১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নজরুলের চেতনায় নারী

  • নাজনীন বেগম

উনিশ শতকের নবজাগরণের সমৃদ্ধির সময়ে (১৮৯৯) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম। কিন্তু বিশ শতকের শুরুতে অবিভক্ত বাংলায় শুরু হওয়া নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ঘটনা সারাদেশে যে উত্তেজনা অধ্যায়ের সূচনা করে নজরুলের শৈশব, কৈশোর তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালে মুসলীম লীগের প্রতিষ্ঠা, স্বদেশী আন্দোলনের আত্মঘাতী ও সশস্ত্র অভিযান ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠা সব মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক অঙ্গন উত্তপ্ত এবং অনেককাংশে সংঘাতপূর্ণও বটে। এমন অস্থির এবং সঙ্কটপূর্ণ আবহে নজরুল তাঁর জীবন সংগ্রামের বৈতরণী পার করতে থাকেন। পারিপার্শি¦ক অস্থিরতায় নজরুলের চিন্তা-চেতনায় যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে সেটাই তাঁকে বিদ্রোহীর র্বাতা বহনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় আর তাই নজরুল শুরু থেকেই বিদ্রোহী এবং বিপ্লবী। সৃজনশীলতায়ও পড়ে এর সুদূরপ্রাসরী ছাপ। সৃজন-ক্ষমতার শেষ দিন পর্যন্ত তাই কখনও শান্ত থাকতে পারেননি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তারই অনুরণন।

বিদ্রোহী রণক্লান্ত,

আমি সেই দিন হব শান্ত,

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল

আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ

ভীম রণভূমে রণিবে নাÑ

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে একের পর এক সৃষ্টি করে গেলেন শৃঙ্খল ভাঙ্গার সৃজন-সৌধ। মনুষ্যত্বের অপমান, সর্বসাধারণের অসম্মানে ক্ষুব্ধ নজরুল জীবনভর সাম্যের বাণী, মিলনের বাঁধন তৈরি করে গেছেন। অসহায়, নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের জয়গান করতে যেয়ে ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তোলেন,

গাহি সাম্যের গান,

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,

নাহি কিছু মহীয়ান।

মানুষ বলতে তিনি নারী-পুরুষের মিলিত সত্তাকেই বুঝিয়েছেন। আর তাই সামাজিক আবর্জনার শিকার পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের প্রতি ও দায়িত্ববোধে, কর্তব্যনিষ্ঠায় সোচ্চার হন। নারীরাও যাতে মানুষের অধিকার নিয়ে সমাজে তার অবস্থান মজবুত করতে পারে সে বিষয়েও নজরুল ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। নারীকে তার প্রাপ্ত মর্যাদা দিতে তাঁর সাহিত্যের বিভিন্ন জায়গায় অম্লান ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত করেছেন। নারী-পুরুষের মিলিত শৌর্যই যুগে যুগে সমাজের গ্রন্থি শক্ত করেছে, সভ্যতার বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে, সংস্কৃতি চর্চার পথকে অবারিত করেছে। আর তাই ‘নারী’ কবিতায় শোনা যায়Ñ

কোনো কালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারি,

প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে, বিজয়লক্ষ্মী নারী।

সমাজের প্রায়ই অর্ধাংশ নারী জাতিকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রেখে, তাদের যথাযথ ক্ষমতাকে উপেক্ষা করে সমাজ কখনও স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। সমাজ-সংস্কার এগিয়ে যাবে নারী-পুরুষের যৌথ কর্মযজ্ঞে।

নারীকে জাগতে হবে আপন মহিমায়, স্বকীয় কর্মদ্যোতনায়। অধিকার সচেতন নারীকেই আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে তাঁর স্বাধীন অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হবে। আপন মর্যাদায়, কঠিন প্রত্যয়ে ভেতরের চাপা আগুনকে দীপ্যমান করতে হবে। সেই উদাত্ত আহ্বান তাঁর কঠিন বাণীতেÑ

‘জাগো নারী বহ্নিশিখা, জাগো’

সমাজের আনন্দ-বেদনা, ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখের সমান অংশীদার নারী-পুরুষ উভয়েই অর্থাৎ সমাজ-সভ্যতার পুরো দায়ভাগ মানুষের। সেখানে তিনি নারী-পুরুষকে আলাদা সত্তা হিসেবে কখনই ভাবতে চাননি। বিশ শতকের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতার যে উত্তাল পরিবেশ সেখানে কোন মানুষেরই সুস্থির হওয়ার উপায় ছিল না। সমাজের সেই বিপন্ন স্রোতের মোকাবেলায় নারী-পুরুষ সবাইকে হাল ধরার আকুতি জানিয়েছেন। তিনি বলেন,

সাম্যের গান গাই,

আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোন ভেদাভেদ নাই।

সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে, সংগ্রামে, বিপর্যয়ে, কঠিন পরিস্থিতিতে নারীদের নীরব ভূমিকা, নিঃশর্ত আত্মদানে কবি মুগ্ধ আবার একই সঙ্গে বিক্ষুব্ধও। সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে, পরিবেশ-পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোপরি সমাজের সঙ্কটাপন্ন মুহূর্তে নারী সব সময় পুরুষের সহযোগী শক্তি হিসেবে পাশে থেকেছে, গুরুত্বপূর্ণ কর্মযোগে অংশ নিয়েছে, জয়-পরাজয়কে সমানভাবে ভাগ করে নিজেদের অবস্থানকে শক্ত করেছে। মায়ের ভূমিকায়, স্ত্রীর কর্তব্যে, ভোগিনীর দায়িত্বে নারীরা আপন বৈশিষ্ট্যে সব সময়ই মহিমান্বিত ছিল। তা না হলে সমাজের গতি স্থবির হয়ে যেত। সভ্যতার চাকা নিরন্তর হতো না, সংস্কৃতিতে ভর করত কূপম-ূকতা, সর্ব মানুষের জীবন হয়ে যেত এক অচলায়তন পাষাণ-প্রতিমার মতো। আর তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেভাবে মানুষের জয়গান গেয়েছেন, একইভাবে নারী বন্দনায়ও তিনি ছিলেন আমাদের অগ্রদূত। নারী তার আপন ঐশ্বর্যে, সচেতন প্রত্যয়ে, প্রতিদিনের কর্মকা-ে, সমাজ-সভ্যতার অগ্রগতিতে স্বীয় কর্তব্যে অটুট থাকুক এটাই ছিল নজরুলের আন্তরিক আবেদন। নারী জাতির সমস্ত মহিমাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে নজরুল ‘নারী’ কবিতায় আরও বলেন,

জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,

মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।

কোন রণে-কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,

কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর লেখানাই তার পাশে। কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি কত বোন দিল সেবা, বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা।

নির্বাচিত সংবাদ