১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গরিবের ঘরে চাঁদের আলো

স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম ॥ কুড়িগ্রামের সাতজন অদম্য মেধাবী জয় করেছে দারিদ্র্য। চলতি বছর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে আঁধার ঘরে আলো জ্বালিয়েছে তারা। তাদের সবার পরিবারে অভাব অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। শত প্রতিকূলতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তাদের মেধা বিকাশে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে তারা। কিন্তু এখন স্বপ্ন পূরণের মাঝে দেয়াল দারিদ্র্যতা। আকাশ ছোঁয়া এ সাফল্যেও অভিভাবকদের মনে শঙ্কার পাহাড়। দু’চোখে অন্ধকার, তারপরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার দুর্বার সাহস। এখন প্রশ্ন- কে নেবে এদের লেখাপড়ার ব্যয়ভার?

লিপি আক্তার

উলিপুর উপজেলার রামেশ^র শর্মা গ্রামের কৃষি শ্রমিক নূর ইসলামের কন্যা লিপি আক্তার চলতি এসএসসি পরীক্ষায় ম-লের হাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। অভাবের সংসার তিন বেলা খাবারই জোটে না। পড়ালেখার খরচ জুটবে কিভাবে। লিপি ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ হওয়ার প্রধান বাধা দারিদ্র্য।

ইমানা আক্তার ইমু

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে ইমানা আক্তার ইমু। সে চলতি বছর দাশেরহাট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ভাল ফলাফল করেও তার মনে আনন্দ নেই। কারণ বাবা নেই। আয় রোজগারের কেউ নেই। পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম। দু’চোখে শুধু অন্ধকার ভবিষ্যত। মা সামছুন নাহার বেগম ব্র্যাকের আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনে তৈরি পোশাকে হাতের কাজ করেন। এতে মাসে আয় হয় মাত্র ২ হাজার টাকা।

ইমানা আক্তার ইমু জানায়, খাতা, কলম, ড্রেস, কেরোসিন কোন কিছু কেনার টাকা নেই। সব কিছুর জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। পরীক্ষার ফরম ফিলাপও করেছি একইভাবে। কিন্তু আগামী দিনগুলো কিভাবে চলবে এ দুশ্চিন্তা গ্রাস করছে আমাকে।

সাথী সরকার

কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের তালুক কালোয়া এলাকার কৈয়াপাড়ার রতন সরকারের মেয়ে সাথী সরকার দাশেরহাট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। পিতা কৃষি শ্রমিক আর মা গীতা সরকার গৃহিণী। ৫ জনের সংসারে নুন আনতে পান্থা ফুরার অবস্থা।

সাথী সরকার জানায়, প্রায় উপোস করে থাকতে হতো। ছিল না প্রয়োজনীয় বই খাতা কলম। মা বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালে, বড় বোন টিউশনি করে আয় করে। এভাবে চরম কষ্টে দিন কাটে আমাদের। শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও সাথী সরকার স্বপ্ন দেখে একজন প্রকৌশলী হওয়ার।

নিশাত আক্তার ঐশী

নানা প্রতিকূলতার মধ্যে অভাবকে জয় করে নাগেশ্বরী দয়াময়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে নিশাত আক্তার ঐশী জিপিএ-৫ পেয়ে আঁধার ঘর আলোকিত করেছে। পরিবারে অভাব অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। নিশাত জেএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ ৫ পেয়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। নিশাত আক্তার ঐশী ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চায়। কিন্তু এ স্বপ্ন পূরণের মাঝে দেয়াল দারিদ্র্য। তার বাবা আতাউর রহমান ২০০২ সাল থেকে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ। ফলে চার জনের সংসারের ঘানি টানছেন মা শামসুন্নাহার বেগম। দু’চোখে অন্ধকার তার পরেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার দুর্বার সাহস নিয়ে সকলের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছে নিশাত আক্তার ঐশী।

সামিউল ইসলাম সুমন

পিতাহারা সামিউল ইসলাম সুমন নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বলদিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে আঁধার ঘর আলোকিত করেছে। সামিউল ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চায়। সুমনের জন্মের আগে পিতা ইসমাইল হোসেন নিজ বাড়িতে দুষ্কৃতদের হাতে নিহত হন। এরপর মা সুফিয়া বেগম স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিলে সেখানে জন্ম হয় সুমনের। নিজেরা টিউশনি করে যা আয় করে আর অন্যের সহায়তায় কোন রকমে চলে সংসার।

মনসুর আলী

মনসুর আলী দারিদ্র্যকে জয় করে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার বাবা দিনমজুর আব্দুল মতিন অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করে মনসুর ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হতে চায়।

মনসুর বিদ্যালয়ের খরচ যোগাতে অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করেছে। একমাত্র বাড়ির ভিটে ছাড়া কোন সম্পদ নেই।