২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হায় রুপালি ইলিশ

বুদ্ধদেব বসুর চমৎকার একটি গল্পে বাঙালীর অতি প্রিয় ইলিশ মাছের সুন্দর একটি চিত্র আছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের এক কিশোরী কন্যা, যে গল্পের নায়িকাও বটে, প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে গিয়ে খবর দিচ্ছে এই বলে যে, কলকাতার বাজারে ইলিশ লেগেছে। এই কবির অসাধারণ কবিতাও রয়েছে ‘ইলিশ’ শিরোনামে। যাকে কবি বলেছেন, জলের রুপালি শস্য। মরসুম এলেই বাঙালীর ঘরে ঘরে যে শুরু হয়ে যায় ইলিশ উৎসব, তা নিয়ে। পদ্মা ও গঙ্গার ইলিশ্র্র্র্র্র্র্র ধরার জেলেদের জীবন নিয়ে কালোত্তীর্ণ ও অসাধারণ উপন্যাস রয়েছে- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ আর সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাঙালীর দৈনন্দিন জীবনে সুস্বাদু এই মৎস্যটি আজ প্রায় কেবলই স্মৃতি ও দীর্ঘশ্বাস হতে চলেছে। ঢাকার বাজারে ইলিশ লেগেছে কিংবা ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে ইলিশ উৎসব- এমন কোন হাঁকডাক শোনার সুযোগ মেলে না। দুই-চারটি এক-দেড় কেজি ওজনের ইলিশ মাছ যা মেলে, সে সবের দাম শুনে চক্ষু চড়ক গাছ কিংবা হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতেই পারে। এক হালি মোটামুটি সাইজের ইলিশ মাছের দাম বিক্রেতা হাঁকে পঁচিশ/ত্রিশ হাজার টাকা। গত পহেলা বৈশাখে ওই রকম ইলিশ মাছের আলোকচিত্রও ছাপা হয়েছে সংবাদপত্রে। কিন্তু মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও সাধারণ ক্রেতা তার ধারে কাছে দিয়ে যেতে পারেনি। যা পেয়েছে তা জাটকা। ইলিশের কোন স্বাদ যাতে নেই। হাজার টাকার নিচে ইলিশ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার বৈকি। আশা করা হয়েছিল, বর্ষা মৌসুমের সমাগমে বাজারে আসতে শুরু করবে রুপালি ইলিশ। দামও হবে নাগালের মধ্যে। কিন্তু হায়, বাজারে ইলিশের টিকিটিও মেলে না। নদীতে মাছ নেই। সুতরাং বাজারে দেখা মিলবে কোথা থেকে? বর্ষার শুরুতে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা মিলছে না। দীর্ঘ ৬০ কিলোমিটারের পদ্মা-মেঘনার কোথাও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ। তার পরও উত্তাল নদীতে জাল ফেলে চলছে ইলিশ ধরার ব্যর্থ চেষ্টা। অন্য বছর এই সময় সামান্য কিছু হলেও মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার মাছ না পাওয়ায় হতাশা জেলেরা নদী তীরে জাল বুনে অলস সময় কাটাচ্ছেন। সারাদেশে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে গুটিকতক ইলিশ যা ধরা পড়ছে, তা রাজধানীতে বিক্রি হয় চড়া মূল্যে। সেগুলোও পূর্ণাঙ্গ বা প্রাপ্ত বয়স্ক ইলিশ নয়। বরং বলা যায়, শিশু ইলিশ। আড়তদার ও জেলেদের পরিভাষায় টেম্পু ইলিশ। আরও রয়েছে জাটকা। আরও কিছু আছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ইলিশ। ডিপফ্রিজে জমাট করে রাখা, পাথরের মতো শক্ত। ইলিশের স্বাদ গন্ধ বলতে নেই। ইলিশ রসনাতৃপ্ত করার সুযোগ না পাওয়া বাঙালীর সন্ধান এককালে মেলা ভার ছিল। ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি বাঙালী পরিবারের খাবারের মেন্যুতে ইলিশের নানা রকম আয়োজন থাকত। ইলিশের নামে জিভে জল আসে না; এমন বাঙালী এককালে একজনও মিলত না। জাটকা নিধনের কারণে একালের বাঙালীর কাছে ইলিশ জাদুঘরে গিয়ে দেখার অবস্থা যেন। জলের রুপালি মৎস্যও একালের জেলেদের কাছে দুর্লভসম।

বাঙালীর জাতীয় মাছ ইলিশ। একক প্রজাতি হিসেবে সর্ববৃহৎ এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মৎস্য উৎপাদনে এককভাবে ইলিশ মাছের অবদান শতকরা ১৫ ভাগ। প্রজনন মৌসুমে অবাধে ইলিশ আহরণ করার ফলে প্রাকৃতিকভাবে ডিম তথা পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নদ-নদীর পানি প্রবাহ হ্রাস, আষাঢ়ে বৃষ্টি তেমন না হওয়া, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং জলজ দূষণের কারণে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ইলিশ মাছের অনেক বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র এবং জাটকা ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে। আশা করা হচ্ছে, পুরোপুরি বর্ষা শুরু হলেই সাগর থেকে নদীতে আসতে শুরু করবে জলের রুপালি শস্য। তার পরও দামের কারণে রসনাতৃপ্ত করার বাসনা হয়ত অপূর্ণই থেকে যাবে। জিভে জল আসবে কিন্তু ইলিশপ্রাপ্তি দূর অস্ত।