২১ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শান্তিনিকেতনের বাইরে কবির প্রথম জন্মদিন

কবিকূলের শিরোমণি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাভাষীরা প্রতিবছর সাড়ম্বরে উদযাপন করে তাঁর জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী। কিন্তু রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপনের চমকপ্রদ তথ্য অনেকেরই অজানা। আর তা হলোÑ শান্তিনিকেতনের বাইরে তাঁর প্রথম প্রকাশ্যে জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানটি উদযাপিত হয় নেত্রকোনায়। কবির ঊনসত্তর বছর পূর্তিতে সে অনুষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদার। ১৯৩০ সালে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটিই যে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানÑ তা স্বীকার করেছেন কবি নিজেই।

শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্ম ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই (১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৪ শ্রাবণ) নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বাহাম গ্রামে। আইনজীবী বাবা রমণী কিশোর দত্ত মজুমদারের ইচ্ছা ছিল, তাঁর ছেলেও বড় আইনজীবী হবে। এ কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে এমএসসি পাস করে আইন বিষয়েও ডিগ্রী নিয়েছিলেন শৈলজারঞ্জন। কিন্তু আইন ব্যবসার বদলে বিশ্বভারতীতে প্রথমে রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়Ñ তাঁর বিজ্ঞানের রসায়ন পরিণত হয়েছিল রাগ রাগিনীর রসায়নে। বিশ্বভারতীতে যোগদানের পর শৈলজারঞ্জন প্রথমে রবীন্দ্রনাথের গানের ভা-ারী দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে এবং পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা নেন। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য তাঁকে নিয়ে যায় খ্যাতির মধ্য গগনে। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে কলকাতা থেকে নেত্রকোনায় আসতেন শৈলজারঞ্জন। তখন স্থানীয় শিল্পীদের রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ অন্যান্য গান, কবিতা আবৃত্তি শেখাতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩০ সালে নেত্রকোনায় উদযাপন করেন রবীন্দ্রজয়ন্তীর প্রথম অনুষ্ঠান। বলাবাহুল্য তখনকার গোঁড়া মুসলিম সমাজের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত বাঙালী হিন্দু সমাজেও রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিরূপ মনোভাব সক্রিয় ছিল। এছাড়া মেয়েরা বাড়িতে গান শিখলেও সাধারণত বাড়ির বাইরে গান পরিবেশন করতে দেয়া হয়নি। কেবল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের একক প্রচেষ্টার কারণেই সম্ভব হয়েছিল সে অসাধ্য কাজটি। ওই সময় নেত্রকোনায় সঙ্গীতানুষ্ঠান করার মতো কোন অডিটোরিয়াম, প্রেক্ষাগৃহ বা মঞ্চ ছিল না। ছিল না বিদ্যুত বা আধুনিক ডেকোরেশন ব্যবস্থাও। শহরের দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ঘরে তক্তপোষ জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয় মঞ্চ। মঞ্চের পেছনে সাদা পর্দা দিয়ে সজ্জিত বেদিতে রাখা হয় কবির প্রতিকৃতি। মঞ্চের চারপাশ সাজানো হয় দেবদারু পাতা আর কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন ফুল দিয়ে। কয়েকটি হ্যাচাক লাইট দিয়ে করা হয় আলোর ব্যবস্থা। প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে ২৫ বৈশাখ অনুষ্ঠানটি করা যায়নি। হয়েছিল দু’দিন পর। অনুষ্ঠানের শুরুতে সম্মিলিত কণ্ঠে পরিবেশন করা হয় বৈদিক গান। এরপর কবিকৃত শ্লোকের বাংলা রূপান্তর ‘যদি ঝড়ের মেঘের মত আমি ধাই চঞ্চল অন্তর’ পরিবেশনের পর মেয়েরা শঙ্খধ্বনিসহ দীপ, ধূপ, ফুল, চন্দন ও মালা দিয়ে বরণ করে কবির প্রতিকৃতিকে। বরণপর্ব শেষ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে পরিবেশন করা হয় সম্মেলক, একক ও যুগ্মগান। মাঝে মাঝে আবৃত্তি করা হয় কবিতা। অনুষ্ঠানের পর ১৯৩০ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত শৈলজারঞ্জন মজুমদারের তত্ত্বাবধানে নেত্রকোনায় রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের ধারাবাহিকতাটি বজায় ছিল। শান্তিনিকেতনের বাইরে নেত্রকোনায় প্রথম জন্মজয়ন্তী উদযাপনের খবরে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। উত্তর ভারতের শৈলাবাস থেকে তিনি শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে লিখেছিলেন এই চিঠিটি:

কল্যাণীয়েষু,

তোমাদের নেত্রকোনায় আমার জন্মদিনের উৎসব যেমন পরিপূর্ণ মাত্রায় সম্পন্ন হয়েছে এমন আর কোথাও হয়নি। পুরীতে একবার আমাকে প্রত্যক্ষ সভায় নিয়ে সম্মান করা হয়েছিল। কিন্তু নেত্রকোনায় আমার সৃষ্টির মধ্যে অপ্রত্যক্ষ আমাকে রূপ দিয়ে আমার স্মৃতির যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, কবির পক্ষে সেই অভিনন্দন আরও অনেক বেশি সত্য। তুমি না থাকলে এই উপকরণ সংগ্রহ করত কে? এ উপলক্ষে বছরে বছরে তুমি আমার গানের অর্ঘ্য পৌঁছিয়ে দিচ্ছ তোমাদের পল্লীমন্দিরের ভোগম-পেÑ এও কম কাজ হচ্ছে না। আমর জন্মদিন প্রতিবছর তোমাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে উৎসবÑ আমাকে এনে দিচ্ছে ক্লান্তির ডালিতে নতুন বোঝা। এবার পাহাড়ে এখনও দেহমনে অবসাদ আসক্ত হয়ে আছে। পৃথিবীজুড়ে যে শনির সম্মার্জনী চলেছেÑ বোধ হচ্ছে তার আঘাত এসে পড়বে আমার ভাগ্যে। দেখা হলে নৃত্যকলা সম্বন্ধে মোকাবিলায় তোমার সঙ্গে আলাপ করব।

ইতি ২৫। ৫। ৩৯ তোমাদের

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে