১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিহ্নিত ৬ জঙ্গীকে ধরতে এবার রেড এ্যালার্ট

চিহ্নিত ৬ জঙ্গীকে ধরতে এবার রেড এ্যালার্ট

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ছয় জঙ্গীর দেশ ত্যাগের ক্ষেত্রে রেডএ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। তাদের ছবিসহ বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে বিমানবন্দর ও সীমান্তে। বিমানবন্দর ও সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। জঙ্গীদের নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দিতে সারাদেশে কম্বিং অপারেশন শুরু হচ্ছে। দেশের ভেতর, সীমান্ত পয়েন্টগুলো ছাড়াও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে চালানো হবে কৌশলী কম্বিং অপারেশন। সম্প্রতি নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বেপরোয়াভাবে নৃশংস হত্যাকা- চালাচ্ছে। এসব মারাত্মক ঘটনা ঘটানোর পরও হত্যাকারীরা সহজেই গ্রেফতার হচ্ছে না। এজন্য হত্যাকারীদের ধরতে এবং জঙ্গী নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দিতেই শুরু হচ্ছে কম্বিং অপারেশন।

বৃহস্পতিবার শরীফ, সেলিম, সিফাত, রাজু, সিহাব ও সাজ্জাদ নামে ৬ জঙ্গীর ছবি প্রকাশ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ছয় জঙ্গীকে ধরিয়ে দিতে পারলে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকাসহ মোট ১৮ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। মোস্ট ওয়ান্টেড এসব জঙ্গীরা নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। পলাতক ছয় জঙ্গী বিগত কয়েক বছরে ব্লগার ও লেখক অভিজিত রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু ও প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যাসহ সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাকা-ে জড়িত।

শুক্রবার ধানম-ির নিজ বাসায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক ও প্রকাশক হত্যায় জড়িত হিসেবে চিহ্নিত ছয় জঙ্গী যাতে বিদেশে পালাতে না পারে, সেজন্য রেডএ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই ছয় জঙ্গীর ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তারা যাতে স্থলবন্দর, নৌপথ কিংবা আকাশপথে কোনভাবেই পালিয়ে যেতে না পারে এজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদী-১ এবং সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২ এর জন্য পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। অপর চারজনকে ধরিয়ে বা তাদের সম্পর্কে তথ্য দিতে দুই লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ফেব্রুয়ারিতে অভিজিত রায় খুনের পর একে একে খুন হন অনলাইন এ্যাকটিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু, সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নীলয়, অভিজিত রায়ের বইয়ের প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন এবং গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমউদ্দিন সামাদ এবং সর্বশেষ কলাবাগানে জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়। কলাবাগানের জোড়া খুনের ঘটনায় দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে রয়েছে শরিফুল ইসলাম শিহাব। তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূতে দেশে সবচেয়ে মারাত্মক শক্তিশালী জঙ্গী কার্যক্রম চালাচ্ছে জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। তারা একের পর এক নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই গ্রেফতার হচ্ছে না। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে নতুন করে জেএমবি আস্তানা গেড়েছে। জেএমবি ওইসব জেলাগুলোতে পীর, বাউল ভক্তসহ এ ধরনের লোকদের একের পর এক নৃশংসভাবে হত্যা করছে। পাশাপাশি জেএমবি রাজধানীতেও এমন ঘটনা ঘটিয়েছে।

আর ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে নৃশংস হত্যাকা- চালাচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। এ জঙ্গী সংগঠনটির টার্গেট ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকসহ এ ধরনের মানুষরা।

সূত্র বলছে, বর্তমানে জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আর্থিক সক্ষমতা পিলে চমকানোর মতো। তাদের অর্থ উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের তরফ থেকে জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে অর্থায়ন করার বিষয়টি স্পষ্ট। এছাড়া আনসারুল্লাহ বিদেশী অর্থায়নে দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

শুধু অর্থ নয়, জঙ্গী সংগঠন দুটির নেটওয়ার্ক পিলে চমকানোর মতো। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। জেএমবির নেটওয়ার্ক এতটা শক্তিশালী হয়নি। জেএমবির কেউ ধরা পড়লে তাদের সহযোগীদের ধরা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কেউ ধরা পড়লে দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়েও তেমন কোন তথ্য মিলছে না। যা জঙ্গী দমন এবং নৃশংস হত্যাকা- বন্ধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বর্তমানে বহু সেলে বিভক্ত হয়ে কাজ করছে। এসব সেলের মধ্যে রয়েছে দাওয়াত, সদস্য সংগ্রহ, ট্রেনিং, টার্গেটকৃত ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র গোলাবারুদ সংগ্রহ ও স্থানান্তর, মিলিটারি, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা ও মিডিয়া সেল। প্রতিটিই সিøপার সেলের আদলে নিজস্ব পদ্ধতিতে কাজ করছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করা হচ্ছে সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে। তবে কে বা কারা জঙ্গী সংগঠনটির নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছে তা এখনও প্রকাশিত হয়নি।

দাওয়াতি সেলের সদস্যরা বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সীদের টার্গেট করছে। যারা শিক্ষিত এবং ইসলাম ধর্মের প্রতি অতিরিক্ত ভক্ত। দাওয়াতি সেলের সদস্যরা তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের অনুসরণ করছে। টার্গেটকৃতদের মধ্যে যারা ইসলাম ধর্মের প্রতি অতিরিক্ত ভক্ত, তাদের দাওয়াত দিচ্ছে। টানা কয়েকদিন দাওয়াত দেয়ার পর তাদের ডাকে যারা সাঁড়া দিচ্ছেন, তাদের একটি তালিকা করছেন। সেই তালিকা থেকে বাছাইকৃতদের বিশেষভাবে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। যারা দাওয়াত গ্রহণ করছেন, তাদেরই কেবল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আস্তানায়। সেখানে তাদের নানা বিষয়ে বয়ান দেয়া হচ্ছে। বয়ানে যারা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, তাদের তালিকাভুক্ত করছে রিক্রোট সেল। এরপর তাদের পাঠানো হচ্ছে ট্রেনিং সেন্টারে। ট্রেনিং সেন্টারে অস্ত্র পরিচালনা, মানুষের শরীর বৃত্তীয় নানা দিক সম্পর্কে শেখানো হচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যারা প্রযুক্তিতে পারদর্শী তাদের কয়েক ধাপ পার করে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে আইটি সেলে।

প্রশিক্ষণ সেলে যারা পারদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হচ্ছেন, তাদের পাঠানো হচ্ছে মিলিটারি সেলে। এই মিলিটারি সেলই হত্যাকা-গুলো সংঘটিত করে থাকে। মিলিটারি সেলকে সহযোগিতা করার জন্য আরও কয়েকটি সেল রয়েছে। এসব সেলের মধ্যে রয়েছে অস্ত্রগোলাবারুদ সংগ্রহকারীদের সেলটি। আর অস্ত্র গোলাবারুদ স্থানান্তরকারী সেলটির মিলিটারি সেলটির সঙ্গে যুক্ত। অস্ত্র গোলাবারুদ সাধারণত যোগাড় করা হচ্ছে সীমান্ত ও চট্টগ্রামের রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী এবং জঙ্গী গ্রুপগুলোর কাছ থেকে। এসব অস্ত্র গোলাবারুদগুলো হত্যাকারীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন অস্ত্র গোলাবারুদ স্থানান্তরকারী সেল।

পরিকল্পনাকারী সেল শুধু কিভাবে হত্যাকা- সংঘটিত করা হবে, সেই পরিকল্পনা করে থাকে। আর টার্গেটকৃত ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। হত্যাকারীদের নিয়ে গঠিত মিলিটারি সেলের সদস্যরা একে অন্যের প্রকৃত নাম পরিচয় জানতে চাইতে পারবে না, এটিই নিয়ম। হত্যাকারীরা ঢাকার আশপাশের এলাকায় অবস্থান করেন। তাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করার লোক রয়েছে। মিলিটারি সেলের সদস্যরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেই অপারেশনে নামেন। জীবিত ফিরলে এটি চরম পাওয়া বলে শেখানো হয়। আর মারা গেলে তারা শহীদের মর্যাদা পাবেন বলে অপারেশনে অংশগ্রহণকারীদের জানানো হয়। এমন বয়ানে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্লগার, প্রকাশক ও লেখকসহ এ ধরনের ব্যক্তিদের একের পর এক নৃশংসভাবে হত্যা করছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মিডিয়া সেল খুবই শক্তিশালী। তারা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মিডিয়ার খবর রাখে। সেলটির বিরুদ্ধে বিদেশী অনেক মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার তথ্য রয়েছে। তবে সে তথ্য সঠিক কিনা তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোন হত্যাকা-ের পর তারা বাংলাদেশ থেকেই সাইট ইন্টেলিজেন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সেই যোগাযোগের সূত্র ধরে সাইট হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে বিবৃতিগুলো দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে সাইটের সঙ্গে যোগাযোগকারী ব্যক্তির সংখ্যা একাধিক। সেসব ব্যক্তির সন্ধান চলছে।

আনসারুল্লাহ আইটি সেক্টর খুবই শক্তিশালী। তাদের প্রযুক্তিগত কৌশল এবং হত্যাকারীরা সিøপার সেলের সদস্য হওয়ায় তাদের কাছ থেকে তেমন কোন তথ্য মিলছে না। যেসব তথ্য মিলছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। মিলিটারি সেলের সদস্যরা কেউ কারও সম্পর্কে কোন তথ্য জানতে চাইতে পারবে না। এটিই নিয়ম। এর ব্যত্যয় হলে ওই সদস্যকে শাস্তি পেতে হয়। তারা টার্গেটকে অন্তত এক মাস আগ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। হত্যাকারীরা সাধারণত ঘটনাস্থল থেকে অন্তত দুই কিলোমিটার দূরে বসবাস করে। ঘটনা ঘটানোর পর তারা বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দিতে কম্বিং অপারেশন শুরু হচ্ছে। এমন অপারেশনের বিষয়ে আগাম কোন কিছু নাও জানানো হতে পারে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তাারা আনুষ্ঠানিকভাবে কম্বিং অপারেশনের বিষয়ে কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।