১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুর্নীতির কারণে বেহাল বিআরটিসি ॥ শুদ্ধি অভিযান শুরু

দুর্নীতির কারণে বেহাল বিআরটিসি ॥ শুদ্ধি অভিযান শুরু

রাজন ভট্টাচার্য ॥ দুর্নীতি রোধে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে (বিআরটিসি)। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এ অভিযান চলছে। সড়কমন্ত্রী নিজেই অনেক সময় অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে সংস্থার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, দুর্নীতির কারণে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না বিআরটিসি। দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানের ২১টি ডিপোর অবস্থা বেহাল। তাই যে কোন মূল্যে বিআরটিসির দুর্নীতি রোধ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে মন্ত্রণালয়।

বসে থাকা গাড়ি চলাচল দেখিয়ে বছরের পর বছর বিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে কোটি টাকার বেশি। পুরাতন মবিল দেখিয়ে নতুন মবিলের বিল, নিম্নমানের টায়ার সংগ্রহ করে বেশি দামের বিল করে অর্থ আদায়। ১৫ হাজার টায়ারের বিল করা হয়েছে ২১ হাজার করে। এসব বিল ঠিকঠাক রাখার জন্য স্টোরে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মীয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ রকম অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বিআরটিসি কল্যাণপুর ডিপো ম্যানেজার মোঃ মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি করে অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। সম্প্রতি বিআরটিসি সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কমলাপুর ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ পাঠ করে শোনান খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজেই।

মন্ত্রণালয় ও বিআরটিসি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের ২১ ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া জরুরী। এতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ফেঁসে যেতে পারেন অনেকেই। খোদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কথা থেকেও ডিপো ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির আভাস মিলেছে। জানা গেছে, ২৫ কোটি টাকায় কেনা বিআরটিসি ভলভো ৫০টি বাস অল্প দিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে; যা রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের বোঝা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন বাস্তবতায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এক ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে দুর্নীতির তদন্ত। ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হলে প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দিয়ে তদন্ত করানোর কথা বলে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রীর নির্দেশে ইতোমধ্যে বিআরটিসির পরিচালক টেকনিক্যাল কর্নেল এ আর পারভেজ মজুমদারকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে কল্যাণপুর ডিপো ম্যানেজার মনিরুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, ইতোমধ্যে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছেন। তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা সঠিক নয় বলে জানান তিনি।

প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তদন্তের বিষয়কে স্বাগত জানিয়েছেন অন্য ডিপো ম্যানেজাররাও। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কমলাপুর বিআরটিসি ডিপো ম্যানেজার নায়েব আলী জনকণ্ঠকে বলেন, এই অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। শত্রুতার জের ধরে কল্যাণপুর ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এতে যা লেখা ছিল তাই বৈঠকে পড়ে শুনিয়েছেন তিনি। নায়েব আলী বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে ইচ্ছে করলে প্রতিষ্ঠান তদন্ত করতে পারে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি তদন্তে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পাওয়া যাবে না।

বৈঠকে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) ২১টি ডিপো এখন দুর্নীতির একমাত্র কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। আর দুর্নীতির হোতা হচ্ছেন ডিপোর ম্যানেজার। শুধু তাই নয়, অর্থের অভাবে যে বিআরটিসির ২১টি ডিপো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে তা জানতেনই না মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি দূর হলেই বিআরটিসির উন্নতি হবে।

এদিকে জোয়ার সাহারা ও খিলক্ষেত বিআরটিসি ডিপো ম্যানেজার ও বাসের বেহাল চিত্রের অভিযোগ পান মন্ত্রী নিজেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ পেয়ে আট মে সকালে মন্ত্রী ছুটে যান বিভিন্ন ডিপোতে। বিআরটিসি বাসের ফ্যান নষ্ট, বাসে ময়লা আবর্জনা, গ্লাস ভাঙ্গাসহ নানা অভিযোগের সত্যতা মেলে। এতে ক্ষব্ধ মন্ত্রী বিআরটিসির ডিপো ম্যানেজার নায়েব আলীকে বরখাস্ত করেন। এরপর মন্ত্রী একে একে আটটি বিআরটিসি বাসে ওঠেন। যাত্রী ও চালকের কাছ থেকে নানা অভিযোগ শুনে তা সমাধানের উদ্যোগ নেন।

৬৪ জেলার মধ্যে ২১ ডিপো ॥ ৬৪ জেলার মধ্যে রাষ্ট্রীয় এই পরিবহন সেবা সংস্থাটির ডিপোর সংখ্যা মাত্র ২১টি। এর মধ্যে ১৯টি বাস ডিপো ও দুটি ট্রাক ডিপো রয়েছে। বিভিন্ন সময় এসব ডিপো পরিচালনায় ম্যানেজাররা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন এমন অভিযোগ আসে বিআরটিসি সদর দফতর থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও। সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন সংস্থাটির বাস ডিপোর মধ্যে রয়েছে দিনাজপুর, বরিশাল, খুলনা, রংপুর, পাবনা, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, সোনাপুর, কুমিল্লা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, উথলী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কল্যাণপুর, জোয়ার সাহারা ও মতিঝিল।

বিআরটিসির কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, রাজধানীর ২৪টি রুটে বিআরটিসির বাস চলাচল করছে। এছাড়াও চট্টগ্রামের চারটি রুটে বিআরটিসি বাস চলাচল করে। আন্তঃজেলা রুটে ৮২৭টি বাস চলাচল করে। রয়েছে ট্রাকও। এসব পরিবহন দেশের ২১টি ডিপো থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গত মাসে বিআরটিসির কার্যালয়ে ডিপো ম্যানেজার ও সদর দফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ডিপো ম্যানেজারদের কর্মকা-ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, অর্থের অভাবে ডিপোগুলোতে বাস মেরামত করা যাচ্ছে না, এ খবর আমরা জানতাম না। একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে এটা তো প্রত্যাশিত নয়। এত খাটাখাটি করছি কিন্তু রেজাল্ট পাচ্ছি না। জনগণ যদি রেজাল্ট না পায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের শুদ্ধতা থাকে না।

মন্ত্রী জানান, এসব ডিপো ম্যানাজারের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ২৫ কোটি টাকার ৫০টি ভলভো বাস অচল হয়ে গেছে। মেরামত করে চালানোর জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু কোন ঠিকাদারের সাড়া নেই। ফলে ৫০টি বাসই আজ বিআরটিসির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন বিআরটিসি বাস অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন ও অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অনেক গাড়িতে ফ্যান লাইন নেই। নারীদের উঠতে দেয়া হয় না। সকালের দিকে দু’একটি ট্রিপ দিয়ে বিকেলে ইজারাদারদের হাতে তুলে দেয় ডিপো ম্যানেজাররা। সব সমস্যা ডিপোর মধ্যেই। এটা হতে দেয়া হবে না। কেউ বিআরটিসিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জানতে চাইলে বিআরটিসি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী একজন কর্নেলের নেতৃত্বে কল্যাণপুর ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে। সকল ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর একটি ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। বাস্তবতা হলো, তদন্ত করলে প্রমাণ লাগে। আমাদের হাতে কল্যাণপুর ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণ আছে। এখন কমলাপুর ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্ত কিভাবে হবে। আমাদের হাতে তো কোন প্রমাণ নেই। তাছাড়া যারা দুর্নীতি করে তারা তো গেলেই প্রমাণ দেবেন না। তাই একজনকে তদন্ত কমিটির প্রধান করে ইতোমধ্যে তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত তা শেষ করার কথা জানান বিআরটিসি চেয়ারম্যান।