১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভিডিও ফুটেজে আসলাম চৌধুরীর সব গোমর ফাঁস

ভিডিও ফুটেজে আসলাম চৌধুরীর সব গোমর ফাঁস

শংকর কুমার দে ॥ ইসরাইলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির সদস্য মেন্দি এন সাফাদি ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে দিল্লীতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর বৈঠকে বর্তমান সরকারকে উৎখাতের জন্য মোসাদের অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এই বৈঠকের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে আসলাম চৌধুরীকেও দেখিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে মোসাদের এজেন্টকে নিয়ে দিল্লীতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি বিএনপির অনেক নেতাই জানতেন বলে গোয়েন্দা সংস্থাকে জানান বিএনপির এই নেতা। গোয়েন্দা সংস্থার হাতে দিল্লী বৈঠকের একাধিক ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েন বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরী। তাকে গ্রেফতারের পর আদালতের আদেশে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবি সূত্র এ খবর দিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থা যেসব ছবি ও ভিডিও বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে তার সামনে তুলে ধরে দেখিয়েছে তার মধ্যে একটি ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে পাঁচ জনকে। এরা হচ্ছেন ইসরাইলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পাটির সদস্য ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের মেন্দি এন সাফাদি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশে মোসাদের এজেন্ট শিপান কুমার বসু, রওশন জাহান প্রিন্স ও কলকাতার বিবেক দেব। দিল্লীতে বৈঠক শেষে তাদের এই ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। অপর এক ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দিল্লীর এক হোটেলে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ইসরাইলের মেনদি এন সাফাদি ও বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরী। তাদের মাল্যদান করার পর করমর্দন করছেন অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তি। ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দিল্লীতে হোটেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর বাংলাদেশে মোসাদের এজেন্ট শিপান কুমার বসুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী। তাদের দুই জনের পরনেই টাই স্যুট। দিল্লীতেই হোটেলে আরেক ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ইসরাইলের মোসাদের মেনদি এন সাফাদিও সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী ও তাদের পাশেই দাঁড়ানো রঙিন পাঞ্জাবি পরিহিত সুন্দরী এক নারী। এসব ছবি ও ভিডিও দেখে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর কাছে জানতে চাওয়া হয় তারা কে, কি তাদের পরিচয়? বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বৈঠকের কথা প্রথমে অস্বীকার করলেও দিল্লী বৈঠকের ছবি ও ভিডিও দেখানো হলে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরী। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে কলকাতায়, আগ্রায়, নয়াদিল্লীতে বৈঠকের কথা স্বীকার করেন তিনি। এ ছাড়াও ইসরাইলের মোসাদের এজেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ঘোরাফেরা, হোটেলে খাওয়া-দাওয়া ও বিজেপির যুব শাখার সম্মেলনে যোগদানের কথা জানান বিএনপির এই নেতা। প্রথমে মোসাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা শুনে বেমালুম চেপে যাওয়ার চেষ্টা করলেও মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে সাক্ষাত এবং দীর্ঘ সময় কথোপকথনের অডিও, ভিডিও ও ছবি দেখানোর পর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান।

গত ৫ মার্চ থেকে ১০ মার্চ দিল্লিতে ইসরাইলের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি এ্যান্ড এ্যাডভোকেসি’র উদ্যোগে ‘তেলআবিব-ইন্ডিয়া রিলেশনশিপ’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত সেমিনারের ও মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বৈঠকের বিভিন্ন ছবি দেখানো হয়। এই বৈঠকের পর হোটেলে ও বাইরে তোলা ছবি ও ভিডিও দেখে ইসরাইলের লিকুদ পার্টির নেতা মেন্দি এন সাফাদির ছবি শনাক্ত করেন বিএনপির নেতা আসলাম। বিএনপির নেতা এসব ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বৈঠকের কথা স্বীকার করেন। ওই বৈঠকে বাংলাদেশে মোসাদের এজেন্ট শিপান কুমার বসুর উপস্থিতিও শনাক্ত করেন। লন্ডনে মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে মিস্টার রহমানের বৈঠক হয়েছিল। এ বৈঠকের বিস্তারিত বিষয়ও মেন্দি এন সাফাদি তার ফেসবুক আইডিতে স্ট্যাটাস দিয়ে উল্লেখ করেছেন। জেরুজালেম অনলাইনেও তার একই বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। এরপর গত ১৫ মে আসলাম চৌধুরীকে কুড়িল তিন শ’ ফুট রোড এলাকা থেকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবি সূত্র জানান, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে জ্বালাও পোড়াও এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর তা-ব চালায় বিএনপি-জামায়াত। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, বাড়িঘর ছাড়া করা, দেশত্যাগে বাধ্য করার সচিত্র প্রতিবেদন ও ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের তা-বের ছবি ও ডকুমেন্টারিগুলো বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হয়েছে বলে চালিয়ে দিয়ে বিশ্বকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী ও বাংলাদেশে মোসাদের এজেন্ট শিপান কুমার বসু। কারণ হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ব্যাপক অপ-প্রচার চালিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলে বর্তমান সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপট বা প্লট তৈরি করা হচ্ছিল। সরকার উৎ্খাতের এই ষড়যন্ত্রে অর্থায়ন করার আশ্বাসও দিয়েছেন মোসাদের ওই প্রভাবশালী নেতা এবং বিনিময়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ইসরাইলকে এদেশে দূতাবাস স্থাপনসহ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বৈঠকে মেন্দি সাফাদিকে নিশ্চয়তা দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই ইস্যুটিতে সাফাদির কাছে কি ধরনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে সেই বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীকে।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উর্ধতন কর্মকর্তা জানান, আসলাম চৌধুরী মূলত বিএনপির একজন আঞ্চলিক নেতা হলেও তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে লন্ডনে বসবাসরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এক লাফে অনেক উর্ধতন নেতাকে ডিঙ্গিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব পদটি পেয়ে যান। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পদটি পাওয়ার পর ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট ও ইসরাইলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পাটির সদস্য মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন নয়াদিল্লীতে। এই বৈঠকের খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা এখন মুখথুবড়ে পড়েছে। ইসরাইলের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ এতদিন লুকোচুরি করে, গোপনে বাংলাদেশে তৎপরতা চালালেও এখন প্রায় প্রকাশ্যেই মাঠে নেমেছে, যা বিএনপি নেতা গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সব ফাঁস হচ্ছে। বর্তমান সরকার উৎখাতে সরাসরি মিটিং-সিটিং করে চলেছেন মোসাদের কর্মকর্তারা। এরই অংশ হিসেবে গত মার্চে কলকাতা, দিল্লি ও লন্ডনে তিনটি বৈঠক করেছেন ইসরাইলের প্রভাবশালী নেতা মেন্দি এন সাফাদি। বিএনপির প্রভাবশালী নেতা, একটি ইসলামী দলের নেতা এবং মোসাদের এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছেন এমন ব্যক্তিরাই বৈঠকগুলোতে উপস্থিত ছিলেন। এসব বৈঠক ও ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিএনপি নেতা, মোসাদ এজেন্টসহ অনেকেই এখন গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন, যারা গ্রেফতারও হতে পারেন।