২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ : বাগেরহাটের চিতলমারীর দন্ডপ্রাপ্ত দুই শিক্ষকও ষড়যন্ত্রের শিকার!

বাবুল সরদার, বাগেরহাট ॥ বাগেরহাট কারাগার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে জামিনে মুক্ত হবার পরেও চিতলমারীর হিজলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণপদ মহলী ও বিএসসি শিক্ষক অশোক কুমার ঘোষাল (৫৫) প্রায় সারাক্ষণ হাপিত্যেশ করছেন। আহাজারি করে বলছেন, কোন অপরাধ নয় বরং ষড়যন্ত্রে শিকার হয়েছেন তারা। অপপ্রচারকে কেন্দ্র করে সাজা ও চাকুরী থেকে সাসপেন্ড হয়েছেন। স্কুল পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি স্থানীয় প্রভাবশালী এক নেতার আক্রোশের শিকার তারা। আক্রোশ চরিতার্থ এবং সাম্প্রদাকি সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্টকারী চক্র যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে নিরীহ এই দুই শিক্ষককে কারাগারে পাঠিয়েছে বলে এলাকার সাধারণ মানুষও মনে করেন।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে চিতলমারী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনোয়ার পারভেজের ভ্রাম্যমাণ আদালত গত ২৫ এপ্রিল এ বিদ্যালয়ের এই দুই শিক্ষককে ছয় মাসের কারাদন্ড দেন। ওই দিনই তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। এই দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আপীল করা হলে তাঁদের জামিন মঞ্জুর হয়।

চিতলমারী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মো. রবিউল ইসলাম জানান, গত ২৪ এপ্রিল রবিবার দুপুরে হিজলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিএসসি শিক্ষক অশোক কুমার ঘোষাল ১০ম শ্রেণিতে বিজ্ঞান ক্লাস চলাকালে হযরত মুহম্মদকে (স.) নিয়ে কটূক্তি করেন। ঘটনা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার জের ধরে পরদিন সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্কুল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন।

পরে বিষয়টি প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণপদ মহলীকে জানালে তিনি ওই বিএসসি শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে আবারও কটূক্তি করেন। এতে বিক্ষোভকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই প্রধান শিক্ষককে মারধর করে লাইব্রেরিতে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে চিতলমারী থানা পুলিশ তাদের উদ্ধার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে নিয়ে আসেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পারভেজ জানান, সাত শিক্ষার্থীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণপদ মহলী ও বিএসসি শিক্ষক অশোক কুমার ঘোষালকে ছয় মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়। তিনি জানান, শিক্ষকদের স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্যগ্রহণের পর তাদের ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়।

তবে অভিযুক্ত বিএসসি শিক্ষক অশোক কুমার ঘোষাল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, গত ২৪ এপ্রিল সকাল ১০টায় আমার ১০ম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের একটি ক্লাস ছিল। এ ক্লাসে পাঠদানে একটি অধ্যায় ছিল জীবনের জন্য পানি। এ প্রসঙ্গে আমি বলি- পানি সৃষ্টির পরে জীবের সৃষ্টি। এ বিষয়ে লিখিতভাবে আমি জানিয়েছিলাম।

তার ভাষায়, আমি এ বিদ্যালয়ে ২৬ বছর ধরে শিক্ষকতা করি। আমার কোনো ব্যক্তিগত শত্রু নাই। প্রধান শিক্ষকের শত্রুতার কারণেই আমার এ পরিণতি। প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলার সময় আমি পাশাপাশি চেয়ারে বসেছিলাম। কিন্তু আমার ওপর কোনো হামলা হয়নি। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সাবেক সভাপতির দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়।

ওই অভিযুক্ত বিএসসি শিক্ষক অশোক কুমার ঘোষালের বিচার না করে উল্টো তার পক্ষ নিয়ে আবার কটূক্তি কেন করেছেন, জানতে চাইলে হিজলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণপদ মহলী জানান, গত ২৪ এপ্রিল রবিবার বিজ্ঞান ক্লাস নেয়ার সময় বিএসসি শিক্ষক অশোক কুমার রায় নাকি ধর্মনিয়ে কটূক্তি করেছেন। ওই বিষয়ে আমি বা আমাদের অন্য শিক্ষকরা এমনকি অন্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা কিছুই জানি না। ২৫ এপ্রিল সকালে স্কুলে আসলে সহকারী প্রধান শিক্ষক আশীষ কুমার দত্ত বিষয়টি আমাকে অবহিত করেন। তাৎক্ষণিক আমি সভাপতিকে অবহিত করি ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য কাজী অলিউর রহমান, কাজী আশিকুর রহমান, আফতাব হোসেন, মিজানুর রহমানসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে স্কুলের শিক্ষক মিলনায়তনে বসি। কিন্তু আলোচনা শুরুর আগেই আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে বেদম প্রহর করে জামা-প্যান্ট ছিড়ে ফেলে। এরাই অন্যায়ভাবে গুজব তুলে আমাকে ফাঁসিয়েছে। আমি নির্দোষ তা লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম। আমি এ কটূক্তি সম্পর্কে কিছুই জানি না এবং বিএসসি শিক্ষকের কোনো পক্ষ অবলম্বন করি নাই। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। আমার অপরাধ-আমি হিজলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

তিনি বলেন, আমার শিক্ষকদের মধ্যে ও বর্তমান স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মধ্যে কোনো শত্রু নাই। তবে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি সাবেক সভাপতি লিটন কাজী আবার সভাপতি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হতে পারেননি। তাই আমি তার ষড়যন্ত্রের শিকার। আমার পাশের চেয়ারে বসা অভিযুক্ত বিএসসি শিক্ষক অশোক কুমার ঘোষালের ওপর কোনো হামলা হয়নি। কিন্তু আমার ওপর হামলা হয়। আমাকে মারপিট করা হয়।

এ বিষয়ে বর্তমান প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আশীষ কুমার রায় জানান, ঘটনার আগে প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণপদ মহলী স্যার কিছুই জানতেন না। প্রথমেই তিনি আমার কাছ থেকে বিষয়টি শোনেন। তিনি এর সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত নন এবং বিএসসি শিক্ষকেরও পক্ষ অবলম্বন করেন নাই। তাকে অন্যায়ভাবে সাজা দেয়া হয়েছে।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির বর্তমান সভাপতি মো. একরামুল হক জানান, প্রধান শিক্ষক ঘটনার আগের দিন জেনেও কোনো গুরুত্ব দেননি এবং আমাকে অবহিত করেননি। অবহিত করলে এ রকম ঘটনা ঘটতো না। ওই দুই শিক্ষককে ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তে সাময়িক বরখাস্থ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে এ বিষয়ে হিজলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটি সাবেক সভাপতি লিটন কাজী বলেন, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নাই। আমি নিজে সভাপতি হতে চাই নাই এবং বর্তমান সভাপতি আমার মামা বিশিষ্ট সমাজসেবক দানবীর। তার দ্বারা এলাকার মানুষের উপকার হয় বিধায় আমি তাকে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি। তবে ঘটনার দিন তিনি স্কুলে উপস্থিত ছিলেন বলে স্বীকার করেন।

সংলগ্ন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কাজী রবিউল ইসলাম জানান, হিজলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণপদ মহলী একজন আদর্শ শিক্ষক। তিনি অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন না। অনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারায় একটি মহল তার ওপর ক্ষুদ্ধ ছিল।

এ বিষযে সাজাপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী উজ্বলা দাস বলেন, আমার স্বামী ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। আক্রোশের শিকার হয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, অন্যায়ভাবে আমার স্বামীকে মারপিট, সাজা ও সাসপেন্ড করা হয়েছে। যড়যন্ত্রকারীরা ভুল বুঝিয়ে তাকে জেলে পাঠিয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ট তদন্ত দাবী করেন।