১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উকিল মুন্সীর প্রাসঙ্গিকতা

  • মুহম্মদ আকবর

বাউল দর্শন সম্পর্কে অবগত না হলেও বাউল গানের সঙ্গে বেড়ে উঠা বাংলাভাষী প্রায় সকলের। চূড়ান্ত পর্যায়ে বাউল দর্শন সবখানে এক হলেও উপস্থাপন প্রক্রিয়া স্থান ভেদে ভিন্ন। ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাউল সাধকরা সংসার ধর্মে বিশ্বাসী। সমকালীন সমাজ ভাবনার কিঞ্চিত দূরে থেকে, গান সাধনা করে পুনরায় সংসারে মনোনিবেশ করেন তারা। এজন্য তারা গৃহী বাউল হিসেবে পরিচিত। তথাপি, সমাজের অন্য দশটা মানুষের মতো শ্রম ও সাধনা দিয়ে পারিবারিক উন্নয়নের কোন ভাবনা তাদের নেই। প্রয়াত বাউলদের বংশধরদের দিকে তাকালে আমরা এর প্রমাণ পাই। যদিও জালাল খাঁ’র উত্তরসূরি এ বিবেচনায় ভিন্ন। তাঁর তৃতীয় জন্মের প্রায় অনেকেই বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অন্যদিকে, নদীয়ার ভাবে প্রভাবিত কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউলরা প্রচলিত সংসারে বিশ্বাসী নন। তারা গৃহত্যাগী বাউল বলে পরিচিত।

তবে, যে যেখানেই বাস করুক কিংবা যেভাবেই জীবনযাপন করুক না কেন, মানুষ ও সমাজের প্রতি তাদের দরদের কমতি নেই। বলা যায়, মানব-সমাজের জন্যই তারা বাউল। এই মানব সন্তানকে প্রাধান্য দিয়ে গান গাইতে গিয়ে সুর ও বাণীর মহিমায় মানুষকে যেমন পাগল করেন, তেমনি অনাকাক্সিক্ষতভাবে কখনো কখনো ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে সংঘাতও বাধে; সে অন্য প্রসঙ্গ। কেন সংঘাত তৈরি হয়, কেন হয় না এ নিয়ে ব্যাপক চর্চা হয়েছে, আরও হবে। আলোচনা-সমালোচনার মাত্রা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। আমরা আমৃত্যু সে পরিণতি দেখার অপেক্ষায় থাকব। আপাতত এতটুকু বলা যায়, এ দ্বন্দ্ব অনেকাংশেই একপাক্ষিক। কারণ, বাউলের পক্ষ থেকে কোন দাবি নেই, দ্বন্দ্ব নেই।

মূল প্রসঙ্গে আসি। উকিলের মর্মবাণী, তত্ত্বকথা ও সুর নিয়ে বেড়ে উঠা একজন শ্রোতা হিসেবে আমার উপলব্ধিজাত বিষয়টি এ লেখায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। যুগ বিভাজনের দৃষ্টিতে মধ্যযুগের শুরু থেকে এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের আগমন ঘটে এবং ইসলামের মানবিক আহ্বানে মুসলমানের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। এই ইসলাম ধর্মানুসারীরা একান্তজীবনে গান আগলে নিয়ে থাকলেও সমুষ্টিগত জীবনে গানকে হেয় করেই দেখেছে শুরু থেকে। তাদের ধারণা গান-বাজনা বেদাতি কাজ। তবুও, হাজার বছর ধরে রাতের পর রাত জেগে গান করেছেন বাউলরা। আর পিনপতন নীরবতায় শুনেছেন গ্রাম ও নগরবাসী মানুষ।

বাউল সাধকরা যাপিত জীবনে বা কর্মে প্রত্যক্ষ আহ্বান করেন না। বাউলের সম্মোহনী ও প্রেমিক সত্তা দেখে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মনে প্রেমিক সত্তা জেগে উঠে অতঃপর বাউলের গান তার মুখে তুলে নেন, লালন করে একসময় নিজেই বাউলরূপে প্রকাশ লাভ করেন। আরোপিত চিন্তা থেকে নয়, চাপিয়ে দেয়া জ্ঞান বা শিক্ষা-দীক্ষা থেকে নয়, বাউলের চিন্তাকে নিজের বোধের ছাঁচে যাচাই-বাছাই করে আরেক বাউল বা বাউল অনুরাগী মানুষের আগমন ঘটে। আর এভাবেই বাউল বা বাউল সমঝদার মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুড়ির বোয়ালীগ্রামে ১৮৮৫ সালের ১৩ জুন জম্ম নেয়া উকিল মুন্সী এভাবেই একটি ধনাঢ্য মুসলিম পরিবার থেকে ক্রমশ বাউল গানের দিকে ধাবিত হন। শৈশব-কৈশোরে ঘেটুগানে যুক্ত ছিলেন, পরে গজল (ইসলামিক গান) অতঃপর পরিণত বয়স থেকে আমৃত্যু বাউল সাধনায় মগ্ন ছিলেন। তার গানে যাপিত জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনার কথা আছে বটে কিন্তু প্রতিটা গানের পরিণতি মানব মুক্তির ঈঙ্গিত করে। কখনো ফেলে আসা জীবনে ভুলের মাসুল, কখনো ইহজাগতিক প্রেম যা ধর্ম বিচ্ছুত নয়, কখনো বা পরলোকিক প্রেম যা লৌকিতাবর্জিত নয়। সঙ্গীত সাধনার এই মিথস্ক্রিয়া তার সমকালের মানুষের কাছে দুর্ভেদ্য মনে হয়নি এবং নিজ নিজ বিশ্বাসে আঘাত করেনি। আর সেখানেই উকিলের স্বাতন্ত্র্যতা ও সমকালীন সঙ্কটে উকিলের প্রাসঙ্গিকতা।

আজকের দিনে লোক-গবেষক বা লোক-বিজ্ঞানীরা উকিল মুন্সীকে উকিলের সমকালের মানুষ থেকে পৃথক করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উকিল নিজে তার সমকালে এলাকার কোন ধর্ম বর্ণের মানুষ থেকে পৃথক ছিলেন না। উকিল-ভক্তরাও তাঁকে তাদের চিন্তার ভিন্ন মানুষ মনে করেনি। বক্তা ও শ্রোতার এই আদান-প্রদান এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল যাতে করে উকিলের গান শুনতে সামাজিকভাবে কোন বিধি-নিষেধের সম্মুখীন হতে হয়নি। একইসঙ্গে মসজিদে ইমামতি করেছেন আবার গ্রামগঞ্জের মঞ্চে মঞ্চে পালাগানও করেছেন। এলাকাবাসীকে বলতে শোনা যায়, উকিল মুন্সী মসজিদে বসে একতারা বাজিয়ে গজল গাইতেন। তখন তাঁকে গ্রামের মানুষ এতটাই শ্রদ্ধা করত যে, অনেকের আপত্তি থাকলেও এ কাজে নিষেধ করার সাহস কারও ছিল না। নাম না জানা এক লোক এ বিষয়ে থানায় অভিযোগও করেছিলেন। সে অনুযায়ী পুলিশ উকিলের বাড়িতেও যান। পুলিশের ডাকে উকিল গান ধরে ঘরের বাইরে আসেন যে গানে পুলিশ তাঁর ভেতরে লুকানো কথার জবাব পান। প্রথম দিন কিছু না বলে চলে যান, পরে

বিভিন্ন মঞ্চে লুকিয়ে লুকিয়ে উকিলের গান শুনেন। এক পর্যায়ে সেই পুলিশ তাঁর মুরিদ হয়ে যান।

উকিলের দর্শনÑ ক্ষোভের বিপরীতে ক্ষোভ নয়, চাই যুক্তি। অস্ত্রের বিপরীতে অস্ত্র নয়, প্রয়োজন মানবিক-মানসিকতা। এটা থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি হাওড় অঞ্চলের লাখ মানুষের আরাধ্য পুরুষ উকিল মুন্সী।

সঙ্কট তো প্রতিকালেই ছিল। এখনও আছে। যেহেতু সঙ্কট সমাজ থেকে উৎসারিত সুতরাং তা সমাজেই মোকাবেলা করবে এভাবে ভাবা ভুল নয়; সমাজের কারও না কারও শুরু করতে হয় বা কারও না কারও কাছে আশ্রয় নিতে হয়। আমাদের সঙ্কট কোথা থেকে তৈরি হচ্ছে মোকাবেলার জন্য কার নিকট আশ্রয় নিচ্ছি সেটাই প্রশ্ন।

বর্তমান দ্বন্দ্বের পক্ষে-বিপক্ষে আছে প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল নামক দুটি শব্দ। এই দুটি শব্দ উচ্চারণ করে ক্লান্ত হলে সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক দুটি দাঁড় করায়। পরিণামে এ শব্দের মাত্রাতিরিক্ত উচ্চারণে আহত ও নিহত হচ্ছে কত তাজা প্রাণ! রক্ত হাতে নিয়ে প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হচ্ছে কত মানুষ। প্রতিবাদী মানুষ প্রকাশ্যে অজ্ঞাত শত্রুকে খুঁজে বেড়াচ্ছে আবার অজ্ঞাত মানুষটি দৃশ্যমান মানুষটিকে সহজেই পেয়ে পুনরায় খুন হচ্ছে। উভয়পক্ষের জাতিবিনষ্টকারী এই উগ্র চিন্তা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা প্রতিদিনই দেখছি। আসল সঙ্কট চিহ্নিত না করে সম্মিলিতভাবে আমাদের দেশের পুলিশ প্রশাসনকে দায়ী করছি। ফলে, বন্ধুপ্রতিম পুলিশের প্রতি অকারণে সাধারণ মানুষের অভিমান বাড়ছে।

উকিল মুন্সীও তাঁর গানে সমকালীন সমাজকে ‘চোরের কারখানা’ বলেছিলেন। উকিলের উপলব্ধি মানুষ নিয়েছে। কারণ যুক্তিতর্ক দিয়ে তিনি তা প্রমাণ করেছিলেন।

উকিল মুন্সীর মতো বিরোধী মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। স্নেহ দিয়ে বাহাস করেছেন। অবশেষে উভয়ে এক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

হয়তো তিনি ভেবেছিলেন বিপদগামী মানুষ সমাজেরই অংশ। ফলে উভয়ে মিলে এক হয়েছিল। কিন্তু আজ বিরাটসংখ্যক বিপদগামী জনগোষ্ঠীকে দূরে রেখে আমরা যে তাদের বিরুদ্ধে নেমেছি তা কি সঙ্কট সমাধানের জন্য সঙ্গত? চলমান রাজনীতির প্রশ্নে হ্যাঁ-সূচক জবাব হতে পারে কিন্তু পরিস্থিতি বিচারে মোটেই নয়। জঙ্গীদের আপত্তিকর নানাবিধ কার্যক্রম নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন প্রয়াত তারেক মাসুদ।

তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন ‘যারা বিপথে গেছে কিংবা বিপদে আছে তারা আমার ভাই তাদের ভালবেসে কাছে নিতে হবে।’

প্রায় অর্ধশত বছর আগে উকিল মুন্সীও তাই করেছিলেন। তাঁর চিন্তা বিরোধীদের কাছে রেখেছেন। ভালবেসেছেন। বাহাস করেছেন। একপর্যায়ে যারা তাঁর প্রতি অবিচার করেছিল তাদের অনেকেই শিষ্যত্ব গ্রহণ করে উকিলকে পীর মনে করেই বাকি জীবন কাটিয়েছে। উকিলের প্রতি সর্বমহলে শ্রদ্ধা করার আরেকটি কারণ হলোÑ তিনি যা বিশ্বাস করেছেন তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করেছেন। একান্ত নিকটের কেউই উকিলের মধ্যে স্ববিরোধিতা পায়নি।

কিন্তু একবারও কী ভেবেছি আমরা যা চর্চা করি তা মানুষের জন্য কী না? প্রিয় বাক্য লিখছি বটে কিন্তু ব্যক্তি জীবনে তা প্রয়োগ করছি কী না? পরিমাপ করেছিÑ সাধারণ মানুষ থেকে আমাদের দূরত্ব কতটুকু? ব্যক্তি জীবনের অশৃঙ্খলতা যখন আকাশচুম্বী তখন তার কোন লেখা তাৎক্ষণিক ভাল লাগতে পারে, প্রয়াত হলে ইতিহাস তাকে সাদরে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু বিতর্কিত ব্যক্তি জীবন এই লেখাকে ছাপিয়ে যায়। আর তখনেই সমকালীন সঙ্কট নিরসনের চেষ্টা বৃথা হয়। তৈরি হয় আরেক সঙ্কট। সভ্যতার সঙ্কট বটে।

এই স্ববিরোধিতা নতুন নয়; অতি পুরাতন। যে কারণে বাঙালীর প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর দর্শন বলতে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর কলকাতায় ভারতীয় দর্শন সভার মহা-অধিবেশনে সভাপতির বক্তৃতায় চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ঙঁৎ চবড়ঢ়ষব অভিভাষণে বাউলদের যাপিতজীবন ও তাদের কর্ম ছাড়া কিছু বলেননি। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে তিনি বাঙালীর দর্শন বলতে বাউলদের বিষয়েই বলেছিলেন। তাঁর কাছে তখনকার সময়ে কোন একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির চেয়ে বাউল সাধকরাই বেশি প্রাসঙ্গিক ছিল। রবি ঠাকুরের এ উপলব্ধি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যদি রবীন্দ্রনাথকে মানি। যদি তার সাহিত্য আমাদের আশ্রয়ের স্থান হয়। তাহলে, বলব বাউলই আমাদের আশ্রয়ের জায়গা। তাদের যাপিতজীবন হবে আমাদের কাছে আদরণীয় ও অনুকরণীয়। উকিল মুন্সীর মতো বাউল সাধকদের উত্তরসূরিদের কাজ হবে সমকালে থেকে আগামীর জন্য কাজ করা। সমকাল থেকে সরে নয়। আমাদের প্রগতিশীল চর্চার বিকল্প নাই তবে তা যেন মানুষ বিচ্ছিন্ন কোন চর্চা না হয়।