২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মমতার সেই কৌশলী কথাটাই ছুঁয়ে গেল আমজনতাকে

মমতার সেই কৌশলী কথাটাই ছুঁয়ে গেল আমজনতাকে

অনলাইন ডেস্ক ॥ দিদিই জিতলেন।

বলেছিলেন, ২৯৪টি আসনে তিনিই প্রার্থী। তাই ‘অভিমান’ থাকলেও মানুষ যেন ‘আশীর্বাদের’ হাত সরিয়ে না নেন! সেই কৌশলী কথাটাই ছুঁয়ে গেল কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ! পাঁচ বছর পরে আরও একটা বিধানসভা ভোটে দেখা গেল, দিদির বিকল্প দিদিই। আগের থেকেও বেশি ভোট দিয়ে তাঁকে আশীর্বাদ জানাল আমজনতা!

বিধানসভা নির্বাচন হলেও এ বার ভোটের স্লোগান ছিল অনেকটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতো। ‘হ্যাঁ দিদি’ বনাম ‘না দিদি’। বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, ২১১টি আসনে ‘হ্যাঁ দিদি’তেই সায় দিয়েছেন বেশির ভাগ মানুষ।

‘বিপুল জয়’ ছাড়া এই সাফল্যের আর কোনও তকমা হয় না। রাজকীয় প্রত্যাবর্তন! বাংলার রাজনীতিতে নতুন ইতিহাসও বটে। গত চার দশকে এই প্রথম কোনও দল একা ৪৬ শতাংশ ভোট পেল। একার জোরে জিতে নিল দুশোর বেশি আসন। বস্তুত, দিদির দলের তাবড় নেতাদের প্রত্যাশাও ছাপিয়ে গেল এই অঙ্ক।

কী ভাবে সম্ভব করলেন দিদি? বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যখন অভিযোগের অন্ত ছিল না। সারদা কাণ্ড ছিল, সিন্ডিকেট রাজ ছিল, শিল্পে বন্ধ্যা তথা কর্মসংস্থান না-হওয়া নিয়ে ক্ষোভও ছিল বিস্তর। তার ওপর ভোটের ঠিক আগে নারদা ছিল, উড়ালপুল ভেঙে পড়া ছিল এবং বিরোধী ভোটের ভাগাভাগি রুখতে জোটও ছিল!

কিন্তু রাজনীতিকদের মতে, এই সব নেতিবাচক বিষয়কে ছাপিয়ে গিয়েছে যে ইতিবাচক উপকরণ তার প্রথমটা অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের ফলেই স্পষ্ট, তৃণমূল মানে এখনও মমতাই। আর কেউ নন। তিনিই প্রথম ও শেষ পুঁজি। দলে বেনোজল ঢুকলেও ব্যক্তি মমতার ওপর আস্থা টলেনি গ্রাম-শহরের বহু মানুষের। এবং সেটা আঁচ করেই ভোট প্রচারে দিদি বারবার বলেছেন, ‘আমি অন্যায় করলে ভোট দেবেন না।’ কিংবা, ‘আগে জানলে নিশ্চয়ই ভাবতাম।’ তাঁর সেই কৌশলটাই শেষমেশ তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে।

তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করেছে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নেওয়া মমতার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত। অস্বীকার করার উপায় নেই শহর ও গ্রামে রাস্তা তৈরির কাজ আগের থেকে অনেক ভালো হয়েছে। তস্য গ্রামের মধ্যেও এত দিন অবহেলায় পড়ে থাকা মোরামের রাস্তায় কংক্রিট-বিটুমিনের প্রলেপ পড়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আগের থেকে উন্নত হয়েছে। তা ছাড়া, প্রান্তিক মানুষের কাছে ব্যক্তিগত সুবিধা পৌঁছে দিয়েছেন দিদি। গ্রামের মানুষ ২ টাকা কেজি দরে চাল পেয়েছেন। পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা সাইকেল পেয়েছেন। ক্লাবে ক্লাবে অনুদান দেওয়া হয়েছে। ইমামরা ভাতা পেয়েছেন। বঞ্চিত হননি কীর্তনিয়ারাও। রাজ্যের যখন ভাঁড়ে মা ভবানী, তখন এই খয়রাতির অর্থনীতি নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু দিদির মা-মাটি-মানুষ এতেই খুশি। তারা প্রতিদান দিতে কার্পণ্য করেনি। তফসিলি জাতি ও উপজাতি এলাকা, সংখ্যালঘু শ্রেণি, আর্থিক ভাবে অনগ্রসর অংশে তৃণমূলের জনভিত্তি এ সবের জন্যই মজবুত থেকে মজবুত-তর হয়েছে। দিদির সাফল্যে ইন্ধন জুগিয়েছে বাম তথা জোটের ব্যর্থতা। আলিমুদ্দিনের নেতারা অঙ্ক কষে বলছেন, গত লোকসভার তুলনায় শতাংশের হারে তাঁদের ভোট কমেনি। কিন্তু লোকসভা ভোটেই দেখা গিয়েছিল, বামেদের ছেড়ে বহু মানুষ চলে গেছেন বিজেপির দিকে। সেই ভোটের ঘর ওয়াপসি হয়নি। বিজেপির ভোট যা কমেছে, তা চলে গিয়েছে দিদির ভাঁড়ারে।

সংখ্যা-গুরুদের বিশ্লেষণ, দক্ষিণবঙ্গে তো বটেই, চলতি ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে উত্তরে জোটকে, বিশেষ করে বামেদের বিকল্প হিসেবে মেনে নিতে পারেননি অধিকাংশ মানুষ। নতুন প্রজন্মের যে অংশ তৃণমূলকে পছন্দ করেননি, তাঁরাও ইভিএমে বাম প্রার্থীর দিকে না-তাকিয়ে নোটার

বোতাম টিপেছেন। সন্দেহ নেই, জোট না হলেও আরও শোচনীয় অবস্থা হতো বামেদের। দিদির আসন তখন আড়াইশো পেরিয়ে যাওয়াটাও অসম্ভব ছিল না। বিপুল সাফল্যের মধ্যেও একটা আফশোস তাই

হয়তো থেকে গিয়েছে দিদির মনে। তাই ফল প্রকাশের পর বিষ্যুৎবারও জোটকে খোঁচা দিতে ভোলেননি। জোট নিয়ে বাম মহলে অসন্তোষকে উস্কে দিতে বলেছেন, ‘‘আদর্শ ছেড়ে দিলে এমনই হয়।’’

আজ, শুক্রবার নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে তৃণমূল পরিষদীয় দলের বৈঠক হবে। এ দিনই রাজ্যপালকে ইস্তফাপত্র জমা দেবেন মমতা। আগামী শুক্রবার (২৭ মে) শপথ নেবেন নয়া মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। তার পর নতুন সরকারের অভিমুখ কী হবে, তা নিয়ে কৌতূহল বিস্তর। কী ভাবে রাজ্য চলবে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে, জুলুম-তোলাবাজি বন্ধ করতে মমতা কতটা কঠোর হতে পারবেন তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসে? তা ছাড়া, দুর্নীতি দমনেই বা কী ব্যবস্থা নেবেন তিনি? নারদ কাণ্ডে অভিযুক্তদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেবেন, নাকি দূরে সরিয়ে রেখে পরিচ্ছন্নতার বার্তা দেবেন!

পাঁচ বছর আগে ফল প্রকাশের পর দিদি বলেছিলেন, ‘বদলা নয় বদল চাই’। ফল ঘোষণা মাত্রই বিজয় উৎসব শুরু করায় নিষেধ করেছিলেন। এ দিন কিন্তু তিনি সে কথা বলেননি। বরং বলেছেন, ‘‘কাল থেকে জেলায় জেলায় বিজয় উৎসব হবে।’’ রাজ্যে শান্তি বজায় রাখার কথা বলেও মনে করে দিয়েছেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা কিন্তু এখনও নির্বাচন কমিশনের হাতে।’’ আবার সারদা-নারদা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘‘রাজ্যে কোনও দুর্নীতিই নেই। সবটাই কুৎসা রটনা।’’

তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘‘এ সবই হল রাজনৈতিক জবাব। দিদিও জানেন, এই বিপুল সাফল্যের পর আরও বেশি দায়িত্ব চাপল তাঁর কাঁধে। সেই উপলব্ধি ধরা রয়েছে ওই একটি মন্তব্যে— বাংলাকে দেশের শ্রেষ্ঠ রাজ্যে উন্নীত করব আমি।’’

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা