২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী হামলা

গুলশানের একটি রেস্তরাঁ এবং শোলাকিয়ার ঈদের জামাতের কাছে জঙ্গী হামলা বাংলাদেশে সন্ত্রাসের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গণজাগরণ মঞ্চের ঐতিহাসিক সূচনার পর ব্লগার হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে নবপর্যায়ে জঙ্গী-সন্ত্রাসের শুরু। পরে হেফাজতী সন্ত্রাস বিস্তৃত হলে ধারণা হচ্ছিল মাদ্রাসার ছাত্ররাই জঙ্গী হচ্ছে। তারাই টার্গেট কিলিং করছে। যদিও তাদেরকে পরিচালিত করছে একাধিক চিহ্নিত জঙ্গী সংগঠন। জুমাতুল বিদার রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গী হামলাকারীদের পরিচয় জানার পর সমাজ নড়েচড়ে বসেছে। কারণ তারা প্রায় সবাই ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ। বার্ষিক প্রধান উৎসব ঈদের সময়টায় ঈদের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের মনে দেশের তরুণ প্রজন্ম নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আমার সন্তান যদি ওই জঙ্গীদের খপ্পরে পড়ে! কিংবা আমার সন্তান তার সহপাঠীর তলোয়ারে কাটা পড়বে না তো!

জঙ্গী সংগঠনগুলো বরাবর শিক্ষিত তরুণদের দলে ভিড়ানোর জন্য অনলাইনকে ব্যবহার করে আসছে। তাদের আদর্শসংবলিত বিভিন্ন লিফলেট, নিবন্ধ পাঠিয়ে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে। রোমান্টিসিজম বা হেরোইজমে আকৃষ্ট করা হয়। অনলাইনে তারা যা পাঠায় সবই ইংরেজীতে। ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য তা পড়া ও বোঝা সহজ। তারা তা পড়ে এবং কখনও কখনও তাতে আকৃষ্ট হয়। হতাশ ও কম ধর্মপ্রাণ তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে আইএস এভাবেই সদস্য সংগ্রহ করছে। আইএস এমন সব তরুণকে টার্গেট করে যারা জীবন নিয়ে খুবই হতাশ কিংবা যারা ইসলাম সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখে না। তাদের দলে টানা এবং আইএসের মতবাদ মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া অনেক সহজ বলে মনে করা হয়।

বিদায় হজের ভাষণে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা) মানব জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কর না।’ অথচ আজ আমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দেখছি। এই দেশ চিরকালই ছিল পরধর্মসহিষ্ণু ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষের দেশ। ‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন- তোমার জন্য তোমার ধর্ম, আমার জন্য আমার- পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানের এই বাণীকে শিরোধার্য করেছিল এদেশের মানুষ। সত্য প্রকাশের দায়বোধ থেকে বলতেই হবে জাতির জনককে হত্যার পর এ দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামরিক সরকার ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম চাপিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস শুরু করে। পঁচাত্তরের পর নারীদের একটি অংশ হিজাব পরিধান করতে শুরু করে এবং বর্তমানে সেটি বহুলাংশে বেড়ে গেছে। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ও অপব্যাখ্যা চলছে। একটি সমাজ একদিনে উগ্র হয়ে ওঠে না। ধীরে ধীরে তার ভেতরে উগ্রতা আরোপিত হয়। ইতোমধ্যে বেশ কজন নিখোঁজ শিক্ষিত তরুণের ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রচারিত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে তারা প্রশিক্ষন নিয়ে জঙ্গী হামলা চালাতে পারে। গুলশান হত্যাকান্ডের পর নানা মতবাদ শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতাশাগ্রস্ত তরুণরা জঙ্গীবাদের দিকে ঝুঁকছে। শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশের কথাও বলা হচ্ছে। এত সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। দেশের শিক্ষিত তরুণ, যারা অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তান, তারা কেন জঙ্গীবাদের শিকার হয়ে নিজেদের জীবন তুচ্ছ করছে- তার জবাব পেতে হলে সমাজের হৃৎপিণ্ডে আমাদের কান পাততে হবে। একজন সমাজতাত্ত্বিক কিংবা একজন মনোবিদ কিংবা রাজনীতিবিদের কাছ থেকে এর পূর্ণ সদুত্তর মিলবে- এমন কোন কথা নেই। এ বিষয়ে তাই গভীর পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। যে কোন মূল্যে আমাদের জঙ্গী জন্মরোধ করতেই হবে।