২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উৎপাদন বিনিয়োগ ও জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নের তাগিদ

  • এনটিভি ও এফবিসিসিআইয়ের ‘কেমন বাজেট চাই’ সংলাপে বক্তারা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ আসন্ন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য উৎপাদন, বিনিয়োগ ও জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। জোর দেয়া হয়েছে বাজেট বাস্তবায়নে। এজন্য গ্যাস, বিদ্যুত, বন্দর, রাস্তাঘাটসহ সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঋণের বিপরীতে সুদহার কমিয়ে আনা, রফতানি খাতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। ভ্যাট আইন সংশোধনসহ প্যাকেজ ভ্যাট বহালের কথা বলেছেন ব্যবসায়ীরা। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও এর সুফল পাচ্ছে না শিল্পোদ্যোক্তারা। এর কারণ সঞ্চালন লাইনে সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে আগামী বাজেটে বিশেষ কৌশল গ্রহণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা, বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের সর্বোচ্চ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে নতুন করদাতা খুঁজে বের করাসহ আরও বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এনটিভি ও এফবিসিসিআইয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘কেমন বাজেট চাই-২০১৬-১৭’ শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন- অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বিজিএমইএ’র সভাপতি মোঃ সিদ্দিকুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ।

এছাড়া ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী-চেম্বার নেতৃবৃন্দ, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। অনুষ্ঠানটি রাত সোয়া ৮টায় সরাসরি সম্প্রচার করে এনটিভি। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ। নিউইয়র্ক ও চট্টগ্রামে আলাদা স্টুডিওতে মূল অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে সরাসরি আলোচনার ব্যবস্থা করা। ঢাকার বাইরে এ দুটি স্টুডিওতে অংশ নেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। এ অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তনপর্বে অংশ নিয়ে অধিকাংশ ব্যবসায়ী বলেন, অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হচ্ছে না। এছাড়া বিনিয়োগের প্রধান বাধা উচ্চমাত্রার সুদহার। এ সুদহার কমিয়ে আনতে হবে। এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদের ঘোষণা অনুযায়ী সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার দাবি জানান উদ্যোক্তারা।

তাঁরা বলেন, উচ্চমাত্রার সুদের হারের কারণে দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এছাড়া জমির স্বল্পতা, গ্যাস, বিদ্যুত সমস্যা এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন না হওয়ার কারণে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ দেশে হচ্ছে না। এ কারণে বাড়ছে না বিনিয়োগ। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে না। তাই আগামী বাজেটে সুদহার কমানোর আরও কোন পদক্ষেপ থাকছে কিনাÑ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোরও পরামর্শ দেয়া হয়।

ব্যবসায়ীদের এসব প্রশ্ন ও পরামর্শের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার সরাসরি সুদের হার বাড়ানো বা কমানোর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। এটা আপনারাই করেন। আপনারা, ব্যবসায়ীরা একদিকে ঋণ নেন, আবার যখন ঋণ দেন তখন আপনারাই সুদের হার বেশি করে নির্ধারণ করেন। তিনি বলেন, তারপরও বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। পলিসি সহায়তা দিয়ে সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারে পৃথিবীর ইতিহাসে এখনও বাংলাদেশের বাজেট ছোট। তিনি বলেন, বাজেট সর্বদা উচ্চাভিলাষী হওয়া প্রয়োজন। তাই আগামী বাজেটের আকারও বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির মাত্র ২০ ভাগ সরকারের হাতে, বাকি ৮০ শতাংশ বেসরকারী খাত পরিচালনা করছে। তাই বেসরকারী খাতকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হবে। এজন্য আসছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে রফতানি খাতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হবে।

ব্যবসায়ী ও স্টেকহোল্ডারদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, আগামী বাজেটে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সৃষ্টির ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পোশাক খাতের পাশাপাশি উদীয়মান চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, জাহাজ, কৃষিজাত পণ্য, ফার্নিচার, কাপড়, জুতার মতো শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এসব খাত বিকাশে প্রণোদনা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ৫০ লাখ মানুষকে ভাতাসহ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ বলেন, উচ্চাভিলাষী বাজেট হলেও এটির প্রয়োজন আছে। সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে। গত দুই বছর দেশে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ আসেনি। এজন্য অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাজটে বড় বড় প্রকল্প আনা হয়েছে। মাথাপিছু আয় এত কম হওয়ার পরও বাংলাদেশেই অধিকসংখ্যক মানুষ শহরে বসবাস করছেন, নগরবাসী হয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন প্রচেষ্টার ফলে এটা সম্ভব হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুত খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা কারিগরি বিষয়। তারপরও বলব, এটা এত দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, আসছে বাজেট হবে ব্যবসাবান্ধব বাজেট। সরকার ব্যবসা করে না। ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছে। তাই এমন বাজেট দেয়া হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা খুশি হন। তিনি বলেন, প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্টস শিল্প উন্নয়নে প্রণোদনা প্রদান অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। বিএনপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওই সময় দেশে বিদ্যুত উৎপাদনে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখন প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করা হচ্ছে। রফতানি হচ্ছে ৩৪ বিলিয়ন ডলার। দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাজেট ছিল মাত্র ৮৯ হাজার কোটি টাকার আর এখন ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেয়া হচ্ছে। ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। এনবিআরের টার্গেট এবং এডিপি বাস্তবায়নের তফাৎ ক্রমশ বাড়ছে। এটা কমিয়ে আনতে হবে। বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাস্তবায়নযোগ্য বিনিয়োগ ও জনবান্ধব বাজেট চাই। বিশেষ করে পোশাক খাত উন্নয়নে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর এ্যাকোর্ড এবং এ্যালায়েন্সের কারণে গত দু’বছর বিনিয়োগ হতে পারেনি। এজন্য এবারের বাজেটে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখা প্রয়োজন। এছাড়া কর্পোরেট ট্যাক্স এবং উৎসে কর কমানোর দাবি করেন তিনি। তিনি কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত ও গ্যাসের দাবিও করেন। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ বলেন, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চাঁদাবাজির কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। যদিও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দ্রব্যমূল্য এখনও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে রোজা সামনে রেখে যাতে জিনিসপত্রের দাম না বাড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণয়ন ও নতুন ভ্যাট আইন সংশোধন করার কথাও তিনি বলেন।

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, রফতানি খাতে বিদ্যমান প্রণোদনা, নগদ সহায়তা এবং কর অবকাশ সুবিধা বহাল রাখতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার পরামর্শ দেন এ ব্যবসায়ী নেতা। সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বিনিয়োগ খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এটা কমাতে না পারলে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ দেশে আসবে না। সেলিমা আহমেদ বলেন, বাজেটে নারীদের জন্য ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয় ঠিকই, কিন্তু উদ্যোক্তারা তা ঠিকমতো পান না। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারিমানের কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারেÑ এমন কোন পদক্ষেপ যাতে বাজেটে না নেয়া হয়। আরেকজন নারী উদ্যোক্তা জৈব কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বারোপ করে সরকারী সহযোগিতা কামনা করেন। এছাড়া অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেনÑ এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক শফিকুল ইসলাম ভরসা, শামীম আহসান, বারভিডার সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ ডন প্রমুখ।

উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী, সহ-সভাপতি দেওয়ান সুলতান আহমেদ প্রমুখ। এছাড়া আলোচকরা আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেন। বিনিয়োগের জন্য জমি, বিদ্যুত ও গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তারা। অনেকেই জ্বালানি তেলের দাম কমানোর প্রস্তাব দেন। কেউ কেউ বাজেটে দেশীয় শিল্পের সংরক্ষণের কথা বলেন। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়ানো, কৃষিতে আরও মনোযোগ দেয়া, শিক্ষার গুণগতমান বাড়ানো, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশেষ মনোযোগ দেয়াসহ নানা প্রস্তাব আসে।

এই মাত্রা পাওয়া