২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যঙ্গ রচনার দক্ষ তীরন্দাজ

  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

সাহিত্য সমাজের দর্পণ। যে কোন ধরনের সাহিত্যকর্মে কোন না কোনভাবে সমাজচিত্র উপস্থাপিত হয়। হাজার বছর আগের চর্যাপদ পড়ে আমরা সে-সময়ের মানুষজন কেমন ছিল, তা উপলব্ধি করতে পারি। তবে সাহিত্যের কয়েকটি শাখায় বিশেষভাবে সমাজচিত্র খুব স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। এর মধ্যে একটি শাখা হলো ব্যঙ্গ। বিশেষ করে সমাজের অসঙ্গতির দিকে তীক্ষè তীর ছুঁড়ে দিতে রম্যব্যঙ্গ অপ্রতিদ্বন্দ্বী মাধ্যম। বঙ্গদেশে সাহিত্য চর্চায় ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপকে যারা চর্চার অনুষঙ্গ হিসেবে নিয়েছেন, তাদের কথা বলতে গেলে প্রথম আসে বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবুল মনসুর আহমেদের মতো বরণ্যদের নাম। বর্তমান সময়ে যারা ব্যঙ্গ লিখছেন এবং পেয়েছেন পাঠকপ্রিয়তা- তাদের মধ্যে মোস্তফা কামাল উল্লেখযোগ্য ও অগ্রগণ্য নাম। উপস্থাপনার চাতুর্য ও গল্প বলার কৌশলের কারণে মোস্তফা কামালের ব্যঙ্গগুলো ভিন্নরকমভাবে সৌকর্যম-িত হয়। ব্যঙ্গরচনা সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেই অসঙ্গতিগুলোকে বাণবিদ্ধও করে থাকে। শুধু তাই নয়, ব্যঙ্গ রচনা মানব মনের চেতনতাকে নতুনভাবে জাগ্রত করে, উপলব্ধি করায় নতুন এক বোধের। মোস্তফা কামালের প্রতিটি রচনাতেই আমরা এমন এক বোধের সাক্ষাৎ পাই। পাঠক খুব সহজেই এই বোধটুকু ধরতে পারেন। যার ফলশ্রুতিতে মোস্তফা কামালের ব্যঙ্গরচনাগুলো পাঠকমনে দীর্ঘ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

যে কোন শিল্পীই তাঁর সমাজকে দেখেন। শিল্পীর দেখার বিষয় বিচিত্র। বনফুল বলেছিলেন, আমার জীবনে আমি বিচিত্র রকম মানুষের সন্ধান পেয়েছি। মানুষের বিচিত্রতাই আমি আমার গল্পে তুলে ধরতে চেয়েছি। একই কথাগুলো মোস্তফা কামালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি বিচিত্র ধরনের মানুষ দেখেছেন। রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ঘুষখোর, ডাকাত, চোর-ছিনতাইকারী, স্কুল শিক্ষক, পুলিশ, চিকিৎসকÑসব শ্রেণীর মানুষকেই তিনি দেখেছেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ফলে আমাদের সমাজের যার অবস্থা যেরকম, যিনি যেই চরিত্রটি বহন করেন, মোস্তফা কামালের লেখায় সেই চরিত্রটিই হুবহু ধরা পড়েছে। তবে রম্যব্যঙ্গের ধর্ম যেহেতু অসঙ্গতি, অন্যায়, অসুন্দরকে চিহ্নিত করাÑ তাই মোস্তফা কামালের লেখায় খল তথা নেতিবাচক চরিত্রেরই প্রাধান্য বেশি থাকে। তবে কখনো কখনো লেখক সুন্দরের প্রত্যাশা করেছেন। দেখিয়েছেন সুন্দরের পথ। সমস্যা সমাধানে করণীয় সম্পর্কে বলেছেন। তাঁর এ ধরনের লেখাগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থবহ। কারণ, এ ধরনের ব্যঙ্গ গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে পাঠক নিজেও অসঙ্গতি দূরীকরণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

মোস্তফা কামালের রম্যব্যঙ্গগুলো ‘পাগল ছাগল ও গাধা সমগ্র’ শিরোনামে সিরিজ গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়ে থাকে। তাঁর এই বইগুলো পাঠে আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি আমাদের সমাজকে। উপলব্ধি করি আমাদের নৈতিকতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও। এসব বিষয়-আশয় রূপায়ণে মোস্তফা কামাল সর্বাত্মক চেষ্টার সর্বোচ্চ পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি কখনো কটাক্ষ করেছেন আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে, আবার কখনো কখনো কটাক্ষ করেছেন রাজাকার, ধর্ম ব্যবসায়ীদেরকে। তবে কটাক্ষের বিষয় যাই হোক না কেন, রচনার পরিণতিতে প্রত্যক্ষ হয়েছে মানুষের বুদ্ধিহীনতা, নিচতা, হিংস্রতা। রাজনীতি নিয়ে বলতে গিয়ে ২০১২ সালে ‘অরাজনৈতিক জুজুর ভয়’ রচনায় মোস্তফা কামাল লিখেছেন, ‘রাজনীতির ধূলিঝড় প্রায়ই যেন কালবৈশাখী ঝড়ে রূপ নেয়। সেই ঝড়ে একেবারে ল-ভ- করে দেয় দেশটাকে।...পান থেকে চুন খসলেই মানুষের শঙ্কার পারদটা যেন শীর্ষবিন্দুতে গিয়ে ঠেকে। কথায় বলে না, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়! আমাদের দেশের মানুষের হয়েছে সেই অবস্থা!’ রাজনীতির নানা প্রসঙ্গই বারবার উঠে এসেছে মোস্তফা কামালের লেখনীতে। বর্তমান মানুষ রাজনীতিকে কিভাবে দেখছেন, আবার রাজনীতিবিদরা রাজনীতিকে কিভাবে দেখছেনÑ সেই বিষয়গুলো গল্প আকারে তাঁর লিখনীতে উঠে এসেছে। ‘একদিনের প্রধানমন্ত্রী’ রম্যে মোস্তফা কামাল চিত্রায়িত করেছেন দেশকে। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যে নতুন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের সংলাপের মধ্য দিয়ে। রচনায় হুমায়ুন কবির একসময় বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী হলে আইন করে হরতাল বন্ধ করে দিতাম। হরতালের নামে যারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, তাদের মৃত্যুদ-ে দ-িত করতাম। যারা সারাদেশে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করে (বিশেষ করে জামায়াত) তাদের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করে দিতাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্যে পুলিশ বিভাগে ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ করে দিতাম।...রাজনৈতিক দল এবং নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর আইন করতাম।’

পূর্বেও উল্লেখ করেছি, রাজাকার ও আলবদরদের জন্যে মোস্তফা কামালের রয়েছে বিশেষ ঘৃণা। জঙ্গীবাদীদের প্রতিও তাঁর কলম তলোয়ার হয়ে ঝলসে উঠেছে। তাই ‘তুই রাজাকার’ রচনায় রাজাকার হাসমত উল্যাহর পরিবারের লোকজনের মুখ দিয়েই লেখক ‘তুই রাজাকার’ কথাগুলো বলিয়েছেন। আমরা অবাক হই, যখন দেখি হাসমতের চিরশান্ত স্ত্রী বলে, ‘একাত্তরের কথা তুমি ভুলে গেছ! কী করেছিলে তখন? এতদিন মুখ বুজে সহ্য করেছি। আর না। নতুন প্রজন্ম জেগে উঠেছে। ওরাই আমাদের পথ দেখাবে।’

বাঙালীরা আবেগপ্রবণ জাতি এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। আন্দোলন সংগ্রামেও তারা আবেগী। আবার ভুলে যাওয়ার মতো কঠিন রোগও লেপ্টে আছে বাঙালীর চরিত্রে। যার ফলে আমরা আজকের আলোচিত খুনকে আগামী মাসে মনে রাখি না। আবার রানা প্লাজার মতো ট্র্যাজেডিকে মাস ছয়েক পরেই ভুলে যাই। যেমন ভুলে যাই এক এগারো বা তনু হত্যার বিচারের কথা। মোস্তফা কামাল তাঁর লিখনীতে বাঙালীর এমন চরিত্রকে সূক্ষ্মভাবে অঙ্কন করেছেন। ‘দশ নম্বর বিপদ সংকেত’ রচনায় তিনি লিখেছেন, ফজলু মামা বলছে, ‘বাঙালী অতি আবেগপ্রবণ আর অতিদ্রুত ভুলে যাওয়া জাতি। ভুলে যায় আলবদর-রাজাকারের নৃশংসতা, এরশাদের মতো বিশ্ববেহায়ার নিষ্ঠুরতার কথা! ভুলে যায় সরকারের অন্যায় অপকর্মের কথা!’ আবার বাঙালী যে একই সঙ্গে বিচিত্র চরিত্রকে ধারণ করে আছে সে কথাটিও প্রকাশ পায় এই রচনাটিতে। যেন বাঙালীর একমাত্র কাজ সমালোচনা। বাঙালীদের সমালোচনা প্রবণতার স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে লেখক লিখেছেন, ‘ধরুন, কেউ খুন করল। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী খুনের সাজা হচ্ছে মৃত্যুদ-। তাই করা হলো। তারপরও মানুষ বলবে, মৃত্যুদ- হওয়ার কী দরকার ছিল! কয়েক বছরের সাজা দিয়ে দিলেই তো হতো!’

মোস্তফা কামাল তাঁর রম্যগুলোতে গল্পের পাশাপাশি নিজেও উপস্থিত থাকেন। প্রতিটি গল্পের মধ্যেই আমরা তাঁর সন্ধান পাই। কখনো কখনো তিনি বিশিষ্টজনদের কাল্পনিক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। আমরা দেখি তার সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন গোলাম আজম, মন্ত্রী, এমপি, তারেক রহমান, লতিফ সিদ্দিকী থেকে শুরু করে ছিচকে চোর পর্যন্ত। এমন সাক্ষাৎকারের মূল উদ্দেশ্য থাকে ওই মানুষদের মুখোশ উন্মোচন। লেখক তাঁর প্রতিটি কাল্পনিক সাক্ষাৎকারে তাদের স্বরূপ উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন। এ জন্য তিনি অভিনন্দন পাবার যোগ্য।

ব্যঙ্গ রচনা লেখা সহজ কাজ নয়। লেখক প্রতিভা থাকার পাশাপাশি এ কাজে প্রয়োজন অসীম সাহস। কারণ যেই অসঙ্গতির দিকে লেখক আঙুল তুলেন, সেই অসঙ্গতি সংশ্লিষ্ট লোকদের অবধারিতভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকবেই। এসব প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ কখনো কখনো হয়রানি বা ক্ষোভের শিকার হতে হয় লেখককে। মোস্তফা কামাল নিজেই তাঁর ‘পাগল ছাগল ও গাধা সমগ্র ৯’-এর ভূমিকা লিখতে গিয়ে লিখেছেনÑ‘রঙ্গব্যঙ্গ-এর দীর্ঘ এগারো বছরের পথচলায় অনেক বাধা-বিপত্তি, হুমকি-ধমকি, এমনকি মামলাও হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। কিন্তু কোনদিন অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি। অন্যায়কারী যতই শক্তিশালী হোক, অন্যায়কে ‘না’ বলব। সারাজীবন না-ই বলব। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার যে শপথ নিয়েছি, তার থেকে এক চুলও বিচ্যুত হব না।’ মোস্তফা কামালের এমন অঙ্গীকারই তাঁর লিখনীর শক্তি ও পথচলার প্রেরণা। ৩০ মে জন্ম নেয়া মোস্তফা কামাল কয়েক দশক ধরে সাহিত্য অঙ্গনে সরব বিচরণ করছেন। রম্য, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস মিলিয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা ৮৬টি।