২১ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই ঘন্টায়    
ADS

রোয়ানুতে ক্ষয়ক্ষতি কম ॥ দুর্বল হয়ে উপকূল অতিক্রম

রোয়ানুতে ক্ষয়ক্ষতি কম ॥ দুর্বল হয়ে উপকূল অতিক্রম
  • সারাদেশে ২৪ জনের প্রাণহানি, আহত শতাধিক ;###;বিভিন্ন স্থানে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত ;###;মেঘনায় কার্গোডুবি- ৪ শ্রমিক নিখোঁজ ;###;৯ ঘণ্টা পর নৌ চলাচল শুরু;###;নোঙ্গর ছিঁড়ে সন্দ্বীপ চ্যানেলে বিএসসির জাহাজ আটকা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ভারি বৃষ্টি ঝরিয়ে দুর্বল হয়ে শনিবার বিকেলে উপকূল অতিক্রম করেছে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। এ সময় ঘূর্ণিঝড়টি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ো হাওয়ায় ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে ও ঘর ধসে কমপক্ষে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। ঘরবাড়ি ও সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রবল বাতাসের তোড়ে ভোলায় মেঘনা নদীতে বালিভর্তি দুটি কার্গো ডুবে চার শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছেন। উপকূলীয় এলাকার নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে চার ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। সারাদেশে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হয়। উপকূল অঞ্চলে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। সহস্রাধিক মাছের পুকুর ও ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। নোঙ্গর ছিঁড়ে সন্দীপ চ্যানেলে আটকা পড়ে বিএসসির জাহাজ। ঘূর্ণিঝড়ে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ররিবারের এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বিমান ও জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত রাজধানীতেও মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হয়। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে নেয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। স্টাফ রিপোর্টার, নিজস্ব সংবাদদাতা, আবহাওয়া অধিদফতর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে উপকূলীয় অঞ্চলের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রসমূহ জানায়, গাছচাপা, টিনের চাল পড়ে, ঘর ধসে, আম কুড়াতে ও জোয়ারের পানিতে ভেসে গিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৩, সীতাকু-ে ২, বাঁশখালীতে ৯, ভোলায় ২, পটুয়াখালীতে ১, হাতিয়ায় ৩, কক্সবাজারে ৩ ও লক্ষ্মীপুরে ১ জন মারা গেছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম এলাকার ওপর দিয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করার পর বৃষ্টি ঝরিয়ে ক্রমশ দুর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু পরিণত হয়েছে স্থল নিম্নচাপে। ঝড় কেটে যাওযায় সমুদ্রবন্দরগুলোকে বিপদ সংকেত নামিয়ে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদফতর। আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ শনিবার সন্ধ্যা সাতটায় এ তথ্য জানান।

আবহাওয়াবিদরা জানান, মোটামুটি ৩০০ কিলোমিটার ব্যাসের এই ঘূর্ণিঝড় বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম উপকূলের সন্দীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, সীতাকুন্ড ও ফেনী উপকূল দিয়ে স্থলভাগে উঠে আসে। এরপর বৃষ্টি ঝরাতে ঝরাতে সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাংলাদেশ অঞ্চল পেরিয়ে যায়। আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি প্রচুর বৃষ্টি ঝরিয়ে দুর্বল হয়ে স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যায় সেটি অবস্থান করছিল ত্রিপুরা-মিজোরাম এলাকায়। সামছুদ্দিন আহমেদ জানান, ঝড় সরে গেলেও সাগর উত্তাল থাকায় এবং বাতাসের গতি বেশি হওয়ায় সতর্কতা হিসেবে সমুদ্র বন্দরের জন্য ৩ নম্বর সংকেত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হলে সতর্কতা সংকেতও তুলে নেয়া হবে।

আবহাওয়া অধিদফতর ইতোমধ্যে জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর বিপদ কাটলেও এর প্রভাবে আরও দুই দিন বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলসহ দেশের প্র্রায় সব জায়গায় হাল্কা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। উপকূলীয় এলাকার নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে চার ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে কয়েক শ‘ ঘর।

চট্টগ্রাম ॥ চট্টগ্রামে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানতে শুরু করে সকাল এারোটার দিকে। ধীরে ধীরে বাতাসের গতিবেগ বাড়তে থাকে। যার গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত ওঠানামা করতে থাকে। শনিবার বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূল জুড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলার তিনটি উপজেলা আনোয়ারা, বাঁশখালী ও সীতাকুন্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে পাহাড় ধসে, গাছ চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে মা-ছেলে ও মহানগরীতে আম কুড়াতে গিয়ে টিনের চাল পড়ে প্রাণ হারিয়েছে আরেক কিশোর। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় আহতের সংখ্যাও অনেক। ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপক আঘাতে বহির্নোঙ্গর থেকে নোঙ্গর ছেড়ে দুটি বিদেশী জাহাজ পতেঙ্গা খেজুরতলার ছরায় আটকা পড়েছে। এছাড়া বহির্নোঙ্গর থেকে বিএসসির (বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন) জাহাজ বাংলার শিখার দুটি ইঞ্জিনই বিকল হয়ে সন্দ্বীপ উপকূলে ছরায় আটকা পড়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৩ জন ও সীতাকু-ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিএসসির এমডি কমোডর এইচআর ভুইয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রবল ঢেউ ও বাতাসের তোড়ে জাহাজটির নোঙ্গর মাটি আটকে ধরে রাখতে পারেনি। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও মহানগরীর বিভিন্ন অংশে প্রায় অর্ধ শতাধিক কাঁচা বাড়িঘর ও বেশকিছু গাছ উপড়ে গেছে। নগরীর মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সতর্ক সঙ্কেত ৭ নম্বরে ওঠার পর চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। শনিবার সকাল থেকে কর্ণফুলী চ্যানেলে জাহাজ চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়। শনিবার সরকারী ছুটি থাকায় সরকারী চাকুরেদের অফিস যাতায়াতের কোন ঝামেলা ছিল না। তবে জরুরী খাতের সংস্থাগুলোর ছুটি বাতিল পূর্বেই ঘোষণা করা হয়। অপরদিকে, বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পগুলো সকালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সকাল ১১টার দিকে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বাতাসের গতিবেগ বাড়তে থাকে। এ সময় সমুদ্রের প্রচ- ঢেউ ও বাতাসের আঘাতে পতেঙ্গা বিমানবন্দর এলাকা থেকে নেভাল একাডেমি পর্যন্ত সড়কটির একপাশের রেলিং ভেঙ্গে যায় এবং বিভিন্ন স্থানে রাস্তার অংশ ধেবে যায়। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে সকাল থেকেই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের সকল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অপারেশন বন্ধ ঘোষিত হয়।

এদিকে, বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকু- ও সন্দ্বীপ উপজেলার বিভিন্ন অংশে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। রোয়ানুর আঘাতকালীন সময়ে এসব স্থানে ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ও অরক্ষিত স্থানগুলোতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার পর রোয়ানুর মূল আঘাত হানা শুরু হয় চট্টগ্রামে। এ সময় কখনও কখনও বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। আঘাত চলাকালে পূর্বাঞ্চলীয় রেলের সদর দফতর সিআরবি ও পাহাড়তলী এলাকায় রেলওয়ে মালিকানার শতাধিক ছোট বড় গাছপালা উপড়ে যায়। এ ঘটনার পাশাপাশি গাছচোরদের তৎপরতাও ছিল লক্ষণীয়। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্ভাবাস কর্মকর্তা আতিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর চট্টগ্রামে আঘাত হানার পর এটি উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে লক্ষ্য করা গেছে।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে পতেঙ্গা উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সরিয়ে নেয়ার তৎপরতা শুরু হয়। তবে বেশিরভাগ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যায়নি। ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমতে শুরু করলে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন উপকূলীয় এলাকা সন্নিহিত ১৩টি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিল উদ্ধারকারী দল, প্রকৌশল বিভাগ ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ কাউন্সিলরগণ। দুপুরের মধ্যে পতেঙ্গার বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন আহমদ। এদিকে, নগরীর খুলশী থানাধীন পাহাড়তলী এলাকার মাস্টার লেনে একটি কালভার্ট ভেঙ্গে গেছে। এ সময় দুই শিশু আহত হয়।

দুপুর বারোটার দিকে ঘূর্ণিঝড় যখন সর্বশক্তি দিয়ে মহানগরীতে আঘাত করে তখন রাস্তায় জন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহন চলাচলও থমকে যায়। অপরদিকে, সকাল থেকে দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আছাদগঞ্জ, রাজাখালী, কোরবানীগঞ্জ, সদরঘাট ও মাঝিরঘাট এলাকার বাণিজ্য পাড়াগুলো খোলেনি। এসব এলাকার বিভিন্ন স্থানে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। তবে বড় ধরনের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড কমার্স এ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা জামাল হোসেন।

আনোয়ারা থেকে সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এলাকার রায়পুর। এখানকার আড়াই শ’ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ফলে এসব এলাকার বাড়িঘরে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

এদিকে, রোয়ানুর আঘাত চলাকালীন সময়ে নগরীর মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ের একটি অংশ ভেঙ্গে পড়েছে। তবে কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাহাড়ের পাদদেশে বস্তিবাসীদের সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করা হয়।

সীতাকু-ে হত ২ ॥ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে শনিবার সকালে জেলার সীতাকু-ে ঝড়ো হাওয়ায় একটি ঘরের উপর গাছ চাপা পড়লে মা ও ছেলের মৃত্যু হয়। উপজেলার জঙ্গল সিলিমপুরে কালাপানিয়া লোকমানেরঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত মা কাজল বেগম (৪৮) ও ছেলে বেলাল হোসেন বাবু (১০)। গৃহকর্তার নাম মোঃ রফিক। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, পাহাড়িয়া এলাকায় লোকমানেরঘোনা পাকা খুঁটি ও বেড়া দিয়ে তৈরি করা ঘরে থাকত এই পরিবার। সীতাকু-ের ইউএনও নাজমুল ইসলাম ভুইয়া সাংবাদিকদের জানান, প্রচ- বাতাসের তোড়ে একটি গাছ ঘরটির উপর উপড়ে পড়ে। গাছ চাপায় মা ও ছেলে দু’জনই ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।

শিশুর মৃত্যু, আহত ৫ ॥ ঘূর্ণিঝড় চলাকালে টিনের চাল পড়ে রাজিব (১২) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আহত হয়েছে আরও ৫ জন। তাদের চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা হলেন- সনাধর (২০), এনামুল হক (৪০), আজাদ (২৫), আব্দুর রহিম (৪৫) ও ঝুমু রুদ্র (২৩)। আহতদের চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানার সময় নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় আম কুড়াতে বের হয় রাজিব। এসময় বাতাসের প্রবল চাপে ওই এলাকার একটি টিনের ঘরের চাল উপড়ে গিয়ে তার গায়ের উপর পড়ে। এতে সে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম জানান, বাতাসের ঝরে পড়া আম কুড়ানোর সময় ঘরের টিনের চাল উপড়ে পড়ে আহত এক শিশুকে হাসপাতালে আনা হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে আহত আরও পাঁচজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান তিনি।

বিমান ও জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে ॥ শুক্রবার রাত থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল এবং শনিবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে বন্ধ হয়ে যাওয়া জাহাজ ও বিমান চলাচল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে বলে চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে।

বাঁশখালী ॥ ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু শনিবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের উপকূল অতিক্রম করার ফলে বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। তাছাড়া গাছপালা উপড়ে গেছে। ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়ক। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে প্রত্যন্ত এলাকায় আহত হয়েছে অন্তত ২ থেকে ৩ শতাধিক মানুষ। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি বাঁশখালীর উপকূলে নেমে এসেছে মানবতার বিপর্যয়। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রশাসন থেকে ছনুয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের হারুনের স্ত্রী তাহেরা বেগম (৩৫) সহ ৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলেও বাকিদের কোন হদিছ পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায় খানখানাবাদ ও গন্ডামারা এলাকায় ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর থাবায় ৫ জন লোক এখনও নিখোঁজ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার উপকূলীয় এলাকা ছনুয়া, গ-ামারা, বড়ঘোনা, সরল, বাহারছড়া, খানখানাবাদ এলাকা ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ফলে স্বাভাবিক জোয়ারের চাইতে ৫-৬ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে। বাড়িঘর বিধ্বস্ত, লবণ মাঠ, চিংড়ি ঘের ও গ্রামীণ সড়কগুলো ভেঙে পড়েছে। পুরো উপকূলীয় এলাকা এখন পানির নিচে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ২০ থেকে ৩০ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ। তবে উপজেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন এলাকায় ৬ জন নিহত হয়েছে বলে জানা যায়। এদিকে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ফলে উপকূল ছাড়াও বাঁশখালীর সর্বত্র তা-বের দৃশ্য লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় প্রধান সড়কের উপর বড় বড় গাছ পড়ে থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ফলে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ী ক্ষেত সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কৃষকরা। প্রশাসন থেকে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর তা-বে ক্ষতিগস্ত পরিবারের তালিকা প্রণয়নসহ কিছু কিছু এলাকায় শুকনো খাবার পৌঁছানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শামসুজ্জামান জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ফলে বিভিন্ন এলাকায় ৯ জন মারা গেছে। এখনও নিহতদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে নিহত ও আহতসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রণয়ন চলছে। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে উপকূলীয় এলাকায় শুকনো খাবার পৌঁছানো হয়েছে।

হাতিয়া ॥ ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে গত দুদিনের ঝড়ো হাওয়া ও প্রবল জোয়ারে হাতিয়া উপজেলার ২নং চানন্দী ইউনিয়নে ২ জন নিহত হয়েছে। শনিবার বিকেলে প্রবল জোয়ারের তোড়ে ভেসে যায় নলের চর আদর্শ গ্রামের মিনারা বেগম (৩৫) এবং তার মেয়ে মরিয়ম নেছা (১০)। ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু ঘটে জাহাজমারা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের চরহেয়ার গ্রামের সালাহউদ্দিন ব্যাপরীর স্ত্রী মাফুজা বেগম(৪৭)।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসনাত মোঃ মইন উদ্দিন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, প্রবল জোয়ারে হাতিয়া উপজেলার ১নং হরনী ইউনিয়নে ২ জন জোয়ারে ভেসে গেলে পরে মৃত অবস্থা তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

এদিকে, ঘূর্ণিঝড় ও পূর্ণিমার ভরা কাটালে সাধারণ জোয়ারে চেয়ে ৪/৫ ফুট জোয়ারে তলিয়ে যায় নিঝুমদ্বীপ, চরঈশ্বর, নলচিরা, হরনী ও চানন্দী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ। এছাড়া ও তমরদ্দি ইউনিয়নের কোরালিয়া, আঠারবেকী ও ক্ষিরোদিয়া, সোনাদিয়া ইউনিয়নের মাইজচরা, পশ্চিম মাইজচরা, হৈইকবাধা এবং জাহাজমারা ইউনিয়নের মোক্তারিয়া ঘাট এলাকা। এ সময় প্রবল জোয়ারে নলচিরা ঘাট এলাকা থেকে ২০-২৫টি দোকান ঘর মালামালসহ ভেসে যায়। বৃষ্টির পানি ও জোয়ারে তলিয়ে যায় নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ শতাধিক কাঁচাঘর। জোয়ারে ভেসে যায় হাতিয়ার প্রায় ৫শ’টি পুকুর ও ঘেরের মাছ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসনাত মোঃ মইন উদ্দিন জানান, প্রায় পাঁচ হাজার লোককে বেড়িবাঁধের বাইরে থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে। প্রশাসন ও সিপিপি কর্মীরা সতর্ক থাকায় বড় ধরনের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয় নাই।

কক্সবাজার ॥ ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে কক্সবাজারে দু’জন নিহত ও অন্তত ৬০জন আহত হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ৩শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, সহস্রাধিক চিংড়ি ঘের ও অসংখ্য লবণের স্তূপ তলিয়ে গেছে জোয়ারের পানিতে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করলেও প্রবল দমকা হাওয়ায় বহু গাছ-গাছালি ভেঙ্গে গেছে। সকাল ৭টা থেকে ঘূর্ণিঝড়টি কক্সবাজার অতিক্রম করা শুরু করলে জেলাব্যাপী প্রবল দমকা হাওয়া আরম্ভ হয়। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে কক্সবাজারের টেকনাফ, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ উপকূলীয় এলাকা জলোচ্ছ্বাসে ভাসছে। এতে বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। শহর প্রতিরক্ষাবাঁধ বাঁকখালীর গোদারপাড়া পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে আলীরজাহাল, এসএমপাড়া, বড়ুয়াপাড়া ও পেতাসিকদারপাড়ায় জোয়ারের পানি ঢুকে পড়েছে। এছাড়া কুতুবদিয়াসহ উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে জোয়ারের পানি উপচে পড়ছে। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৬ফুট পানি বৃদ্ধি পায়। কুতুবদিয়ার উত্তর ধুরুং এলাকার আবদুর রহিমের পুত্র মোঃ ইকবাল (২৫) সাগর উপকূলে মাছধরারত অবস্থায় প্রবল বাতাসে নৌকা উল্টে গেলে তিনি ঘটনাস্থলে মারা যান। একই এলাকার উত্তর কৈয়ারবিল গ্রামের ফজলুল হক (৫৫) ঘর বিধ্বস্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি স্থানীয় ফয়েজুর রহমানের পুত্র। এ ছাড়াও জেলার কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও টেকনাফসহ উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২৮কি.মিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়েছে। আট উপজেলা প্রশাসন ১৫৮টি সাইক্লোন শেল্টারে ১৭হাজার ৪৩৪ পরিবারের ৮৭হাজার ১৭০জন উপকূলের বাসিন্দাকে আশ্রয় দিয়েছে। সেখানে তাদের শুকনো খাবার ও পানি সরবরাহ দেয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে মহেশখালীর কুতুবজোম ঘটিভাংগা এলাকার বেড়িবাঁধের বাইরে ঘরবাড়িগুলো প্লাবিত হয়েছে। বহু বসতগৃহ পানিতে তলিয়ে যায়। কুতুবজোম এলাকায় গাছ পড়ে আহত হয়েছে তিনজন মহিলা। তাঁদের আহত অবস্থায় হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। কুতুবজোমের ইউপি চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা অন্তত ৫ফুট পানির নিচ থেকে মালামাল ও আসবাবপত্র ইত্যাদি উদ্ধার কার্যক্রম চালান। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন শুকনো খাবার চিড়া, গুড় ও পানি বিতরণ করেছে।

মুন্সীগঞ্জ ॥ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে আবারও ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে। এর পূর্বে শনিবার সকাল সাতটা থেকে ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। তারও পূর্বে শুক্রবার সন্ধ্যা পোনে ছয়টা থেকে কর্তৃপক্ষ পূর্ব সতর্কতামূলক লঞ্চ, সিবোট ও ট্রলারসহ সকল প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে ওই নৌরুটে ফেরি চলাচলও সীমিত করা হয়েছিল। এর পর শনিবার সকাল সাতটা হতে পুরোপুরি ফেরি সার্ভিসসহ সকল ধরনের নৌযান বন্ধ করে দেয়া হয়।

বিআইডব্লিউটিসির এজিএম খালেদ নেওয়াজ জানিয়েছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পদ্মার অবস্থা খুব ভাল ছিল না। নদীতে প্রচুর ঢেউ ছিল। সেই সঙ্গে ছিল প্রচুর বাতাস বা ঝড়োহাওয়া। এতে ফেরি চলাচল করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে পড়ে। পদ্মার কাওড়াকান্দি এলাকায় ঢেউয়ের দাপাদাপি প্রকট আকার ধারণ করে। চালকরা ফেরিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল না। সেই সঙ্গে সকাল থেকে ছিল বৃষ্টি। তাই ঝুঁকি এড়াতে শনিবার সকাল ৭টা থেকে রো রো ফেরিসহ সকল ধরনের ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এর পূর্বে ছোট আকারের ৭টি ফেরি শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে বন্ধ করে দেয়া হয়। ঝড়োহাওয়া কেটে যাবার পর শনিবার বিকেল ৪টায় দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা পর ফেরি সার্ভিস পুনরায় চালু করা হয়। এ সময় আটকে পড়া যাত্রীদের ফেরিতে পার করা হয়েছে। এখন আর ঘাটে যাত্রী নেই। তবে রো রো ফেরিঘাটের পল্টুনের একটি পকেটের ফিঙ্গার ভেঙ্গে যাওয়ায় রো রো ফেরি চলাচলা বন্ধ রয়েছে। এটি মরামতের কাজ চলছে। রাতের মধ্যেই তা ঠিক হয়ে যাবে এবং পুনরায় রো রো ফেরি চলাচল শুরু হবে।

বিআইডব্লিউটিএর মাওয়া নৌবন্দর কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও পদ্মায় অতিরিক্ত ঢেউয়ের কারণে শুক্রবার সন্ধ্যা পোনে ৬টা থেকে শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে লঞ্চ, সিবোট ও ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। গতকাল বিকেলে পদ্মার অবস্থা অনেকটাই ভাল হয়েছে। তবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় আর লঞ্চ, সিবোট ও ট্রলার চলাচলে অনুমতি দেয়া হয়নি। রবিবার সকাল থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচল আবারও শুরু হবে।

যশোর ॥ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে টানা বৃষ্টিপাতে শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার যশোরাঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত হয়। ভারি বর্ষণে শহরের বেজপাড়া টিবি ক্লিনিক এলাকা, বেজপাড়া কবরস্থান রোড, বেজপাড়া মেইন রোড, বারান্দিপাড়া, বকচর, শংকরপুর, মিশনপাড়া, উপশহর, চাঁচড়া, কারবালা, এমএম কলেজ এলাকা, টিবি ক্লিনিকপাড়া, নাজির-শংকরপুর, বকচর, আবরপুরসহ শহরের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার ড্রেনের উপচেপড়া পানি সড়ক পার হয়ে ঘরের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। ভেসে গেছে বিভিন্ন এলাকার পুকুর ও মাছের ঘের। যশোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফ হাসান জানান, পৌর এলাকার ড্রেন সংস্কার ও নির্মাণের কাজ চলায় কোন কোন এলাকায় পানি নিষ্কাশনে কিছুটা বিলম্ব হয়। তবে বৃষ্টি থেমে গেলে দ্রুত পানি নেমে যায়।

ভোলা ॥ ঘূর্ণিঝড়ে তজুমদ্দিন উপজেলার শশীগঞ্জ বাজারের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি ল-ভ- হয়ে গেছে। এ সময় ঘর চাপা পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র আক্রাম ও রেখা নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছে অন্তত শতাধিক লোক। ভোলা-তজুমদ্দিন-চরফ্যাশন সড়কের ওপর বিভিন্ন স্থানে গাছ পড়ে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ভোলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে চরফ্যাশন উপজেলার পর্যটন এলাকা কুকরি মুকরি ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের সøুইস গেট না থাকায় প্রায় ১০ হাজার লোক অতি জোয়ারে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অপরদিকে লালমোহনের লডহাডিঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর লর্ড হার্ডিঞ্জ পাটারি হাটের দক্ষিণ পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ওই সব এলাকায় অন্তত এক হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়ে।

তজুমদ্দিন উপজেলার চেয়ারম্যান অহিদুল্লাহ জসিম জানান, তার বাড়ির পাশে বড় বাড়িতে ঘর চাপা পড়ে মফিজের ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র আক্রাম গুরুতর আহত হয়। রাতেই তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। তজুমদ্দিনের চাঁদপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে ঘর চাপা পড়ে নয়নের স্ত্রী রেখা (৩৫) নিহত হয়েছে। চরফ্যাশন উপজেলার কুকরি মুকরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম জানান, তার এলাকায় বেড়িবাঁধে ১২টি পয়েন্টে সøুইস গেট না থাকায় অতি জোয়ারের পানিতে প্রায় ১০ হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা সাগর মোহনার অপর ইউনিয়ন ঢাল চরে ৩/৪ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। সেখানেও প্রায় এক হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মনপুরা উপজেলার সাকুচিয়া ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি বাড়ি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।

ভোলা জেলা প্রশাসক মোহাং সেলিম উদ্দিন জানান, তজুমদ্দিনে এক শিশু ঘর চাপা পড়ে মারা যাওয়ার খবর তিনি শুনেছেন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ক্ষয়ক্ষতির খবর তিনি নিচ্ছেন।

ঝালকাঠি ॥ ঘূর্ণিঝড় ও অবিরাম বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক গাছপালা উপড়ে পড়েছে। সরকারী উদ্যোগে নদী সংলগ্ন এলাকা থেকে মানুষজনকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে। ঝালকাঠিতে ৫টি উদ্ধারকারী টিম ও ৪০টি মেডিক্যাল টিম তৈরি রাখা হয়েছে। ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার শৌলজালীয়া এলাকায় ৩-৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ থাকে। ঝালকাঠি পৌরসভার মেয়র আলহাজ লিয়াকত আলী তালুকদার কাউন্সিলরদের নিয়ে সরজমিনে শহর এলাকা ঘুরে ঘুরে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার জন্য অবহিত করেছেন।

পটুয়াখালী ॥ ঘূর্ণিঝড়ে শনিবার ভোর রাতে দশমিনার গোপালদী গ্রামে ঘরচাপায় নয়া বিবি (৫৫) নামের একজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৪ জন। আহতরা হচ্ছে শহিদুল ইসলাম (২৮), সেলিম (২৪), কন্যা সুফিযা (৩৫) ও রাজিয়া (৩২)। বর্তমানে উপকূলে হালকা বর্ষণের সঙ্গে থেমে থেমে চলছে দমকা হাওয়া। দশমিনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিত কাঁচা বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। কলাপাড়া ও দশমিনায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মাছের ঘেরে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে। অত্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে কুয়াকাটা সংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর রয়েছে। বঙ্গোপসাগর উত্তাল হওয়ায় স্থানীয় নদ-নদীগুলো ক্রমশই পানি বৃদ্ধি হচ্ছিল। লাগাতার ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে পটুয়াখালী পৌর শহরসহ উপজেলাগুলোর বেশকিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল ৪-৫ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ফলে রবিশস্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে কৃষকরা। শত শত ট্রলার নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক একে এম শামিমুল হক সিদ্দিকী দুর্যোগ মোকাবেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। পটুয়াখালী নৌবন্দর উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক জানান, পটুয়াখালীর অভ্যন্তরীণ নৌপথে ১২টি নৌরুটে একতলা লঞ্চ (৬৫ ফুটের নিচের লঞ্চ) চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ রয়েছে পটুয়াখালী-ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চও।

চাঁদপুর ॥ ঘূর্ণিঝড়ে চাঁদপুরে মেঘনা নদীর উপকূলীয় এলাকা রয়েছে উত্তাল। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পায়। জেলার ৪ উপজলোর প্রায় ৪০ চরাঞ্চলের মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিরাপদে রাখা হয়েছে। নৌ-চলাচল বন্ধ থাকায় চাঁদপুর নৌ-টার্মিনাল ও হরিণা ফেরিঘাট এলাকায় প্রায় ৫ শতাধিক যাত্রী আটকা পড়েছে। নৌ-টার্মিনাল এলাকার আশপাশে বহু সংখ্যক লাইটার জাহাজ নিরাপদে রাখা হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শহর ও গ্রামের বিদ্যুত সংযোগ বন্ধ রাখা হয়।

চাঁদপুর বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুক্রবার বিকেল থেকেই চাঁদপুর থেকে সকল নৌ-চলাচল বন্ধ। মেঘনা নদী এখন উত্তাল। নৌ-টার্মিনালের আশপাশে শত শত লাইটার জাহাজ আশ্রয় নিয়েছে। তবে চট্টগ্রাম ও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায় ২শ’ লঞ্চ যাত্রী লঞ্চঘাট এলাকার আশপাশের বিদ্যালয়গুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য চাঁদপুর পৌরসভা থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, এলাকার কিছু ঘর বাড়িতে পানি উঠেছে। তবে এই পানি স্থায়ীভাবে থাকবে না। আশপাশের এলাকায় কিছু ঘর বাড়ির চাল (টিন) বাতাসে উড়ে যায়। তবে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উদয়ন দেওয়ান জানান, সদর উপজেলার হানাচর ইউনিয়নের চাঁদপুর শরীয়তপুর ফেরিঘাটে ১১টি যাত্রীবাহী বাস আটকা পড়েছে। এসব বাস যাত্রীদের ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ছাত্তার রাঢ়ী পার্শ্ববর্তী চালতাতলী স্কুলে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় শুক্রবার থেকে জেলা প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি রেখেছে। লঞ্চ বন্ধ থাকায় চাঁদপুর নৌ-টার্মিনাল, মতলব উত্তর লঞ্চঘাট ও হরিণা ফেরিঘাটে যেসব যাত্রী আটকা পড়েছে। তাদের নিরাপদে রাখা ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চরফ্যাশন ॥ ঘূর্ণিঝড়ে ভোলার চরফ্যাশনের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ও চরাঞ্চলসহ উপকূলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার কুকরি-মুকরি, ঢালচর, পাতিলা, সিকদারের চর, চরহাসিনা, চরফারুকী, চরলক্ষ্মী, বেড়িবাঁধে বাহিরের অংশের দক্ষিণ আইচা, চর আইচা, জাহানপুর, চর ফকিরাসহ প্রায় অর্ধশতাধিক চর ৪/৫ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ওইসব চরের প্রায় দুই শতাধিক কাঁচা ঘর বাড়ি জোয়ারের পানির ঢেউয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে শতাধিক গবাদি পশু। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। ঢালচর ইউপি চেয়ারম্যান সালাম হাওলাদার জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু’র প্রভাবে পুরো এলাকার মানুষ আতঙ্কিত। জোয়ারে পানিতে ৯টি ওয়ার্ডের বেশিরভাগ এলাকা তলিয়ে গেছে।

বাগেরহাট ॥ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালীর বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী বেশ কয়েকটি অংশে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। উত্তাল ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসে ৩৫/১ পোল্ডারের তাফলিবাড়ি পয়েন্টের তিন ভাগের এক ভাগ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শনিবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে সুন্দরবন ও বাগেরহাট উপকূল অতিক্রম করে ‘রোয়ানু’। এর প্রভাবে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত একটানা ঝড়-বৃষ্টি হয়। জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রোয়ানু’ এবং পূর্ণিমার প্রভাবে প্রতিটি নদ-নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। রামপাল, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, কচুয়া, মংলা ও সদর উপজেলার কমপক্ষে ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।