২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মমতা ক্ষমতায় ফেরায় খুলতে পারে তিস্তা চুক্তির জট

মমতা ক্ষমতায় ফেরায় খুলতে পারে তিস্তা চুক্তির জট

তৌহিদুর রহমান ॥ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পর এবার তিস্তা চুক্তির জট খুলতে পারে। তিস্তা ইস্যুতে ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এই আশঙ্কায় তিস্তা চুক্তি নিয়ে অগ্রসর হয়নি তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচন শেষে এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের এবারের বিশাল জয়ের নেপথ্য নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। বামফ্রন্টের রিজার্ভ ভোট তৃণমূলে চলে যাওয়া, তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রকল্প, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, সারদা ও নারদা কা-ের দুর্নীতির অভিযোগ কৌশলে এড়াতে সক্ষম হওয়া ইত্যাদি কারণে তৃণমূল কংগ্রেস জয় পেয়েছে। সীমান্ত চুক্তির পরে ঢাকা-দিল্লী তিস্তা চুক্তি করতে আগ্রহী। এ চুক্তির লক্ষ্যে ঢাকা-দিল্লী একমত হলেও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতার কারণেই তা অগ্রসর হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি মমতার সঙ্গে তিস্তা চুক্তি বিষয়ে আলোচনাও করেছেন। তবে মমতা দিল্লীকে তখন জানিয়েছিলেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিস্তা নিয়ে অগ্রসর হতে রাজি নয়। কেননা এ চুক্তির ফলে ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করেছিলেন মমতা। তবে এবার নির্বাচন শেষ হয়েছে। এ নির্বাচনে ২১১ আসন নিয়ে এককভাবে ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূল। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের পর আবার তিস্তা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হবে ঢাকা-দিল্লী। এক্ষেত্রে মমতাকে ম্যানেজ করেই তিস্তা চুক্তি করা হবে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ১১-১২ আগস্ট নয়াদিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সে সময় মমতা জানিয়েছিলেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিস্তা চুক্তি করতে আগ্রহী নন তিনি। নির্বাচনের পর এ বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার আশ্বাস দেন মমতা।

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ মুহূর্তে আপত্তি তোলায় বিষয়টি আটকে যায়। এর প্রায় সাড়ে তিন বছরের মাথায় গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা এসে শীঘ্রই তিস্তার জট খোলার আশা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পর একই বছরের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় মমতার সঙ্গে আলোচনা শুরু হলে পুরনো কাঠামোতে তিস্তা চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আবারও বেঁকে বসেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ঢাকা সফরে তিস্তা চুক্তি না করার আশ্বাস দিয়েই প্রধানমন্ত্রী মোদি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে সফরে আসতে রাজি করান।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সফরে এসে তিস্তার বিষয়ে তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে বলেন। তবে তিনি আস্থা রাখতে বললেও তাঁর বিরোধিতার কারণেই ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি হতে হতেও আটকে যায়। ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সফরে আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সরিয়ে নেন মমতা। তিনি তখন বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে এ চুক্তিকে তিনি সমর্থন করতে পারেন না। তবে মমতা প্রকাশ্যে এ কথা বললেও একাধিক ঘরোয়া বৈঠকে নির্বাচনের পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে অগ্রসর হবেন বলে জানিয়েছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল বিজয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন জানিয়ে পাঠানো বার্তায় বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও মূল্যবোধের সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিশাল জয় পাওয়া নিয়ে সে দেশে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এ জয়ের নেপথ্যের কারণ খোঁজা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএম জোট বাঁধায় বামফ্রন্টের রিজার্ভ ভোটের একটি বড় অংশ চলে গেছে তৃণমূলের দিকে। কারণ বাম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এ জোটের বিরোধিতা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জোট ভোটারদের আস্থা স্থাপন করতে পারেনি।

এছাড়া তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য মমতা কিছু সহায়তা প্রকল্প নেন। এর মধ্যে একটি প্রকল্প হলো ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প। এর আওতায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের ৭৫০ টাকা করে বৃত্তি দেয়া হয়। আরেকটি প্রকল্প ছিল ‘সবুজ সাথী’। এর আওতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে সাইকেল বিতরণ করে তৃণমূল সরকার। তরুণ ভোটারদের ভোট টানতে এ দুই প্রকল্প কাজে এসেছে। এছাড়া ‘যুবাশ্রী’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বেকার তরুণদের অর্থ সহায়তা দেয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গের গরিবদের খাদ্য নিরাপত্তা দেয়া ছিল মমতার অন্যতম প্রতিশ্রুতি। ওই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি বেশ সফল হয়েছেন। ‘খাদ্য সাথী’ নামে একটি প্রকল্পের অধীন রাজ্যের প্রায় সাত কোটি মানুষের মধ্যে কেজিপ্রতি দুই রুপী মূল্যে গম বিতরণ করা হয়েছে। এ সাত কোটির মধ্যে খরাকবলিত, বন্যাকবিলত ও পাহাড়ী জনগণ রয়েছে। স্বল্পমূল্যে গম বিতরণের বিষয়টি ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্যের নির্বাচন কমিশনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য চাপ দেয়া হয়। বিষয়টিকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করেন মমতা। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্র তাকে হটাতে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করছে। মমতার অভিযোগ ছিল, কেন্দ্র সরকার রাজ্যে জরুরী অবস্থার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচন করতে চাইছে। এছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধেও তিনি অভিযোগ তোলেন। কেন্দ্র সরকারের পক্ষে পুলিশের একাংশ কাজ করছে বলে দাবি করেন মমতা।

অপরদিকে সারদাকা- ও নারদাকা-ের দুর্নীতির অভিযোগ কৌশলে জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন মমতা। এসব দুর্নীতির জন্য তিনি বিরোধীদের দায়ী করেন এবং তার জনপ্রিয়তাকে ক্ষুণœ করার জন্য এসব নিয়ে টানাটানি করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের দুর্নীতি নিয়ে রাজ্যজুড়ে যখন আলোচনা চলছিল, তখন নির্বাচনী প্রচারে মমতা ঘোষণা করেন, ‘সব আসনে আমিই প্রার্থী। আপনারা আমাকে ভোট দিন।’ এর মাধ্যমে তিনি জনগণের মধ্যে আস্থা স্থাপনে সক্ষম হয়েছেন।