১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপি নেতার মোসাদ কানেকশন! চুপ জামায়াত-হেফাজত

বিএনপি নেতার মোসাদ কানেকশন! চুপ জামায়াত-হেফাজত

বিভাষ বাড়ৈ ॥ কথায় কথায় ধর্মের দোহাই দিয়ে হরতাল, অবরোধ ডেকে অস্থিরতা সৃষ্টি করলেও বিএনপি ও ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের গোপন সম্পর্কের ইস্যুতে পুরোপুরি চুপ হেফাজতসহ ২০ দল মদদপুষ্ট ইসলামী দলগুলো। সাধারণ ইসলামী দল, সংগঠন ও ইসলামী চিন্তাবিদরা মোসাদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ককে ‘ইসলামের সঙ্গে দুশমনী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ইসলামী দলের নেতারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। ইসলামের কথা বলে যারা একের পর এক ব্যক্তির ফাঁসির দাবি তুলছেন, ইসলামের শত্রু বলছেন, যাকে ইচ্ছে তাকে সেই হেফাজত নেতারা এখন চুপ। টেলিফোন করলে দু’একজন কথা বললেও বক্তব্য দিচ্ছেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে।

এদিকে হেফাজত-জামায়াতসহ বিএনপি সমর্থিত ইসলামী দলগুলোর এ কর্মকা-কে ইসলামের সঙ্গে দুশমনী অভিহিত করে বিভিন্ন ইসলামী দল ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেছেন, এরা আসলে ইসলামের নামে অপরাজনীতি করে, ব্যবসা করে। ওদের কাছে ইসলাম হচ্ছে অপরাজনীতির হাতিয়ার। মোসাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বিএনপি যেমন ইসলামের সঙ্গে দুশমনী করেছে তেমনি এখন হেফাজত-জামায়াতীরা ইসলামের সঙ্গে দুশমনী করছেন। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলছেন, হেফাজত-জামায়াতীরা তখনই মাঠে নামে যখন বিএনপি-জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের স্বার্থ রক্ষা হয়। ইসরাইলের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে বিএনপিকে সতর্ক করার কথা জানিয়ে ঢাকায় ফিলিস্তিনী দূতাবাসের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স ইউসুফ এস রামাদান সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের কোন দল তা করলে তাদের জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যা’ হবে। ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের কোন কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই। এ বিষয়ে রামাদান বলেন, বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দল যদি ইসরাইলের কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি, দল কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তবে তা হবে তাদের রাজনৈতিক আত্মহত্যা। ইউসুফ এস রামাদান আরও বলেছেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং আরেকজন নেতা আমার সাথে দেখা করে বলেছেন, ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই এবং ওই গোপন বৈঠকের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।

বিএনপির এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা তাদের বলেছি, ভবিষ্যতে তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতাদের এ বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ এ ধরনের ঘটনা তাদের জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যা’ হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের জনগণ ফিলিস্তিনের সাথে আছে, তারা এ ধরনের কোন আঁতাত মেনে নেবে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে যারা বিএনপিকে সমর্থন করে তারাই তাদের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিতে পারে। তবে আসলামের বিষয়টি নিয়ে যেন ‘তিক্ততা’ আর না বাড়ে সে প্রত্যাশা করেছেন ফিলিস্তিনী এই কূটনীতিক।

ইসরাইল ইস্যুতে সরকারের অবস্থানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা ফিলিস্তিনের সাথে আছে এবং ইসরাইলের সাথে কোন ধরনের আঁতাতের বিরুদ্ধে সরকার খুবই তৎপর। কারণ ইসরাইল শুধু ফিলিস্তিনের নয়, তারা বাংলাদেশরও শত্রু। ইসরাইল দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ফিলিস্তিনী কূটনীতিকের এমন অবস্থাপের পর কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে দেশের কিছু ইসলামী দলের নেতারা। এক সময় বিএনপি-জামায়াত জোটের অংশীদার ছিল ইসলামী ঐক্যজোট। ইসলামের সঙ্গে বিএনপির প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান, শরিকদের অবহেলাসহ নানা কারণে বিরোধে জড়িয়ে পরার পর চলতি বছর ৭ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত ছেড়ে যায় ইসলামী ঐক্যজোট।

এ ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ এবার মাঠে সক্রিয় ইসরাইলের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের বিরুদ্ধে।

বৃহস্পতিবার বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ইসলামী ঐক্যজোট ঢাকা মহানগর আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে নেতারা মোসাদ তথা ইসরাইলের অপতৎপরতা রুখে দিতে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইসলাম ও বিশ্বমুসলিম নির্মূলকামী অন্যতম প্রধান এবং চির শত্রু হচ্ছে অভিশপ্ত ইসরাইল। এই দেশের সঙ্গে কেউ সম্পর্ক রাখলে বাংলাদেশে কেউ ছাড় পাবে না। দলটির চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেছেন, ১৯৪৮ সালে মোসাদের জন্মই হয়েছে বিশ্বকে ইসলামশূন্য করার জন্য। ইরাকে তারা আগুন জ্বালিয়েছে, ইয়েমেনে ও সিরিয়ায় যুদ্ধ বাঁধিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনের মুসলমানদের উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতা চালাচ্ছে। কোরানের ভাষায়, তারা মুসলমানদের নিকৃষ্টতম শত্রু মোসাদের অপতৎপরতা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ইসরাইলের কোন ষড়যন্ত্র বাংলাদেশে চলতে দেয়া যাবে না। কুরআনের ভাষায়, তারা মুসলমানদের নিকৃষ্টতম শত্রু।

দলটির মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ইসলাম ও বিশ্বমুসলিম নির্মূলকামী অন্যতম প্রধান এবং চিরশত্রু হচ্ছে অভিশপ্ত ইসরাইল। এই ইসরাইল চক্রের প্রধান কুশীলব হচ্ছে মোসাদ। এই শত্রুশক্তি যেমন মহানবীর (সা.) যুগে ছিল, তেমনি তার পূর্বেও ছিল। এখনও আছে। সে শত্রুপক্ষটি বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অখ-তা, উন্নয়ন ও শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। তারা নির্মূল করতে চায় ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের। ইসলামী শক্তির বিভক্তি ও বিধ্বংসে এবং ইসলামবিরোধী যুদ্ধে তারা সর্বজাতের কাফের, মুশরিক, ফাসেক ও নাস্তিক-মুরতাদদের সঙ্গে কোয়ালিশনও গড়ে তুলেছে। এই অপশক্তির অপতৎপরতা বন্ধে সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মোসাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা একটি দলের রাজনৈতিক আত্মহত্যা মন্তব্য করে ইসলামী ঐক্যজোটের এ নেতা বলেন, মোসাদ ইসলামের চির শত্রু। মোসাদের সঙ্গে যারাই যোগাযোগ করবে, সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করবে তারাই রাজনৈতিক আত্মহত্যা করবে। সরকারের উচিত এসব অপশক্তিকে প্রতিহত করা। বিএনপিরও উচিত তদন্ত করে অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।

ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে ইহুদীদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। ইসলামী ঐক্যজোট ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন মাওলানা যুবায়ের আহমদ, যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মুহাম্মদ তৈয়্যেব হোসাইন, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াছেল, সাংগঠনিক সচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন, সহকারী মহাসচিব মাওলানা আলতাফ হোসাইন, মাওলানা একেএম আশরাফুল হক, মাওলানা সাইফুল ইসলাম, মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ গাজী, মাওলানা আবুল খায়ের বিক্রমপুরী, মাওলানা কাজী আজিজুল হক প্রমুখ।

ইসলামী ঐক্যজোট ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির কাছাকাছি থাকা অন্য কোন ইসলামী দল এখন পর্যন্ত বিএনপি-মোসাদ সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেনি। যে হেফাজত ইসলামের কথা বলে কথা কথায় হরতাল অবরোধ দিয়ে মাঠে নামে সেই উগ্রবাদী নেতারাও এখন বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষতি হবে এই ভেবে চুপ। দলটির পক্ষ থেকে আন্দোলন এমনি এ ঘটনার নিয়ে কোন কথা বলতেই রাজি নন হেফাজতের কেউ। কয়েক দফা চেষ্টা করে অবশ্য পাওয়া গেল হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হককে। তিনি বলছিলেন, ইহুদীদের সঙ্গে মুসলামনের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না। বাংলাদেশের কোন ব্যক্তি যদি সম্পর্ক রাখে তবে সেটা হবে দেশের মুসমানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। কিন্তু এখন হেফাজত চুপ কেন? এমন প্রশ্নে নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ দাবি করে হেফাজত নেতা বলেন, হেফাজত রাজনৈতিক সংগঠন নয়, তাই এ বিষয়ে কোন কর্মসূচী দেয়ার কারণ নেই। আমরা দেশবাসীকে বলব, সকল ইহুদী শক্তির কাজ থেকে দূরে থাকতে।

এদিকে ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চললেও এখন পর্যন্ত জামায়াতের পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি। টেলিফোন করেও দলটির কোন নেতাকে পাওয়া যায়নি। তবে সূত্রগুলো বলছে, মার্কিন বলয়ে থাকা ইসরাইল হলো জামায়াতের বন্ধু। তারা এ নিয়ে কোন বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকবে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে এমনই সিদ্ধান্ত এসেছে। জামায়াত বিষয়টির দিকে সর্বক্ষণিক নজর রাখছে।

কেবল জামায়াত নয়, ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করে বেড়ালেও বিএনপি-মোসাদের ইস্যুতে নীরব আছে ২০ দলের অন্যান্য নেতাও। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের খেলাফত মজলিশ, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, ইসলামিক পার্টি বা অন্য কোন ইসলামী দলের নেতাদেরই কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জমিয়মের নেতাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা কৌশলী বক্তব্য দিয়ে বলেন, বিষয়টি প্রমাণিত নয় তাই তারা কথা বলেননি।

বিএনপির-জামায়াত জোট ও তাদের সমর্থিতদের এমন অবস্থানে অবশ্য অবাক নন ইসলামী চিন্তাবিদরা। ওদের (বিএনপি-জামায়াত পন্থী ইসলামী দল) সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই-এমন মন্তব্য করে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব লায়ন এম এ আউয়াল এমপি বলছিলেন, এরা মুখে ইসলামের কথা বলে। বাস্তবে এরা ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে সব সময় সম্পর্ক রেখে কাজ করে। ইসলামের স্বার্থ নয়, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে এরা কাজ করে।

তরিকত ফেডারেশন মহাসচিব এম এ আউয়াল ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা ও বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি-জামায়াত নানা ধরনের অগণতান্ত্রিক ও অস্বচ্ছ পথে সরকারপতনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আগুনসন্ত্রাসের পাশাপাশি পেট্রোলবোমায় মানুষ মেরে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করেছে খালেদা জিয়াসহ তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত নেতারা। ওই অপকর্মের ধারাবাহিকতায় দিল্লীতে মোসাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে আসলাম চৌধুরী।

তরিকত নেতা বলেন, মোসাদ প্রতিনিধির সঙ্গে বিএনপি নেতার বৈঠককে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। অপশক্তি ইসরায়েল আরববিশ্বসহ পুরো ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদার আন্দোলনকে ধ্বংস করার যাবতীয় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের হায়েনাসম্বলিত মুখ এখন বাংলাদেশের দিকে ফিরেছে। এই দেশকেও তারা ফিলিস্তিনের মতো ধ্বংস করতে চায়। আর বিএনপি জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে ব্যর্থ হয়ে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।

এদিকে হেফাজত-জামায়াতীদের চুপ থাকার বিষয়ে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগার ইমাম খতিব আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলছিলেন, ওই সব দলের চুপ থাকারই কথা। এরা তো আসলে ইসলামের নামে অপরাজনীতি করে, ব্যবসা করে। ওদের কাছে ইসলাম হচ্ছে অপরাজনীতির হাতিয়ার। মোসাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বিএনপি যেমন ইসলামের সঙ্গে দুশমনী করেছে তেমনি এখন হেফাজত-জামায়াতীরা ইসলামের সঙ্গে দুশমনী করছেন। হেফাজত-জামায়াতীরা তখনই মাঠে নামে যখন বিএনপি-জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের স্বার্থ রক্ষা হয়। এখন তারা কথা বলবে না, তাতে ইসলামের যতই ক্ষতি হোক। এটাই ওসব দলের চরিত্র।