১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুদূর আমেরিকায়

  • সুলতান উদ্দিন আহম্মদ

হাতে সময় কম। দ্রুত বিমানবন্দর পৌঁছাতে হবে। আস্তে আস্তে গাড়ি এগুতে থাকে।এই তো সেদিন বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর অপর পৃষ্ঠে সুদূর আমেরিকায় ছেলেকে দেখার জন্য আমি এবং আমার স্ত্রী ইয়াছমিন এসেছিলাম। প্রায় দুই মাস মহা আনন্দে ভ্রমণ শেষে এখন আমাদের ফেরত যাত্রা। জীবনে প্রথম বিদেশ যাওয়া। রাত ৯টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এ্যামিরাত এয়ার লাইনে রওনা হই। রাত দুইটার সময় দুবাই, দুই ঘণ্টা যাত্রা বিরতি এবং প্লেন বদল হয়। তুলার মতো সাদা মেঘমালা সমুদ্রের নীল জলের ওপর ভাসছে। প্রায় চল্লিশ হাজার ফুট ওপর দিয়ে এখন আমরা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছি। অবশেষে প্রায় দুই হাজার মাইল উড়ে এসে মেঘমুক্ত রৌদ্রজ্জ্বল দিনে আমেরিকার সময় সকাল ৯টায় আমাদের প্লেন নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমেরিকার মাটি স্পর্শ করে। সকলের সঙ্গে আমরাও প্লেন থেকে নেমে আসি।

ম্যানহাটনে এক সময় ছিল আমেরিকার আদিবাসী রেডইন্ডিয়ানদের কিছু কুঁড়েঘর। এখন সেখানে শত শত আকাশচুম্বী অট্টালিকা। ঘুরতে ঘুরতে এবার আমরা আসি যেখানে ধ্বংস করা হয়েছিল টুইনটাওয়ার খ্যাত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। পাশাপাশি একশ দশ তলা দুটি আকাশচুম্বী অট্টালিকা আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়নকল্পে নির্মাণ করা হয়েছিল।

প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক আসে এখানে। ধ্বংসস্তূপে চাপা পরে যারা মারা গিয়েছিল তাদের স্মরণে এই ঝর্ণা দুটির চতুর্দিকে কালো স্টিলের পাতে খোদাই করে নাম লিখা আছে। আত্মীয়স্বজনরা এসে নামের পার্শে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। আমেরিকা সম্পদশালী ভাগ্যবানদের জন্য স্বপ্নের দেশ। আবার ভাগ্যহারা মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গের দেশ। আকাশচুম্বী অট্টালিকার আশপাশে গৃহহীনদের দেখেছি ফুটপাথের ধারঘেঁষে কম্বলগায়ে শুয়ে শীতে কাঁপছে। তাদের মধ্যে সাদা কালো উভয়েই ছিল।

আমেরিকার স্বাধীনতার স্বারকস্তম্ভ স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখার জন্য একদিন সকালে ব্রুকলিন থেকে পাতাল ট্রেনে চড়ে আমরা আসি ম্যানহাটনের ফেরিঘাটে। টিকেট কেটে কড়া নিরাপত্তা চেকিং সেরে বিশাল জনস্রোতের সঙ্গে দুতলা জাহাজে উঠি। জাহাজ যখন ছাড়ল তখল সারা নিউইয়র্কের বিশাল সব দালানকোঠা এক নজরে দেখতে পেলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সবুজ গাছপালায় ঘেরা নিরিবিলি সুন্দর ছোট দ্বীপে এসে নামি। নানা রঙের ফুলের বাগানে সবুজ ঘাসের ওপর বসার জন্য অনেক কাঠের বেঞ্চ রাখা আছে। এক পাশের দেয়ালে লেখা আছে স্টেচুর নানা ইতিহাস। ফ্রান্স আমেরিকাকে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ উপহার দিয়েছিল ঝকঝকে লালচে রঙের তামার পাতে তৈরি বিশাল নারি মূর্তিটি। এটি প্রথমে খ- আকারে অনেকগুলো বাক্স ভরে এখানে আনা হয়েছিল। পরে জোড়া দিয়ে মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছে। ভিত থেকে এর উচ্চতা প্রায় তিনশ ফুট। এর ডান হাতে মশাল হলো জ্ঞানের শিখা এবং বা হাতের বই স্বাধীনতা ঘোষণার প্রতীক। দর্শকদের টিকেট কেটে স্ট্যাচুর ভেতরে একটি এলিভেটরে মাথা পর্যন্ত উঠার ব্যবস্থা আছে। স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখে আবার সেই বিশাল জনস্রোতের সঙ্গে দুতলা জাহাজে করে ফেরা হলো।

মিসিসিপি নদীর কূলঘেঁষে বিরাট এলাকাজুড়ে সেন্টক্লাউড স্টেট ইউনিভার্সিটি। বিশাল লাইব্রেরি দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা ছাত্রছাত্রীদের জন্য খোলা থাকে। সেলফে থরে থরে লাখ লাখ বই সাজানো আছে। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

এখানে চিড়িয়াখানা অনেক বড় তাই ঘুরে দেখার জন্য গাইডসহ গাড়িরও ব্যবস্থা আছে। এখানে জীবজন্তু আছে খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশ। এক জায়গায় দেখা গেল কৃত্রিম হালকা বৃষ্টির ব্যবস্থা করে স্যাঁতসেঁতে করে সেখানে পশুপাখি রাখা আছে। কোথাও কোথাও সুরঙ্গ পথ দিয়ে কিছু দূর চলার পর কাচেঘেরা নিরাপদ ঘর থেকে দেখা যাবে ভয়ঙ্কর সব প্রাণী। এখানকার বিরাট জাদুঘরে ডাইনোসরের কঙ্কাল ও ডিম দেখতে পাই। জুরাসিক পার্ক সিনেমায় দেখেছিলাম। এসব ভয়ঙ্কর ডাইনোসরেরা কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে কত দাপটের সঙ্গে বসবাস করত। এখন সারা পৃথিবীতে তাদের কঙ্কাল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

বিশাল আমেরিকায় দর্শনীয় কতকিছু দেখা হলো অজানা থেকে গেল আরও অনেক কিছুই। হাইওয়েতে মসৃণ রাস্তায় উল্কার বেগে গাড়ি ছুটতে থাকে।পথের দুদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ফসলের ক্ষেত দেখতে দেখতে চোখের সামনে ভাসতে থাকে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ছেলে আসিফের স্থির নয়ন ম্লান মুখখানি।