১৮ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইউরো কাপ

  • দাউদ হায়দার

নিঃশব্দ আর্তনাদ? চোখের জলে মুছে যাচ্ছে দুই গালে আঁকা তিনরঙা জার্মান পতাকার নক্সা। দুপুর একটা থেকে পোটসডামার প্লাতসের বিশাল চত্বরে প্রায় হাজারখানেক শিল্পী রঙতুলি নিয়ে, পোর্টেবল টেবিল সাজিয়ে বসে, গালে জার্মান পতাকার নক্সা আঁকছে, প্রতি গালের মূল্য দুই ইউরো।

হাজার-হাজার নয়, লাখ-লাখ তরুণী-যুবতীর কপালে, দুই গালজুড়ে বুকে-পিঠেও জার্মান পতাকা আঁকা। প্রায়-প্রত্যেকের হাতে জার্মান পতাকা, দলে-দলে যাচ্ছে বার্লিনের ঐতিহাসিক ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনের সড়কে। বিরাট প্রশস্ত একটানা চার কিলোমিটার সড়ক। চার কিলোমিটারে ১৬টি বিশাল পর্দা (প্রতিটি স্ক্রিন তথা পর্দা ৩৫ মি.মি.)। গোটা সড়কের দুই পাশেই ব্যারিকেড, ছয় হাজার পুলিশ। প্রত্যেককে তল্লাশি করে অতঃপর প্রবেশ। বিকেল পাঁচটার পরে কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

ইতোমধ্যেই, চার লাখের বেশি দর্শক হাজির (পুলিশের রিপোর্ট)।

ব্রান্ডেনবুর্গগেটের সামনের চত্বর ও সড়ক ‘ফ্যান মাইলস’ নামে পরিচিত। ইউরো বিশ্বকাপের সব খেলাই সরাসরি সম্প্রচারিত। খেলার মাঠের চেয়েও এখানে উত্তেজনা বেশি। নানা ধরনের পানীয়, ভুরস্ট্ (সসেজ) দেদার বিক্রি, বিশাল ব্যবসা।

জার্মান-ফ্রান্সের খেলা, লোকেলোকারণ্য হবেই। প্রত্যেকের স্থির বিশ্বাস, জার্মানিই জয়ী হবে, ফাইনালে খেলবে। ফ্রান্স কোন দলই নয় যেন। বিশ্বাসের কারণও হয়ত এই, শুরু থেকেই ফ্রান্সের পারফরম্যান্স ভাল নয় তেমন, উদ্বোধনী খেলায় রুমানিয়ার কাছে হেরে যাচ্ছিল, কোনমতে ড্র।

ফুটবলপাগল চিত্রকর শাহাবুদ্দীন টেলিফোনে বলেন, ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালেও যেতে পারবে না। অধিকাংশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ, ভাষ্যকারেরও একই কথা।

খেলার শুরু থেকে, বার্লিনের দর্শকদের তুমুল তাচ্ছিল্য ফ্রান্সকে নিয়ে, বিরতির এক মিনিট আগে, পেনাল্টিতে গোল খেয়ে দর্শকদের হা-হুতাশ।

খেলা শেষ হওয়ার আগে, দ্বিতীয় গোল খেয়ে সমস্বরে রোদনধ্বনি। হাতের পতাকা ফেলে ঘরে ফেরা, মাথা নিচু। খেলা শুরু থেকেই, প্রায়-প্রতিটি গাড়িতে, বাড়িতে, বিপণি বিতানে, বাসে, ট্রামে জার্মান পতাকা, হারার পরে এক লহমায় উধাও। কোথাও আর জার্মান পতাকা চোখে পড়ে না।

বুন্ডেসলিগায় কোন দল জয়ী হলে, যে দল জয়ী, নানা পানীয়ে আনন্দে মেতে ওঠে, যে দল পরাজয় ফাইনালে, আরও বেশি বিয়ার, এ্যালকোহল খায়, শোকে মাতাল হয় বেশি? এই দৃশ্য ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে, সড়কে, সারা বার্লিনেই?

সব পত্রিকার পয়লা পাতাজুড়ে একটিই খবর, জার্মানি পরাজিত। দোষারোপ করছে কোচ ওয়াখিম ল্যোয়ভেকে। টিভি ইন্টারভিউয়ে বেচারা গোস্বা করে বলেছেন, পদত্যাগ করবেন। অবশ্য স্বীকারও করেছেন, বড়বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন জয়ী হবেন। পাত্তাই দেন বিরতির আগে এমন কি বিরতির কুড়ি মিনিট পরেই। শেষ রক্ষা হয়নি। চারদিক থেকে গালমন্দ শুনছেন।

জার্মানরা এখন পর্তুগালের পক্ষে, ফ্রান্স দুই চোখের বিষ। হাজার-হাজার মানুষ বাজিও ধরেছে পর্তুগালই ফাইনালে ইউরো কাপ জিতবে। অপেক্ষায় আছে আজ রবিবারের।

কেবল পতাকা নয়, দর্শকের গলায় তিনরঙা কাগজ বা প্লাস্টিকের মালা, মাথায় তিনরঙা পরচুলা মাটিতে গড়ায়। এও বাহ্য। বহু তরুণী-যুবতী এতটাই শোকাহত, জার্মান জার্সি (প্রিয় খেলোয়াড়ের ছবি সংবলিত) পটাপট করে খুলে ফেলে দিব্যি হেঁটে যায়। কারোর ভ্রƒক্ষেপ নেই থাকলেও পুলিশ আটকায়, যুবকরা শার্ট, টিশার্ট খুলে পরিয়ে দেয়।

খেলা শুরুর ৩ ঘণ্টা আগেও যে জার্সির দাম ছিল ২৫ ইউরো, হেরে যাওয়ার পরে ৫ ইউরোতেও বিকোয় না, সামার সেলেও (এখন সামার সেল চলছে) হাফের হাফ দাম।

মিডিয়ার সমালোচনা, গালমন্দ তো আছেই, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, লজ্জায় মিশিয়ে দিচ্ছে কোচসহ খেলোয়াড়দের?

বার্লিনের বহুল প্রচারিত ট্যাবলয়েড বি. জেড (প্রচার সংখ্যা দৈনিক দেড় মিলিয়ন, ১৫ লাখ) শুক্রবারের সংস্করণে প্রথম পৃষ্ঠায় একটিই হেড লাইন, কোচ ওয়াখিম ল্যোয়েভ-এর ছবি, বিশাল অক্ষরে লেখা : খড়বরিীঃ (খবর পরবর্তী পাতায়)? ইউরোপ থেকে ব্রিটেনের যেমন ব্রেক্সিট (প্রস্থান)?

সরকারের দ্বিতীয় টিভি চ্যানেলে একজন ভাষ্যকারের আরও বেশি মারাত্মক ব্যঙ্গ: ‘জার্মান জাতীয় ফুটবল দল হ্যান্ডবলে (ভলিবল) চ্যাম্পিয়ন।’

এই ব্যঙ্গ-রসিকতার হেতু আছে!

ইতালির সঙ্গে খেলায় বোয়েটিঙের হ্যান্ডবলে, পেনাল্টি শর্টে, জার্মানিকেই প্রথম গোল দিয়েছিল ইতালি। ফ্রান্সের সঙ্গে সেমিফাইনালে ক্যাপ্টেন স্যোয়াইন্সাইগারেও হ্যান্ডবল। পেনাল্টি। গ্রিজনানের শর্টে গোল।

daud.haider21@gmail.com