২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজধানী সংলগ্ন ১৩ ইউনিয়নে টান টান উত্তেজনা

রাজধানী সংলগ্ন ১৩ ইউনিয়নে টান টান উত্তেজনা

গাফফার খান চৌধুরী ॥ রাজধানী ঢাকা সংলগ্ন ১৩টি ইউনিয়নে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। শুক্রবার রাতে সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নে নির্বাচনী সহিংসতায় একজনের মৃত্যু ও অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ কাউন্দিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল আলম খানকে এক দেহরক্ষীসহ আটক করেছে। এমন ঘটনার পর ঢাকার পাশের ইউনিয়নগুলো ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে ধারাবাহিক অভিযান চালানোর নির্দেশ জারি করা হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। তারই ধারাবাহিকতায় কাউন্দিয়া ইউনিয়নে স্থায়ীভাবে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে। দ্বীপ ইউনিয়নটির চারদিকে আরও বাড়ানো হয়েছে পুলিশের নৌ টহল।

গত ২৮ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন ষষ্ঠ ধাপে ৭২৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে। ইউনিয়নগুলোতে আগামী ৪ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে রাজধানীর পাশে রয়েছে ১৩টি ইউনিয়ন। এগুলো হচ্ছে, ঢাকার গাবতলী সংলগ্ন সাভার উপজেলার আমিন বাজার, কাউন্দিয়া, তেঁতুল ঝোড়া, ভার্কুতা, বিরুলিয়া, সাভার, বনগাঁও, শিমুলিয়া, ধামসোনা, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, পাথালিয়া ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার শাক্তা ইউনিয়ন।

সাভার থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার রাতে কাউন্দিয়া ইউনিয়নে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর চাচাত ভাই সাইফুল ইসলাম খান ও আতিকুর রহমান খান শান্তর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। আহত হন অন্তত ৩০ জন। শনিবার ভোরে পুলিশ আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল আলম খাঁনকে দেহরক্ষী অসীমসহ আটক করে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে কাউন্দিয়া ইউনিয়নের সিংঘাসা গ্রামে আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইফুল আলম খাঁন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুর রহমান খান শান্তর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে সেখানে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। গুলিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক হাজী শহিদুল্লাহ ব্যাপারীর (৬০) মৃত্যু হয়। তিনি একই এলাকার মৃত ফটিক চাঁনের ছেলে। তিনি এক পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন। সংঘর্ষের পর স্বতন্ত্র প্রার্থীর দুই সমর্থক স্থানীয় আলী আহম্মদ খার পুত্র শাহ আলম খাঁ ও প্রতিবেশী আসলাম মিয়াকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন ধরে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের হদিস মেলেনি।

হামলায় আহতদের মধ্যে রয়েছেন জমশের আলী দুলু (৬০), ইসহাক শিকদার (৪০), সেন্টু মিয়া (৫৬), তৌহিদুল ইসলাম শাকিল (৫২), হাজী শফিকুল ইসলাম (৫০) ও নাজিম উদ্দিন। এদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ নাজিম উদ্দিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

আনারস মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী শান্ত খানের অভিযোগ, পথসভা করার সময় পরিকল্পিতভাবে সাইফুল আলম খাঁনের লোকজন তাদের ওপর হামলা চালায়।

কাউন্দিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা আমজাদ হোসেনের অভিযোগ, বিনা কারণে সাইফুল আলম খাঁনের লোকজন হামলা চালায়। সাইফুল ইসলাম খাঁনের পরিবারের অভিযোগ, থানায় কাউকে সাইফুল আলম খানের সঙ্গে বলতে দেয়া তো দূরের কথা, দেখা করতে পর্যন্ত করতে দেয়া হচ্ছে না।

এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় সাভারের ধামসোনা ইউনিয়নে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী হাজী আব্দুল গফুরের নির্বাচনী প্রচারণায় হামলার পর রাতেই প্রার্থীর বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকালে বাড়ির আশপাশের কয়েকটি দোকানপাটেও ভাংচুর চালানো হয়েছে। হামলায় অন্তত ৫ জন আহত হয়েছেন। আশুলিয়া থানার ওসি মহসিনুল কাদির জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার পাশের ১৩টি ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দল ও বিএনপি-জামায়াতের প্রভাব প্রায় সমান সমান। তবে বেশিরভাগ ইউনিয়নে বিএনপি-জামায়াতের প্রভাব খানিকটা বেশি। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রার্থী রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রার্থী থাকার কারণে এবং দল ক্ষমতায় থাকার ফলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দিন দিন বেড়েই চলেছে। ১৩টি ইউনিয়নেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইউনিয়নগুলোতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে। সন্ধ্যার পরই মহড়া চলছে। অনেক ইউনিয়নে নিয়মিত মাদকের আসর বসছে। এতে মানুষের মধ্যে রীতিমতো ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে কাউন্দিয়া ইউনিয়নের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। চারদিকে নদী বেষ্টিত ইউনিয়নটিতে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন সুযোগ নেই। রাত বাড়লেই নৌকা ভর্তি লোকজন এলাকায় প্রবেশ করছে। এমন সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পারে সরকারবিরোধীরা। ইউনিয়নগুলোর নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটতে পারে। ইতোমধ্যেই পুলিশ সদর দফতরসহ প্রতিটি গোয়েন্দা দফতর থেকে ১৩টি ইউনিয়নে নির্বাচনের সময় বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার আগাম বার্তা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো ও ঝটিকা অভিযান চালানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ ঘটনাস্থল কাউন্দিয়া থেকে জানান, কাউন্দিয়া ইউনিয়নে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অনেকেই। এ ঘটনায় চেয়ারপ্রার্থী সাইফুল আলম খানকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হতাহতের ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এদিকে কাউন্দিয়ায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে পুলিশের নৌ টহল ব্যবস্থা।

র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, নির্বাচনকে কেউ যাতে প্রভাবিত করতে না পারে এজন্য সব ধরনের সর্তকর্তামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঢাকার পাশের ইউনিয়নগুলোর নির্বাচনকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারী ও সব ধরনের অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।