১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অতীত বর্তমানের সেতুবন্ধ

  • সাইফুজ্জামান

১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। জাদুঘর একটি দেশে ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। স্থায়ী, অস্থায়ী প্রদর্শনীতে শিল্পকলা, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, জাতিতাত্ত্বিক, প্রাকৃতিক নিদর্শনাদিতে পরিপূর্ণ তার ভা-ার। ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের পথ চলা শুরু হয়। বহুমাত্রিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্ম পরিসরে আজ বিস্তৃত তার শাখা-প্রশাখা।

ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে জাদুঘরের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্রিটিশ শাসনকালে ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে গঠিত প্রদেশের রাজধানী ‘ঢাকা’ গৌরবের ইতিহাসের ধারক ও বাহক। এ অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ হয় ১৯১১ সালে বঙ্গবঙ্গের ফলে। ব্যক্তি উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সমবেত প্রচেষ্টায় ‘জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা সফলতা পায় নানা চড়াই-উতরাই পার হওয়ার পর। এর ইতিহাস নানা ঘটনাবর্তে ঐতিহ্যময়। ১৯৮৫ সালের ১ নবেম্বর ‘দ্য ঢাকা নিউজ’ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে ‘জাদুঘর’ স্থাপনের ব্যাপারে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯০৯ সালে শিলং থেকে কিছু মুদ্রা ঢাকায় স্থানান্তর হওয়ার পর। ১৯১০ সালের ১ মার্চ বিশিষ্ট মুদ্রাতত্ত্ববিদ এইচ.এ স্টাপলটন গবর্নর ল্যান্সলট হিয়ারকে ঢাকায় একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সুধী সমাজের মধ্যে মতবিনিময় চলতে থাকে। ১৯১২ সালের ২৫ জুলাই ঢাকার নর্থব্রুক হলে সুধীবৃন্দ সভায় মিলিত হন। ১৯১৩ সালের ৫ মার্চ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার অনুমোদন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

১৯১৩ সালের ২০ মার্চ ঢাকা জাদুঘর ২ হাজার রুপী তহবিলে যাত্রা শুরু করে। বাংলার গবর্নর লর্ড কার মাইকেল তৎকালীন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একটি কক্ষে ঢাকা ‘জাদুঘর’ উদ্বোধন করেন। ৩০ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রভিশনাল জেনারেল কমিটি গঠিত হয়। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার নিকোলাস ডি বিটসনবেলকে সভাপতি করে জাদুঘরের খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। সাধারণ ও নির্বাহী পরিষদ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা তুলে ধরে। ১৯১৪ সালের ৩ মার্চ সাধারণ পরিষদ বেঙ্গল গবর্নমেন্টকে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য পাঁচ হাজার রুপী প্রদানের অনুরোধ করে। ১৯১৪ সালের ১৯ মে প্রথম নির্বাহী কমিটির সভায় ১৯১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়। এ সময় জাদুঘরের একজন কিউরেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯১৪ সালের ৬ জুলাই নলিনী কান্ত ভট্টশালীকে জাদুঘরের প্রথম কিউরেটর নিযুক্ত করা হয়। ভট্টশালী মাসিক একশ’ রুপী বেতন ভাতাদিতে নিযুক্ত হন। নলিনী কান্ত ভট্টশালী ছিলেন বিশিষ্ট মুদ্রাতত্ত্ববিদ, ভাস্কর বিশেষজ্ঞ। তাঁর অধ্যবসায়, কর্মদক্ষতা ইতিহাস, ঐতিহ্য অনুরাগের মাধ্যমে জাদুঘর বিকশিত হয়। ১৯১৩ সালের ৭ আগস্ট ‘ঢাকা জাদুঘর’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। নিদর্শন সংগ্রহ, গবেষণা, প্রদর্শন সজ্জিত করার কাজ দ্রুত এগুতে থাকে। ৩৭৯টি নিদর্শন নিয়ে জাদুঘর প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ১৯১৪ সালের ২৫ আগস্ট। ঢাকার দানশীল ব্যক্তিরা জাদুঘরে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারকসমূহ প্রদর্শনের জন্য উপহার হিসেবে প্রদান করেন। ১৯১৫ সালের জুলাই মাসে সচিবালয় থেকে নিমতলীর বারো দুয়ারী ও দেওড়ীতে ‘ঢাকা জাদুঘর’ স্থানান্তর করা হয়। নিমতলীতে অবস্থিত ‘ঢাকা জাদুঘর’ ক্রমে পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিত্তবান, ইতিহাসমনস্ক ব্যক্তিদের নিরলস পৃষ্ঠপোষকতায় জাদুঘরে সংগ্রহ বাড়তে থাকে। ১৯৩৬ সালে সাধারণ পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদ বিলুপ্ত করা হয়। ‘জাদুঘর’ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় ৯ সদস্যবিশিষ্ট জাদুঘর কমিটিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কমিটির সভাপতি ও কিউরেটর সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টশালী মৃত্যুবরণ করেন। পরে ঢাকা জাদুঘরের অবৈতনিক কিউরেটর হিসেবে নিযুক্ত হন আহমদ হাসান দানী, সিরাজুল হক, মফিজুল্লাহ কবির, আবু মহাদেব হবিবুল্লাহ্। জাদুঘর কর্মীদের তিল তিল শ্রমে উপ মহাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগ্রহশালা ‘ঢাকা জাদুঘর’ ভাস্কর্য, মুদ্রা, শিলালিপি, পোড়ামাটির শিল্পকর্ম, জাতিতাত্ত্বিক নিদর্শন খনিজ ও প্রাকৃতিক উপদাান সমৃদ্ধ বস্তুর সমাহারে বিশিষ্টতা অর্জন করে। ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল ঢাকা মিউজিয়াম অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বোর্ড ট্রাস্টিজ গঠিত হয়। ১৯৬১ সালে দিনাজপুর থেকে সংগৃহীত নিদর্শন ‘ঢাকা জাদুঘরে’র সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করে। ১৯৬৩ সালে বলধা জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শন ‘ঢাকা জাদুঘরে’ সংগ্রহ করা হয়।

১৯৮৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় জাদুঘর অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়। ১৫ নবেম্বর জাদুঘর বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠিত হয়। ১৯৮৩ সালের ২০ নবেম্বর জাতীয় জাদুঘর ভবন উদ্বোধন করা হয়। ‘ঢাকা জাদুঘর’ ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে’ আত্তীকৃত হয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় উন্নীত হয়। শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর আজ গৌরবের বহুমাত্রিক নিদর্শন প্রদর্শন ও সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠান হয়ে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধ রচনা করছে।

আট একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর শুধু একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নয়, পরিপূর্ণ সংরক্ষণশালাও বটে। প্রস্তর ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন মধ্যযুগীয় মুদ্রা, শিলালিপি, তুলট কাগজ, তালপাতায় লেখা সংস্কৃত, বাংলা ও আরবী ফার্সী পান্ডুলিপি জাদুঘরের সংগৃহীত নিদর্শনের উল্লেখযোগ্য অংশ। নকশী কাথা, দারু শিল্প, সমকালীন, শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম, বিশ্বসভ্যতার উপাদান, গাছ পালা, শিলা, খনিজ, প্রাকৃতিক বস্তু জাদুঘরের সংগ্রহে বহুমাত্রিক সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে। চারতলা জাদুঘর ভবনের ২০,০০০ বর্গ মিটারজুড়ে রকমারী নিদর্শনের প্রদর্শন দৃষ্টিনন্দন। বাংলার ইতিহাসের ধারাবাহিক উপস্থাপন অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত ঘটনাপঞ্জি ইতিহাসের স্মারকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। বীর, যোদ্ধা, ইতিহাসের পাত্র-পাত্রী সরব উপস্থাপনায়। বাংলা অঞ্চলের ইতিহাস, বাঙালীর আত্মত্যাগে গৌরবদীপ্ত। জাতীয় জাদুঘর উপস্থাপনা, শৈলীর মাধ্যমে মূর্ত করে তুলেছে ইতিহাসকে। তরুণ প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবন ও কর্ম তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ভিডিও, অডিও উপস্থাপন হৃদয়গ্রাহী। সেমিনার, আলোচনা, প্রদর্শনীতে মনিষীদের অবদান তুলে ধরা হচ্ছে। জাতীয় জাদুঘরের আর্কাইভ ও শ্রুতচিত্রণ শাখা কথ্য ইতিহাস ও প্রাচীন দলিলপত্রে সমৃদ্ধ। বিশাল ভা-ারে যুক্ত হয়েছে অমূল্য রতœ। এর পেছনে রয়েছে উপহার দাতা, বিক্রেতা ও জাদুঘর কর্মীদের মিলিত শ্রম। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নিরন্তর পথ চলা কল্যাণময় হোক। প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহ দিয়ে জাদুঘরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। আজ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমকালীন বস্তুসম্ভার সংযুক্ত হয়েছে জাদুঘরে।

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবিষ্কৃত প্রাচীন কোরআন শরীফের ৪ পৃষ্ঠার বিশেষ প্রদর্শনী জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রদর্শনীতে বিশেষ তথ্য ও আলোকচিত্র সংযুক্ত করা হয়। পৃথিবীব্যাপী জাদুঘরের কর্মকা- প্রসারিত হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাদুঘরকে দর্শকপ্রিয় করার ব্যাপারে জাদুঘর কর্মীদের নিত্যনতুন ভাবতে হচ্ছে। প্রদর্শনের নতুনত্ব ও পর্যাপ্ত তথ্য জাদুঘর ভা-ারে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অনুষ্ঠানমালায় নতুনত্ব এনেছে। প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত নিদর্শনের খুঁটিনাটি দিক কম্পিউটার ও ট্যাবে প্রতিনিয়ত আকর্ষণীয়, চলমান ও জীবন্ত করে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে স্বাধীন বাংলা বেতার কক্ষে শব্দ সৈনিকের অংশগ্রহণ, স্মৃতিচারণ ও স্মৃতি সামগ্রী প্রদর্শন করা হয়েছে।

এ ধরনের অসংখ্য বিশেষ প্রদর্শনী জাতীয় জাদুঘরে হয়ে থাকে। নিদর্শন সংগ্রহ চলমান প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। আধুনিক জাদুঘর নিত্যনতুন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বস্তু নিদর্শন উপস্থাপন আকর্ষণীয় ও তথ্যবহুল করার বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কামনা সাধারণ জনগণ ও জাদুঘর কর্মীরা ভবিষ্যতে আধুনিক জাদুঘর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। জাদুঘরকে ভালবাসা, দেশকে ভালবাসার নামান্তর।