১৮ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাস্তার আবর্জনা নয় শুধু, মনের ময়লাও দূর হবে একদিন

রাস্তার আবর্জনা নয় শুধু, মনের ময়লাও দূর হবে একদিন
  • ঝাড়ু হাতে রাস্তায় স্বপ্নবাজ তরুণ দল

মোরসালিন মিজান ॥ দেশ নিয়ে দুঃখ করার কিছু কারণ তো আছেই। অনেকে বিষণ্ণ। ভারাক্রান্ত। সরকার নিয়েও হতাশা। এই দোষ ওই দোষ খোঁজা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ একই ব্যক্তি সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি তার নিজের যে দায়, যে দায়িত্ব, বেমালুম ভুলে থাকেন। অবস্থা যখন এই- রাজধানী শহর ঢাকার রাস্তায় বিশেষ ব্যতিক্রম চোখে পড়ছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার একদল তরুণ গভীর রাতে ঝাড়ু হাতে নেমে আসছেন রাস্তায়। সমমনারা একত্রিত হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক-ফুটপাথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ করছেন। গভীর রাতে আর সবাই যখন ঘুমে অচেতন, কর্তব্যপরায়ণ তরুণ যুবারা তখন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন। দেখান। চমৎকার উদ্যোগটির নাম- ঢাকা ক্লিন। যত দিন যাচ্ছে, এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। মুখগুলো দেখে মন সত্যি আশাবাদী হয়ে ওঠে। উদ্যোক্তারাও চান, দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে যাবে তাদের আন্দোলন। শুধু রাস্তার আবর্জনা নয়, মনের ময়লাও দূর হয়ে যাবে একদিন!

শহর ঢাকা পরিচ্ছন্ন করার অভিনব কর্মসূচীটি পরিচালিত হচ্ছে প্রতি বৃহস্পতিবার গভীর রাতে। রাত ১টায় শুরু হচ্ছে অভিযান। চলছে ভোর পর্যন্ত। দলটিকে প্রথম রাস্তায় দেখা যায় গত ২ জুন। এদিন শাহবাগ এলাকা থেকে হোটেল সোনারগাঁও মোড় পর্যন্ত ঝাড়ু দেয়ার কাজ করা হয়। এর পরই রমজান। সারাদিন রোজা রাখার পর রাত জেগে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা সম্ভব হবে তো? কিছুটা ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু মনে জোর ছিল। সকলের সিদ্ধান্তে রোজার মধ্যেও অব্যাহত রাখা হয় ঢাকা ক্লিন কর্মসূচী। সে অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আবারও মাঠে নামে দলটি। আগের সপ্তাহে যেখানে এসে শেষ হয়েছিল, সেই সোনারগাঁও মোড় থেকে কাজ শুরু করে আবার।

রাত ১২টার পর সার্ক ফোয়ারা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মহারণে নামার জোর প্রস্তুতি চলছে। কর্মীদের প্রত্যেকের গায়ে শহর পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান সংবলিত টি-শার্ট। মাথায় বিশেষ ধরনের টুপি। নাকে অভিন্ন দেখতে মাস্ক। হাতে গ্লাভস। এভাবে ক্রমেই এক চেহারায় দৃশ্যমান হচ্ছিলেন সবাই। পাশের বোর্ডে নিজেদের নাম লিপিবদ্ধ করছিলেন। সংখ্যায় ৬০ জনের মতো।

কিছু সময় পর সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন ফরিদউদ্দিন মিলন। হ্যাঁ, মিলনের মাথা থেকেই আসে ঢাকা ক্লিন করার পরিকল্পনা। দলের সদস্যদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ভরপুর প্রাণের যুবক বলেন, আমরা আজ সোনারগাঁও মোড় থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাথ পরিষ্কার করব। কার্যক্রম এখন শুরু হয়ে কোন বিরতি ছাড়াই সেহ্রির আগ পর্যন্ত চলবে। সংক্ষিপ্ত বলা শেষে সকলকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নামেন তিনি।

কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের যে পাশে কবির ম্যুরাল, সেই পাশটি বেছে নেয়া হয় প্রথম। রাস্তায় ঝাড়ু ছুঁয়াতেই অদ্ভুত দৃশ্য। ধুলোবালি হাওয়ায় বেদম উড়তে থাকে। কাছাকাছি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল হয়ে যায়। কর্মীরা সব প্রস্তুতি নিয়ে নেমেছিলেন। তাই রক্ষা। ঝাড়ু দিতে দিতে তারা এগিয়ে চলেন। রাস্তার ফুটপাথসংলগ্ন অংশ ও ফুটপাথে তখন প্রচুর ময়লা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বিভিন্ন স্থানে সেগুলো স্তূপাকারে জমানো হচ্ছিল। পেছন পেছন আসা ট্রলি সেগুলো তুলে নিচ্ছিল। কাওরান বাজারের কাছাকাছি আসতেই ময়লার পরিমাণ বেড়ে যায়। পূর্ণিমা সিনেমা হলের সামনের জায়গাটায় আবার কাদা জমে ছিল। সেই কাদাজলে ভাসছিল পলিথিন সিগারেটের প্যাকেট কলার খোসা ইত্যাদি। এগুলো সরাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলেন অনভিজ্ঞ কর্মীরা। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা রোড ডিভাইডারেও দেখা যাচ্ছিল প্রচুর ময়লা। নাছোড়বান্দা তরুণরা কাঁটাতারের ভেতর সতর্কতার সঙ্গে হাত ঢুকিয়ে সেই ময়লা বের করে আনছিলেন।

একই সময় খুব কাছ দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছিল ভারি যানবাহন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাওরানবাজারে ঢুকছিল দানবীয় চেহারার ট্রাক। সব উপেক্ষা করেই চলছিল ঢাকা ক্লিন। ডেইলি স্টার ভবনের কাছাকাছি একটি ফ্লাইওভারেও ঝাড়ু হাতে উঠে গেলেন কয়েকজন। তার পর ফার্মগেট। গোটা এলাকা যেন ময়লার ভাগাড়। লম্বা সময় ধরে কাজ করার পর এমন ময়লা আবর্জনা দেখে যে কারও আতঙ্কিত হওয়ার কথা। বাস্তবে তেমনটি দেখা গেল না। বরং সবাই এসে পৌঁছার পর নব উদ্যমে চাললো অভিযান। তবে পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব হলো না। ততক্ষণে সেহ্রির সময় হয়ে গেছে যে! অগত্যা কিঞ্চিৎ আক্ষেপ নিয়েই গুটিয়ে নিতে দেখা গেল সব। জানিয়ে দেয়া হলো, পরবর্তী বৃহস্পতিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলবে ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণী পর্যন্ত।

পুরো কাজ সঙ্গে থেকে দেখার পর কৌতুহল বেড়ে যায়। বিভিন্ন প্রশ্ন আসে মনে। জবাবে ক্লিন ঢাকার প্রধান উদ্যোক্তা ফরিদউদ্দিন মিলন বলেন, ঢাকা আমাদের রাজধানী শহর। প্রিয় এই শহরের যেদিকে তাকানো যায়, ময়লা। মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যেত। হঠাৎ একদিন দেখলাম গোটা শহরের ফুটপাতে ময়লা ফেলার জন্য বিন বসানো হয়েছে। চমৎকার একটি উদ্যোগ। অথচ কাজে আসছিল সামান্যই। বিন রেখে পাশে ময়লা ফেলা হচ্ছিল। তখন মনে হলো, সচেতনতার মারাত্মক অভাব। মানুষকে সচেতন করতে হবে। সে লক্ষ্যে বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। কথা বলি। ফেসবুকে ক্লিন ঢাকা নামে পেজ খোলা হয়। ইভেন্টের ঘোষণা দেয়া হয়। তাতেই অবাক হওয়ার মতো সাড়া! রাস্তায় নেমে আসি আমরা।

খন্দকার শাহীনুর রহমান নামের আরেক সংগঠক বলেন, সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের সমালোচনা তো করাই যায়। কিন্তু নিজেদেরও তো কিছু দায় আছে। সেই বোধ থেকেই ঢাকা ক্লিন কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নামা। আমরা শহর শুধু পরিষ্কার করছি না, শহরকে ভালবাসার আহ্বান জানাচ্ছি। সবাইকে সচেতন করতে কাজ করছি।

কর্মসূচীটির সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছেন। উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ শিল্পী। ছবি আঁকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। তাদের একজন সবুজ দাস। কিছুক্ষণ আগে পরিষ্কার হওয়া ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। চারুকলার শিক্ষার্থী বললেন, আমাদের সঙ্গে আছেন ১০ থেকে ১৫ জন শিল্পী। শিল্পীরা সুন্দরের চর্চা করেন সব সময়। ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করার কাজটিকেও সুন্দরের চর্চা বলে জ্ঞান করেন বলে জানান সবুজ।

আরেক শিল্পী শাহনুর মামুন। জলরঙে সুন্দর ছবি আঁকেন। তিনটি একক প্রদর্শনীও সম্পন্ন করেছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ছবি আঁকি। বুড়িগঙ্গার পারে নৌকা করে ছবি আঁকতে গিয়েছিলাম। দুর্গন্ধে বেশি সময় টিকতে পারিনি। এমন আরও অনেক বাজে অভিজ্ঞতা আছে। আমি ওসব ভুলে সোনার বাংলার সুন্দর রূপটি তুলে ধরতে চাই। আঁকতে চাই। এ কারণেই তুলি রেখে ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমেছেন বলে জানান তিনি। একই কাজে যোগ দিয়েছেন চারুকলা অনুষদের শিক্ষক নাজির খান খোকন।

অন্য পেশার লোকও নেহায়েত কম নয়। মঞ্জুরুল লবী পেশায় ব্যাঙ্কার। বললেন, প্রচুর ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু ফলপ্রসূ একটি পরিবর্তনের আশায় এখানে এসেছি।

আশরাফুল আলম কাজ করেন একটি উন্নয়ন সংস্থায়। তার আগে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। বললেন, উদ্যোগটির সঙ্গে থাকার এটিও একটি কারণ। সারাদিন রোজা রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কতটা পারব শঙ্কিত ছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আরও কয়েক ঘণ্টা হলেও সমস্যা হবে না!

দলে একজন সঙ্গীতশিল্পীরও দেখা মিলল। পাপী মনা নামে বেশ পরিচিতি। বলেন, গানের মাধ্যমে কিছু করার চেষ্টা করছি। এখন মনে হচ্ছে ঝাড়ু হাতেও করা যায়। দুপুরে এক বন্ধুর কাছে খবর পেয়ে রাতে চলে এসেছি। মানুষ যেহেতু, মৃত্যুর আগে কিছু ভাল কাজ তো করে যেতে হবে। রাস্তা পরিষ্কার করা তেমন একটি কাজ বলেই মনে করেন তরুণ গায়ক।

অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, দলে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছেন স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। নীলক্ষেত হাই স্কুল থেকে এসেছিল ৬ ছাত্র। তাদের একজন রিজওয়ান। হালকা পাতলা গড়ন। মিষ্টি দেখতে। ময়লাভর্তি ট্রলি ঠেলছিল। যেন খুব অভ্যস্ত। আদতে কেমন অভিজ্ঞতা? জানতে চাইলে হাসল। বলল, এত রাতে আগে কোনদিন বাড়ির বাইরে আসিনি। এবার প্রথম। বাবা মা আসতে দিল? জবাবে আশিক বলল, অনেক বোঝাতে হয়েছে। ভাল কাজ নিশ্চিত হওয়ার পর আসার অনুমতি পাওয়া গেছে। রিপন, বোরহান, হজরত, আরিফ, ইস্রাফিলরা পরবর্তীতেও কাজটি করতে চান বলে জানায়।

ইমন আবার খেটে খাওয়া তরুণ। একসময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চায়ের দোকান ছিল। এখন অন্য কাজ করেন। চলে এসেছেন তিনিও। বললেন, সারাদিন কাজ করেছি টাকার জন্য। এখন ভাল কাজ। এই কাজে পয়সা পামু না। পরের কথাটি মনে রাখার মতো। তিনি বলেন, সব কাজ পয়সা দিয়ে হয় না। ইমনের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই জানা গেল ফয়েজ বিন আকরাম নামের আরেক কর্মী আসার পথে পুলিশী বিড়ম্বনায় পড়েছেন। তাকে ছাড়িয়ে আনতে যেতে হলো কয়েকজনকে। এমন ছোট খাট বিড়ম্বনা সত্ত্বেও কাজ করে সবাই খুশি।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রশংসনীয় উদ্যোগটির খবর যত ছড়িয়ে পড়ছে ততই বাড়ছে সমর্থন। প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। বহু মানুষ এ কাজে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছে ‘ঢাকা ক্লিন।’ যার যখন খুশি কর্মসূচীতে যোগ দিতে পারবেন বলে জানান সংগঠকরা। তাদের মতে, সবাই এগিয়ে এলে রাস্তা নয় শুধু, মনও পরিষ্কার হয়ে যাবে! আর তখন শহর গ্রাম দেশ কোনটাই নোংরা হবে না। সেদিনটি পর্যন্ত অভিযান পরিচালনার ইচ্ছের কথা জানায় স্বপ্নবাজ তরুণের দল।

নির্বাচিত সংবাদ