২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পবিত্র শব-ই-বরাতের মাহাত্ম্য

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

১৪ শা’বান দিবাগত রাত অর্থাৎ শা’বান মাসের ১৫ তারিখ রাতকে ফারসীতে বলা হয় শব-ই-বরাত অর্থাৎ বরাতের রাত এবং আরবীতে বলা হয় লায়লাতুল বারাআত অর্থাৎ নিষ্কৃতির রাত বা মুক্তির রাত। হাদিস শরীফে এই রাতকে বলা হয়েছে লায়লাতুন্ নিসফি মিন শাবানÑ মধ্য শা’বানের রাত। কুরআন মজীদের সূরা দুখানে লায়লাতুল মুবারাকা নামে যে প্রাচুর্য রজনীর উল্লেখ আছে তার সঙ্গে হাদিস শরীফে লায়লাতুন্ নিসফি মিন শা’বানের বৈশিষ্ট্যের হুবহু মিল রয়েছে। ইমাম গাযালী (রহ) একে ঈদুল মালায়েকা অর্থাৎ ফেরেশতাগণের ঈদ বলেছেন।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : এই রাতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদী আমার আদেশক্রমে নির্ধারিত হয়। সুরা দুখান। (আয়াত-৫)

মধ্য শা’বানের এ রাতের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বেশ কয়েকখানি হাদিস রয়েছে। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলয়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মধ্য শাবানের রাতে হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্্ সালাম আমাকে বললেন : আপনার মাথা আকাশের দিকে তুলুন, কেননা এ রাত খুবই প্রাচুর্যম-িত। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম : এতে কোন্্ ধরনের প্রাচুর্য আছে? উত্তরে হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্্ সালাম বললেন : আপনার মাথা আকাশের দিকে তুলুন, কেননা এ রাত খুবই প্রাচুর্যম-িত। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম : এতে কোন ধরনের প্রাচুর্য আছে? উত্তরে হযরত জিবরাঈল আলায়হিস সালাম বললেন : এই রাতে আল্লাহ তা’আলা রহমতের তিন শ’ দরজা খুলে দেন। অন্য একখানি হাদিসে আছে, মধ্য শা’বানের রাত শুরু হলে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমান থেকে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ঘোষণা করতে থাকেন এমন কি কেউ আছ যে আমার কাছে ক্ষমা চাও? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। এমন কি কেউ আছ যে আমার কাছে বিপদ থেকে মুক্তি চাও? আমি তার সমস্ত বিপদ-আপদ দূর করে দেব। এমন কি কেউ আছ যে আমার কাছে জীবিকা চাও? আমি তাকে অঢেল জীবিকা দান করব। এমন কি কেউ আছ? এমন কি কেউ আছে?

এমনিভাবে ফজর হওয়া পর্যন্ত ঘোষণা অব্যাহত থাকে।

এই হাদিস শরীফ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শব-ই-বরাত হচ্ছে আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে কোন কিছু চাওয়ার রাত। এ রাতে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ্্ তা পূরণ করেন।

মধ্য শা’বানের এই রাতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম জান্নাতুল বাকি নামক করবগাহে যেয়ে খাসভাবে জিয়ারত করতেন।

এক মধ্য শা’বানের রাতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মু’মিনীন হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহার হুজ্্রা শরীফে প্রবেশ করে কোনদিকে নজর না দিয়ে সোজা জায়নামাজে নফল সালাত আদায় করার পর সিজদারত অবস্থায় উম্মতের গুনাহখাতা মাফ করে দেবার জন্য আল্লাহর মহান দরবারে ক্রন্দন করতে লাগলেন। হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্্হা ভাবলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বোধ হয় তাঁর প্রতি নাখোশ হয়েছেন, তাই তিনি নম্রস্বরে বললেন : হে আল্লাহর রসুল। আমার আব্বা-আম্মা আপনার জন্য কুরবান হোক! আমি এখানে উপেক্ষিতা হালতে আপনার জন্য ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়েছি আর আপনি ওখানে জায়নামাজে গিয়ে কান্নাকাটি করছেন। প্রিয় নবী সাল্লøাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম সিজদা থেকে মাথা তুলে হযরত ‘আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহাকে সম্বোধন করে বললেন : হুমায়রা! তুমি কি জানো আজ কোন্ রাত? উত্তরে হযরত আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্্হা বললেন, আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুলই তা জানেন। তখন আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন : এটা হচ্ছে লায়লাতুন নিসফি মিন শা’বান-মধ্য শা’বানের রাত। এ এমন এক রাত যাতে আল্লাহর কাছে কোন দুয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। কারও গুনাহ যদি পাহাড় সমানও হয় আল্লাহ তা মাফ করে দেন।

অন্য এক হাদিসে আছে : এ বছর যত মানব সন্তান জন্মাবে এবং যত মানব সন্তানের মৃত্যু হবে তা এই রাতে লিপিবদ্ধ করা হবে আর জীবিকা বরাদ্দ করা হবে।

মূলত মধ্য শা’বানের এ রাতের মাহাত্ম্য বলে শেষ করা যাবে না। এ রাতকে সৌভাগ্য রজনীও বলা হয়। আগামী এক বছরের হায়াত, মউত, রিয্ক, দৌলত, উত্থান-পতন প্রভৃতি তাবত তকদির এ রাতে নির্ধারণ করা হয়। তাই এ রাতে বেশি বেশি ইবাদত, বন্দেগী, যিক্র-আযকার মীলাদ-কিয়াম ইত্যাদির মাধ্যমে কাটানো উচিত। আল্লামা ইকবাল বলেছেন : খুদীকো কর, এত্না বুলন্দ কি খোদ খোদা তকদির লিখনে ছে পহেলে পুঁছে বান্দা তেরে রিদা কিয়া হ্যায় : তুমি তোমার নিজেকে এতো সমুন্নত করো যে, আল্লাহ্ তকদির লিপিবদ্ধ করার আগে তোমাকে জিজ্ঞাসা করেন, বান্দা তোমার চাওয়ার কি আছে? আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আমি কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করি না, যতক্ষণ না সেই জাতি নিজের অবস্থার পরিবর্তন করে। (সূরা রা’দ : আয়াত ১১) আমল দ্বারা নিজের অবস্থার পরিবর্তন করার মহাসুযোগ আসে লায়লাতুল-নিসফি মিন্্ শাবান-এ।

একখানা হাদিসে আছে, প্রিয় নবী (সা.) লায়লাতুন্ নিসফি মিন শা’বান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন : এই রাতে দ-ায়মান হবে এবং দিবসে সিয়াম পালন করবে। এখানে দ-ায়মান হওয়া মানে সারারাত জেগে থেকে ইবাদত-বন্দেগী করা বুঝানো হয়েছে।

শব-ই-বরাত বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষের সাংস্কৃতিক বলয়ে এক সুদৃঢ় অবস্থানে অবস্থিত। এই রাতকে কেন্দ্র করে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে, পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে হালুয়া রুটি ও নানা ধরনের মিষ্টান্ন বা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ আদান-প্রদানের মধ্যে এক গভীর সৌভ্রাতৃত্ব বন্ধনের শোভা বিভাসিত হয়। এ রাতে মসজিদ ও খানকাসমূহে মুসল্লীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। কবরস্থানে জিয়ারতকারীদের ভিড় জমে। মনে রাখতে হবে কবরে ফুল দেয়া, আগরবাতি জ্বালানো, কবর সিজ্্দা কঠিন গুনাহর কাজ। পটকা ফোটানো, আতশবাজি জ্বালানোও শরীয়তবিরোধী কাজ।

যারা এ রাতে ইবাদত-বন্দেগী না করে সারারাত হৈ-হুল্লোড় ও আনন্দ-ফুর্তি করে রাত অতিবাহিত করে তাদের জন্য এ রাত সৌভাগ্য রজনী হয় না। অতএব আমাদের এই রাত শরীয়তসম্মত উপায়ে পালন করা উচিত।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.), সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।