২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাজেট দেশকে আরও এগিয়ে নেবে- সংসদে সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

বাজেট দেশকে আরও এগিয়ে নেবে- সংসদে সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রস্তাবিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে, দেশের দারিদ্র্য বিমোচন হবে, মানুষ আরও উন্নত জীবন পাবে, যা ইতোমধ্যে দেশের মানুষ পেতে শুরু করেছে। তাই এ বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের প্রতি আমার আহ্বানÑ আসুন আমরা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাই। ২০২১ সালের আগেই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নতসমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলি। বাংলাদেশ আজ সব সূচকে অনেক বড় বড় দেশের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই; কেউ-ই তা রুখতে পারবে না।

বুধবার স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশে কোন জঙ্গী-সন্ত্রাসীর স্থান হবে না। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কাউকে কোন জঙ্গী-সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে দেব না। দেশে কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে। আর এসব ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসছি। এখানে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটাবার নানারকম ষড়যন্ত্র হয়েছে। সেগুলো সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থা যথাসময়ে তথ্য দিয়েছে। আমরা সেগুলো ধরেছি। এধরনের বহু ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-সফলতার চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর আগে বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। অর্থমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর দীর্ঘ আলোচনার অবসান হয়। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রস্তাবিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট পাস হবে।

প্রধানমন্ত্রী আলোচনার সময় তৈরি পোশাকের উৎসে কর হ্রাসের প্রস্তাব করে বলেন, তৈরি পোশাকের উৎসে কর কমানোর জন্য পোশাকশিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল। রফতানি আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে তাদের অনুরোধ বিবেচনা করে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের প্রস্তাব করছি। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের প্রেক্ষিত্রে অর্থমন্ত্রী উৎসে কর শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কর্তনের ঘোষণা দেন।

সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া গুপ্তহত্যার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত জোট প্রকাশ্যে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার মতো বড় সন্ত্রাসী ঘটনা আর কী হতে পারে? তিনি বলেন, এরপর যে গুপ্তহত্যা যেটা আগেই আমি সন্দেহ পোষণ করেছিলাম। হঠাৎ এই গুপ্তহত্যা কেন? মাদারীপুরে একজন শিক্ষককে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করা হলো। মাদারীপুরবাসী সাহসের সঙ্গে আঘাতকারীকে ধরে ফেলে। হামলাকারীকে নিয়ে তারা আরও লোককে ধরতে গিয়েছিল, সেটা ক্রসফায়ার বা যাই হোক সে গুলি খেয়ে মারা গেছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, যে একজন কলেজ শিক্ষককে হত্যা করতে গিয়ে জনগণের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ল, তার জন্য খালেদা জিয়ার এত মায়াকান্না কেন? এটা আমার একটা প্রশ্ন? তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? হাঁড়ির ভাত সিদ্ধ হলে একটা টিপলেই বোঝা যায়। তাই একটা ঘটনা থেকেই বোঝা যায় গুপ্তহত্যার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের একটা সম্পর্ক রয়েছে। যখন তারা জনগণের রুদ্ররোষের সম্মুখীন হয়েছে, তখনই তারা গুপ্তপথে এ সমস্ত ঘটনা ঘটিয়ে দেশে একটা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।

খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রোজা-রমজানের দিন আমরা ইফতার পার্টিতে যাই আল্লাহ-রাসূলের নাম নিতে। আর ওই মহিলা (খালেদা জিয়া) সেখানে গিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন গিবত গাওয়া, মানুষের বদনাম করা আর মিথ্যা ও অসত্য কথা বলেন। এটাই হচ্ছে তার চরিত্র। আমি এর বেশি কিছু বলতে চাই না। জনগণই এর বিচার করবে। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, আজ বাংলাদেশ সারাবিশ্বে একটা সম্মানজনক অবস্থানে এসেছে। ইনশাআল্লাহ আমাদের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে সক্ষম হব।

দেশবাসীকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতেই ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এ বাজেট দেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রতিবছরের বাজেট বাস্তবায়নে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এর ফলেই দেশের অর্থনীতি এখন অত্যন্ত গতিশীল। বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। পরনির্ভরশীলতা এখন আমাদের নেই। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যেখানে বিদেশী অনুদানের পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৪ ভাগ। সেখানে বর্তমানে তার পরিমাণ হচ্ছে মাত্র ১ দশমিক ৬ ভাগ। দেশের ৯০ ভাগ উন্নয়নের কাজ আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই বাস্তবায়ন করছি। কারও মুখাপেক্ষী নয়, আমরা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করেছি।

সংসদ নেতা বলেন, বিশ্বমন্দার মধ্যে আমরা ক্ষমতা গ্রহণ করেও প্রতিবছর দেশের প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ সবদিক থেকে এখন এগিয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা ৬ ভাগের বলয় থেকে বেরিয়ে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ০৫ উন্নীত করেছি। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির টার্গেট ৭ দশমিক ২ ভাগ করা হয়েছে, ইনশাআল্লাহ এটাও আমরা অর্জন করতে পারব। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণ হয়। আর্থ-সামাজিক সূচকে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের সঙ্গে আমরা তালমিলিয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করেছি।

পরমাণু বিদ্যুত কেন্দ্র নিয়ে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের আশঙ্কার জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের সকল পরমাণু বিদ্যুত কেন্দ্রই এখন অনেক আধুনিক হয়ে গেছে। তাই এখানে দুর্ঘটনা ঘটার কোন সুযোগ নেই। তবুও সবদিক বিবেচনা করেই এ বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে যেসব বর্জ্য হবে তা রাশিয়া নিয়ে যাবে। ফলে দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। বরং পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করব।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ করে বলেন, এ বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে অনেকে হইচই করছেন। প্রাকৃতিক পরিবেশের এতটুকু ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে আমরা সেটা করতাম না। আর বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব অনেক। দিনাজপুরসহ বিশ্বের অনেক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে তো প্রাকৃতিক কোন ক্ষতি হচ্ছে না। ফলে রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ হলে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার কোনই সম্ভাবনা নেই।

মেট্রোরেলের পর আগামীতে পাতাল রেল এবং ইলেকট্রিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ইতোমধ্যে মেট্রোরেল গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছি, ২৬ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েও নির্মাণ হচ্ছে। সারাদেশে আমরা রেল যোগাযোগ গড়ে তুলব, দক্ষিণাঞ্চলেও ট্রেন যাবে। আর ঢাকার যানজট নিরসনে ভবিষ্যতে পাতাল রেল ও ইলেকট্রিক টেন চালু করারও পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সশস্ত্রবাহিনীকে বিশ্বের উন্নত দেশের উপযোগী করে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে নৌবাহিনীর জন্য সাবমেরিন খুব শীঘ্রই আনা হচ্ছে। এ সময় বিরোধী দলের আসনে বসে থাকা সাবেক স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, অতীতে যারা সামরিক স্বৈরাচার ছিলেন, তারা সামরিক বাহিনীকে শুধু তাদের ক্ষমতা দখলের কাজে ব্যবহার করেছেন, সশস্ত্রবাহিনীর উন্নয়নে কোন কাজ করে যাননি।

পুঁজিবাজার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেন ॥ আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী দেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ে একটু বলতে চাই। কারণ এটা নিয়ে অনেক কথা আসে। পুঁজিবাজারকে আমরা শক্তিশালী করতে চাই। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার উন্নত অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত। আর একটি স্থিতিশীল স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক, দক্ষ জাতীয় অর্থনীতিতে যথেষ্ট অবদান সৃষ্টিকারী এক পুঁজিবাজারের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে লেনদেন, কারচুপি, অনিয়ম ও যথাযথ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের সফল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পতির স্বার্থে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ফিন্যান্সিয়াল রিপোটিং এ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অল্টারনেটিভ ইনভেসটিভ রুল-২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে তথ্য-প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ এ্যান্ড কমিশন পাবলিক ইস্যু রুল-২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আইপিও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আনয়ন করা সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে আরও বলেন, পুঁজিবাজারের ভিত্তিকে আরও মজবুত করার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারী তথা সমস্ত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে যুবক সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনিয়োগ শিক্ষা কর্মসূচী কার্যকর করা হয়েছে। এ সকল পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করেছি, কারণ যাতে পুঁজিবাজার নিয়ে মানুষের সন্দেহ দূর হয় এবং এটা ভালভাবে চলতে পারে।