিত তরুণ সম্প্রদায় ও প্রাচীনপন্থী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নিদারুণ এক দূরত্বের সৃষ্টি হয়। মহামতি ডিরজিওর সাহচর্য, রাজা রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়া ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাবে কলকাতাকেন্দ্রিক বিশাল এক ইংরেজী শিক্ষিত শ্রেণী গড়ে উঠতে থাকে। যারা ছিল সনাতন ধর্মের ঘোরতর বিরোধী। রেনেসাঁসের প্রভাবে এই উদ্দীপ্ত নব্য ইংরেজী শিক্ষিত তরুণ সম্প্রদায়ের ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আগ্রহ এবং সনাতন ধর্মের প্রতি তাচ্ছিল্য হিন্দু সমাজকে ক্ষুব্ধ করছিল। এই সময়ে হিন্দু ধর্মের এবং তাদের দেবদেবীর মহিমাকীর্তনের জন্য একজন বড় কবির প্রয়োজন দেখা দেয়। কেননা সে সময়ের বড় কবিদের মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ এবং তারপরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আগ্রহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় বেশি অসহায় করে তুলেছিল। সময়ের ধারাবাহিকতায় এ অবস্থায় বিদ্রোহী ও সাম্যের বাণী নিয়ে সাহিত্যের আকাশে আবির্ভুত হন কাজী নজরুল ইসলাম।

তাঁর প্রকৃত মাহাত্ম্য এই যেÑ তিনি কোনভাবেই ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দেননি। কারণ কী হিন্দুধর্ম বা কী ইসলাম ধর্ম উভয় ধর্মেরই ধর্মীয় উগ্রতা ও অন্ধত্ব নজরুলের কাছে উপেক্ষিত ও ঘৃণিত হয়েছে। আজ আমাদের চেতনায় গভীরভাবে এই শিক্ষা গ্রহণের সময় হয়েছে যে, প্রকৃত শান্তির জন্য ধর্মীয় উগ্রতা নয় বরং ধর্মীয় প্রীতিই কাম্য। তাই আমরা দেখি ধর্মীয় অন্ধাত্ব ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে নজরুল ইসলাম তাঁর অবস্থানকে স্পষ্ট করছেন এভাবেÑ

‘হিন্দুত্ব ও মুসলমানত্ব দুই সওয়া যায় কিন্তু তাদের টিকিত্ব, দাড়িত্ব অসহ্য, কেননা ওই দুটোই মারামারি বাধায়। টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা পা-িত্ব। তেমনি দাড়িত্ব ইসলামত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব।’ (হিন্দু মুসলিম)

এই হচ্ছে ধর্ম সম্পর্কে নজরুলের প্রকৃত অবস্থান ও অভিমত। নজরুলের এই চেতনার নিরিখে আজ আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি, বর্তমানে আমাদের সমস্ত সঙ্কটের কেন্দ্রে রয়েছে এই ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধত্বের আস্ফালন। সুতরাং সময় এসেছে হিন্দু-মুসলিম নির্বেশেষে সকল ধর্মের মানুষকে নজরুলের এই মুক্তচিন্তাকে মননে ও কর্মে ধ্রুব সত্য করে নেয়ার। এর প্রয়োজনটা আমরা ইতিহাস হাতড়ালে দেখব- ব্রিটিশ ভারতে যখন ইংরেজগণ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে গোটা ভারতকে শোষণে শোষণে জীর্ণ করে তুলছিল- তখনই নজরুল উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানালেন-

‘কা-ারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ

‘হিন্দু না মুসলিম’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? (কা-ারী হুঁশিয়ার)

অসহায় জাতি শোষণের সাগরে ডুবে যাচ্ছে- তাই নজরুল আহ্বান জানাচ্ছেন সে জাতির সন্তানদের, কোন হিন্দু কিংবা মুসলিমকে নয়। আজ আমাদের সময় হয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিককেই দেশমাতৃকার সত্যিকার শান্তি প্রতিষ্ঠায় সচেতন ও অগ্রগামী হওয়ার।

ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে বন্দী পরাধীন এক ভূমিতে জন্ম নেয়া নজরুল তাঁর সমস্ত জীবন উৎসর্গ করেছেন স্বদেশের মুক্তির অন্বেষায়। আর এ মুক্তির প্রথম শর্ত হিসেবে তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মে বার বার যে কথাটি প্রকাশ করতে যারপরনাই সচেষ্ট ছিলেন- তা হলো হিন্দু-মুসলিমের ঐক্য। নজরুলের মতে দেশমাতার কাছে ধর্ম নয়, সন্তানই বড়। অর্থাৎ নজরুলের কাছে ধর্ম বড় না দেশ বড়- তার সবিশেষ মীমাংসিত উত্তর ছড়িয়ে আছে কবির এহেন অসংখ্য রচনায়। তাই তো নজরুল দেশমাতৃকার ভক্তিকেই সত্য মেনে দ্বিধাহীন চিত্তে বলে ওঠেন-

‘এক সে দেশের মাটিতে পাই,

কেউ গোরে কেউ শ্মশানে ঠাঁই।

এক ভাষাতে মাকে ডাকি,

এক সুরে গাই গান।’

এখানে কবি মানুষের অন্তিম পরিণতির কথা বলে মূলত ঐকমত্যের আদর্শকেই প্রধান করে তুলেছেন।

কাজী নজরুল ইসলাম সমগ্র জীবনভর ধর্মনিরপেক্ষ সাম্যের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত এক সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। তাই তো তিনি তঁাঁর ধর্ম ও কর্মের পথকে একটি মাত্র গন্তব্যে স্থির করেছেন। আর সে গন্তব্য হলোÑ দেশের মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ সাধন। সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সকল ধর্মের মানুষকেই এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। এ ছিল নজরুলের ধর্ম ও কর্মের মূল আদর্শ।

আজ যে হন্তারক সময় প্রতিনিয়ত আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে; যে সামাজিক বৈনাশিকতা আমাদের স্বপ্নেও এসে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে-সেখানে এক সুন্দর, ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্য নির্ভর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নজরুলের ধর্ম ও কর্মের আদর্শের কোন বিকল্প নেই।

নির্বাচিত সংবাদ