২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টনের বাজেট আসছে

উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টনের বাজেট আসছে

এম শাহজাহান ॥ প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টনের বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। ছোট থেকে বড়, ধনী থেকে গরিব সবাইকে ভাল রাখার প্রয়াস থাকবে আসছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে। এজন্য কর দেয়ার সামর্থ্যবান প্রতিটি নাগরিককে করের আওতায় এনে বাজেটের আয় বাড়ানো হবে। দেশের প্রতিটি জনগণের জীবনমান উন্নয়নে করা হবে প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টন। এজন্য আসছে বাজেটের সেøাগান হচ্ছে-

‘প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধি সুষম বণ্টনের বাংলাদেশ’। আর ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ রচনা’ সেøাগানে শেষ হচ্ছে চলতি বাজেট। আগামী ২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাতগুলো হচ্ছে- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এর পরই মানব সম্পদ উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হবে। ভবিষ্যত প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে শিশুদের জন্য আলাদা বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। নারী অধিকার রক্ষা এবং অর্থনীতির মূল ধারায় নারীদের নিয়ে আসতে এবারও জেন্ডার বাজেট ঘোষণা করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। পদ্মা সেতুসহ দ্রুত সময়ে বাস্তবায়িত করা হবে মোট দশটি প্রকল্প। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ থেকে রক্ষায় যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এজন্য বিল্ডিং কোড পরিবর্তন করবে সরকার।

এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষায় গ্রীন ব্রিক ফিল্ড তৈরিতে সরকারী সহায়তা বৃদ্ধি পাবে। সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ভাতা জুলাই থেকে প্রদানে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হবে। সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বে পিপিপি বাস্তবায়নে বাজেট বরাদ্দ রাখবে সরকার। বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল থাকছে। দেশী শিল্প সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। গ্যাসের সঙ্কট সমাধানে নতুন করে একশ’টি কূপ খননের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়া হবে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নে ২০০ প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞদের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ দেবে সরকার। ট্যাক্স জিডিপি বাড়াতে আয়কর প্রদানে সক্ষম এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করজালে নিয়ে আসার পদক্ষেপ রাখা হবে।

তবে ঘাটতি কমিয়ে আনতে সব ধরনের ভর্তুকি ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে আগামী বাজেটে। এছাড়া কার্যকর না হওয়ায় জেলা বাজেট একেবারে তুলে দেয়া হচ্ছে। ক্যাপিটাল বাজেট করার পরিকল্পনা থাকলেও নানা সীমাবদ্ধতায় এই বাজেটে সেটি আর আনা হচ্ছে না। জিনিসপত্রের দাম বিশেষ করে ভোগ্যপণ্যের দাম যাতে বাড়তে না পারে সেজন্য বাজেটে বিশেষ কৌশল নেয়া হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি সহজ করা হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য উৎপাদনে ভর্তুকির টাকা কৃষকদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে ধান, পাট ও আখ সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বাজেট প্রণয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাই আগামী বাজেট হবে প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধি সুষম বণ্টনের বাজেট। এজন্য বাজেট প্রণয়নে কতগুলো কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ব্যয়সহ আগামী বাজেটে এডিপির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এতে করে বাজেটের আকার দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। এডিপি বাস্তবায়নে প্রশিক্ষিত ২০০ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া হবে। এতে আগামীতে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে ৩ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ে এনবিআর-নন এনবিআর সব মিলিয়ে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৫শ’ ৫২ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে ঘাটতি থাকার কথা ৯৭ হাজার ২শ’ ৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। ভর্তুকি বাবদ ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২২ হাজার ৯শ’ ৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষিতে যাবে ৯ হাজার কোটি। ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ধরা হয়েছে পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের জন্য। এছাড়া বাজেটে ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রস্তাব করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে গড় মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রাক্কলিত জিডিপি ১৯ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা যা চলতি মূল্যে প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছয়টি খাত ॥ আসছে বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে ৬ খাতে। এগুলো হলো-স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদ্যুত, জ্বালানি, সড়ক, রেলপথ ও বন্দরসহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসৃজন প্রকল্প, সরকারী সেবা প্রদানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন, জলবায়ু মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন এবং বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সুযোগ অধিকতর ব্যবহার ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন রফতানি বাজার অনুসন্ধান। এছাড়া নতুন বাজেটে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে তা হচ্ছেÑ চল্লিশটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জেন্ডার বাজেট রিপোর্ট প্রণয়ন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও এ সংক্রান্ত একটি নতুন ধারণাপত্র প্রণয়ন এবং শিশু বাজেট ও ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা হালনাগাদ করা।

যে পাঁচটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখা হবে ॥ আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এলক্ষ্যে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। জ্বালানি তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা হবে যাতে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পায় এবং মুদ্রার বিনিময় হার কাক্সিক্ষত পর্যায়ে থাকে। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। শীঘ্রই সরকারের এই ঘোষণা কার্যকর করা হবে বলে জানা গেছে।

দ্বিতীয়ত-পদ্মা সেতুসহ ফাস্ট ট্রাক প্রজেক্টসমূহের অর্থায়ন এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর মূল কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া ফাস্ট ট্রাক প্রজেক্টের অন্যান্য প্রকল্প ও দ্রুত বাস্তবায়নে নজরদারি বাড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তৃতীয়ত-রাজস্ব খাতে পরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যার মধ্যে রয়েছে, ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন এবং ভ্যাট আদায় জোরদার করা। কর প্রশাসনের চলমান সম্প্রসারণ এবং অটোমেশন অব্যাহত রাখা। কর ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি ও কর অবকাশ প্রত্যাহার করা, কর প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ই-পেমেন্ট এবং ই-ফাইল চালুকরণ, আমদানি শুল্ক এবং আয়কর রেয়াতি না দেয়া। চতুর্থত ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং রফতানি বৃদ্ধির প্রয়াস জোরদার করাসহ নতুন বাজার অনুসন্ধান।