১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় আম

  • এসএম মুকুল

আম ফলটি কাঁচা ও পাকা উভয় ক্ষেত্রেই শরীরের জন্য উপকারী ফল। আম খেতে পছন্দ করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আম কেন জাতীয় ফল হলো না এমন প্রশ্ন অমুলক নয়। দেশী ফলের মাঝে শীর্ষ জনপ্রিয় এই ফলটি জাতীয় ফলের খেতাব না পেলেও কিচ্ছু যায় আসে না। কেননা আমের জনপ্রিয়তা সবসময়ই তুঙ্গে। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই আমের ফলন হলেও রাজশাহীর আমের আছে অনেক সুনাম। আনন্দের সংবাদ হলোÑ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আমের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিশ্ববাজারে রফতানি তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের কৃষিজ পণ্য আম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন আশার পথ উন্মোচন করল। আপনি কি জানেন, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম আম উৎপাদনকারী দেশ। এর আগে সেভাবে রফতানি না হলেও, বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে বাংলাদেশীরা প্রবাস জীবনযাপন করছেন তাদের চাহিদা পূরণের জন্যে হলেও বাংলাদেশের আম বিভিন্নভাবে বিশ্বে পরিচিতি পয়েছে। আমের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন বিশ্লেষক

-এস এম মুকুল

বিশ্ববাজারে বাংলার আম

আশা জাগানিয়া খবরটি হলোÑ বাংলাদেশের ল্যাংড়া ও আম্রপালি আম যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো রফতানি হয়েছে। এ খবরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর ও পশ্চিমের জেলাগুলোর আমচাষীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। পরে দেশের ৭ জেলার ৯ উপজেলা থেকেও আম রফতানি করা হবে। এফ এ ও’র মতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আম রফতানির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনাটি হলোÑ বাংলাদেশের আম যখন পাকে তখন বিশ্ববাজারে অন্য কোন দেশের আম আসে না। যুক্তরাজ্যের ক্রেতারা বিশ্বের অন্যতম সুস্বাদু ফল হিসেবে বাংলাদেশের আমকে বেশ পছন্দ করছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকমান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারলে বছরে ১ হাজার টন আম রফতানি করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে সাতক্ষীরার আম রফতানি শুরুর পর প্রতি সপ্তাহে ৪ মণ করে অন্য জেলার আম যুক্তরাজ্যের বাজারে রফতানি হবে। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও আম পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আম উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আম হতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান রফতানি পণ্য। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজার মিলিয়ে গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৮২১ টন আম রফতানি হয়েছে। বাংলাদেশ আম উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী সমিতি এ বছর তিন হাজার টন আম রফতানির আশা করছেন।

জাতীয় অর্থনীতিতে আম

রাজকীয় ফল আম পুষ্টিগুণের জন্য তো বটেই ফলটি এখন লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবেও জাতীয় অর্থনীতি শক্ত ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ আম উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী সমিতির হিসাবে, দেশে বর্তমানে আমের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার। আম ফলের ওপর নির্ভর করেই গড়ে

উঠেছে জুস শিল্প। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমের জুস এখন রফতানি হচ্ছেÑ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে দেশ ও রফতানি মিলে জুসের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার। জুসের বাজারে প্রাণ-আরএফএল, আকিজ, একমি, সজীব, ট্রান্সকম ও পারটেক্স গ্রুপ এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের জুস রফতানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশÑ আরব আমিরাত, আবুধাবি, দুবাই, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান ছাড়াও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ ইতালি, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের বাজারে। জানলে অবাক হতে হয়, শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে কেন্দ্র করে বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। বছরে কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জেই বিক্রি হচ্ছে প্রায় ছয় কোটি টাকার দুই লাখ আমের চারা। আমবাগান বৃদ্ধির পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত কর্মজীবীর সংখ্যাও বাড়ছে। আমের মৌসুমে এখানে ৮ থেকে ১০ লাখ লোক আম গাছ পরিচর্যা, বাগান পরিষ্কার রাখা, আম সংগ্রহ, বিক্রি ও পরিবহন ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।

উৎপাদনের অগ্রগতি

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশিহারে আমের ফলন বাড়ছে। ২০১২ সালে দেশে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল। এ বছর আম চাষ হয়েছে ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০০৫ সালেও বাংলাদেশে মাত্র আড়াই লাখ টন আম উৎপাদন করে বিশ্বের ১৪তম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ছিল।

এফ এ ওর হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সালে বাংলাদেশে ৮ লাখ ৯০ হাজার টন আম উৎপাদন করে। বিশ্বের অষ্টম আম উৎপাদনকারী দেশটি গত দু’বছরের মধ্যে উৎপাদন বেড়ে ১০ লাখ টনে উন্নীত হয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম স্থানে। তথ্য-উপাত্তে জানা গেছেÑ দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি আমগাছ রয়েছে। আশার খবর হলোÑ কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রতিবছর নতুন করে আট হাজার হেক্টর জমি আম চাষের আওতায় আসছে। বছর প্রতি আম উৎপাদন বাড়ছে ৫০ হাজার টন।

উল্লেখ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী একটি প্রতিষ্ঠান নাটোরে ১০০ কোটি টাকায় ৬০ হাজার টন আম কেনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মৌসুমে আম সংগ্রহ ও পাল্পিং কার্যক্রম শুরু করেছে। নাটোরে প্রতিষ্ঠানটির কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা এখানে প্রায় ৫ হাজার লোকের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আমের হাট- কানসাট

দেশের এবং রাজশাহী জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম বা হাট বসে কানসাটে। সড়কপথে এটাই সবচেয়ে বড় আমের বাজার। কানসাটের বিস্তর এলাকাজুড়ে মৌসুমে বসে বিশাল আমের বাজার। প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম এখান থেকে যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র। এর পরেই গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর বাজার আমের অন্যতম মোকাম। তবে এখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে উৎপাদিত গুটি আমের আধিক্য বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় প্রত্যেকটি পাইকারি আমের বাজারে ৪০ কেজিতে ১ মণের স্থলে ৪৫ থেকে ৫০ কেজিতে ১ মণ হিসেবে আম বিক্রি হয়।

আমের রাজধানী

আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থানকারি চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। পরের অবস্থানটি রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। এ কারণে এই দুই জেলাকে দেশের বাণিজ্যিক আম চাষের আদি ভূমি এমনকি রাজধানী বলা হয়। তবে আশির দশক থেকে চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নড়াইলেও বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ বিস্তার লাভ করে। গত কয়েক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামেও আম চাষ দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। এর প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে- বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে এ বছর প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ ছাড়া পঞ্চগড়, নাটোর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, পাবনা, দিনাজপুর, রংপুর, যশোর, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুরেও বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ হচ্ছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, জেলায় সবচেয়ে বেশি আমের চারা বিক্রি হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। এখানে স্বউদ্যোগে শতাধিক বিশেষায়িত নার্সারি গড়ে উঠেছে। ২৫০ প্রজাতির আমের মধ্যে বেশির ভাগেরই চারা পাওয়া যায় এই উপজেলার শাহবাজপুর এলাকার ধোবড়া বাজারে। একসময় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শুধু রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমের চাষ হতো। আম পাকত জ্যৈষ্ঠ মাসে অর্থাৎ জুনে। এখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও দেশের তিন পার্বত্য জেলাতেও আমের চাষ হচ্ছে। একই প্রজাতির হলেও আবহাওয়া ও মাটির পার্থক্যের কারণে আম পাকার সময় ৭ থেকে ১০ দিনের ব্যবধানে হয়। বর্তমানে দেশের ২৫টি উপজেলার চাষীদের আম চাষে সহায়তা দিচ্ছে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- আম রফতানির পরিমাণ বাড়াতে হলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে অধিক উৎপাদনশীল আম গাছ লাগাতে হবে। উন্নতজাতের মিষ্টি ও সুস্বাদু আমের চাষ বাড়াতে হবে। আম চাষে কৃষকদের সতর্কতা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আম চাষীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।